‘পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক’
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন সিনিয়র শিক্ষক বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৬
কবর - জসীমউদ্দীন
২. নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও
‘ঘরে কান্দে পালা বিলাই গোয়ালে কান্দে গাই।
সকলিত আছে আমার পরাণের দোসর নাই \’
মানুষের গন্ধ নাই বাড়ির ভিতরে।
কাউয়ায় করে কা-কা চালের উপরে \
মদিনারে ডাক্যা মিঞা উত্তর না পায়।
তাহার লাগিয়া পরে চাইর দিক বিচরায় \’
ক. ‘কবর’ কবিতাটি কবির কোন কাব্যগ্রন্থে স্থান লাভ করেছে? ১
খ. ‘পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক’- উক্তিটির মর্মার্থ কী? ২
গ. উদ্দীপকে পোষা প্রাণী ও কাকের যে চিত্র পাওয়া যায় তার সঙ্গে ‘কবর’ কবিতার সাদৃশ্য তুলে
ধরো। ৩
ঘ.“কবর’ কবিতার ভাষা ও উদ্দীপকের ভাষাই বাঙালির প্রকৃত মাতৃভাষা”( বক্তব্যটির তাত্পর্য তুলে ধরো। ৪
২ নম্বর প্রশ্নের ‘ক’-এর উত্তর
‘কবর’ কবিতাটি ‘রাখালী’ কাব্যগ্রন্থে স্থান লাভ করেছে।
২ নম্বর প্রশ্নের ‘খ’-এর উত্তর
বৃদ্ধ দাদু আলোচ্য উক্তির মাধ্যমে তাঁর বালিকা বধূর কিশোরীসুলভ উজ্জ্বল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন।
যৌবনে তিনি বিয়ে করেছিলেন পুতুল খেলার বয়সি এক কিশোরীকে। অপরিণত বয়সের বধূ সারাক্ষণ পুতুল খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। পুতুল খেলা ছিল তার অন্যতম শখ। মিছেমিছি পুতুলের বিয়ে দিয়ে সে চোখের জলে বুক ভাসাত। এ অবুঝ কিশোরীর কর্মকাণ্ডে তরুণ কৃষকের চিত্ত বিমোহিত হয়ে পড়েন।
২ নম্বর প্রশ্নের ‘গ’-এর উত্তর
‘কবর’ কবিতায় বৃদ্ধের মর্মবেদনা প্রকাশের অনুষঙ্গ হিসেবে পশু ও পাখির কথা এসেছে; উদ্দীপকের কবিতাংশেও বাংলার গ্রামীণ সমাজের পশুপ্রীতির চিত্র উত্থাপিত হয়েছে।
‘কবর’ কবিতায় গ্রামীণ কৃষকের পরিবারের অনিবার্য অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে গোয়ালের বলদের কথা। বৃদ্ধ দাদুর পুত্র মারা যাওয়ার পর দেখা যায়, তাঁর পুত্রবধূ গোয়ালের বলদ দুটির গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদে এবং তার দুঃখে ব্যথিত বলদ দুটিও হাম্বা রবে গলা ফাটায়। এরপর দেখা যায়, দাদুর নাতনি মারা যাওয়ার পর তার বেদনায় রাতদিন কেঁদে মরে বনের ঘুঘু।
উদ্দীপকে পশুগুলোর যে আচরণ বর্ণিত হয়েছে তা অনেকটা মানুষের আচরণের মতোই। এতে বোঝা যায়, প্রাণীগুলো কীভাবে পরিবারের অংশ হয়ে গেছে। গরু মানুষের বিভিন্ন প্রয়োজন মেটায়, কিন্তু বিড়াল তেমন কোনো উপকার না করলেও মানুষের দুঃখের সঙ্গী হয়। গ্রামবাংলায় কাকের ডাক অমঙ্গলের ইঙ্গিত নির্দেশ করে বলে বিশ্বাস প্রচলিত। মানুষ ও পশু উভয়ই প্রকৃতির সন্তান। গ্রামবাংলার মানুষের প্রকৃতি-সংলগ্নতা বেশি এবং পোষা প্রাণী তাদের কাছে মানব সন্তানের মতো বিবেচ্য। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের মানুষ প্রচলিত রীতি ও দীর্ঘদিনের আচরিত ধর্ম-বিশ্বাসে অস্থাশীল। ফলে পশুর সঙ্গে মানুষের সখ্য পরিবারের সদস্যের মতো। এ সত্যেরই প্রকাশ ঘটেছে উদ্দীপকের কবিতাংশে ও ‘কবর’ কবিতায়।
২ নম্বর প্রশ্নের ‘ঘ’-এর উত্তর
জসীমউদ্দীন রচিত ‘কবর’ কবিতার ভাষা গ্রামীণ জীবনের চিরপরিচিত ভাষা। উদ্দীপকের ভাষাও গ্রামীণ আবহে সৃষ্টি বলে এ ভাষা কবিতারই অপর পিঠ।
কবর কবিতার আলোকে বলা যায়, নিছক সরল ও সাদামাটা ভাষার ব্যবহারে জসীমউদ্দীনের কবিতা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এ কবিতায় চরিত্রের মুখে যে সাধারণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রচলিত মুখের ভাষা।
উদ্দীপকের কবিতাংশেও একই ভাষারীতি ও শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কান্দে, বিলাই, গাই, পরাণ, কাউয়া, ডাক্যা, চাইর, বিচরায়- এসব শব্দ কথ্য রীতিতেই প্রচলিত। কবিরা কবিতায় এ ধরনের সহজ ও প্রচলিত শব্দ ব্যবহার করে কবিতাকে সাধারণের অন্তরে পৌঁছে দিয়েছেন।
মূলত এ ভাষাই আমাদের মাতৃভাষা। কারণ নিত্য ব্যবহার্য এ ভাষাই আমরা মায়ের কাছে অর্থাত্ পরিবার-সমাজ তথা চারপাশের পরিবেশ থেকে শিখে থাকি। কবি ‘কবর’ কবিতায় অপেক্ষাকৃত সরল ও সাধারণ ভাষা ব্যবহার করেছেন, যেমন - ‘তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’ এখানে ‘তিরিশ’ শব্দটি ‘ত্রিশ’-এর সহজ ও অতি প্রচলিত কথ্য রূপ। এ ছাড়াও কবি কবিতায় ‘বেহেশত’ শব্দের পরিবর্তে ‘ভেস্ত’ ব্যবহার দ্বারা আমাদের আঞ্চলিক জীবনের মুখের কথাই ফুটিয়ে তুলিয়েছেন। চলিত ভাষার কোমল রূপ হিসেবে বানানে ‘ঙ্গ’ এর স্থলে ‘ঙ’ ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন - ‘পুতুলের বিয়ে ভেঙে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।’ এরকম আরও আছে, যেমন - লাঙল, রঙিন ইত্যাদি। আবার গ্রামীণ প্রচলিত শব্দের ব্যবহার কবিতাটি হয়ে উঠেছে ব্যঞ্জনাময়, যেমন - ‘শাপলার হাটে তরমুজ বেচি ছ পয়সা করি দেড়ী।’ এখানে ‘দেড়ী’ অর্থাত্ দেড়গুণ। ‘দোয়া চাওয়া’ বোঝাতে কবি ব্যবহার করেছেন ‘দোয়া মাঙ্’ এবং বুবুজি বা বড় বোন-এর পরিবর্তে ‘বুজি’, গিয়েছিলাম-এর পরিবর্তে ‘গেনু’, মসজিদ-এর পরিবর্তে ‘মজিদ’ - এরকম আরও অনেক শব্দ কবি তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন। উপরিউক্ত কবিতার ভঅষঅও গামীণ জীবনের আপনভাষা। এভাষা কবর কবিতার অপর পিঠির অবস্থান নির্ণয় এর। তাই উভয় কবিতা পাঠে মনে হয়, এর ভাষা যেন আমাদেরই মাতৃভাষা।