রাজধানীর শেরে বাংলানগরে গত বৃহস্পতিবার উবারের মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয় একটি কাভার্ড ভ্যান। ইহাতে মোটরসাইকেলের আরোহী ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের ছাত্রী ফাহমিদা হক লাবণ্য ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। আহত হন চালক সুমন। বর্তমানে তিনি পুলিশ হেফাজতে রহিয়াছেন। ইহার আগের দিন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ট্রাকের নিচে চাপা পড়িয়া নিহত হন পাঠাও রাইড শেয়ারিং অ্যাপস ব্যবহারকারী আরমান নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী। ইদানীং রাজধানীতে মোটরসাইকেলের বেপরোয়া চলাচল বৃদ্ধির কারণে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়াছে। অ্যাপসের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং পদ্ধতি চালুর পর মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়িয়া গিয়াছে। সেইসঙ্গে বাইক দুর্ঘটনা যে হারে বাড়িতেছে তাহা উদ্বেগজনক। ইহার অধিকাংশই রাইড শেয়ারিং কোম্পানির মোটরসাইকেল। উপরে উল্লিখিত দুইটি ঘটনায় কাভার্ডভ্যান ও ট্রাক চালকের বেপরোয়া মনোভাবও নিঃসন্দেহে দায়ী, তবে সার্বিকভাবে চালকের অদক্ষতার কারণেও সমপ্রতি বাইক দুর্ঘটনা বাড়িতে দেখা যাইতেছে। এইজন্য রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে বিরাজ করিতেছে এক ধরনের আতঙ্ক। জানা যায়, বাইক চালকের অদক্ষতার বড় কারণ অধিকাংশ চালকই ঢাকার বাহিরের। সন্তোষজনক আয়-উপার্জনের আশায় তাহারা ঢাকামুখী হইতেছে। অথচ ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের গতিবিধি সম্পর্কে তাহাদের পর্যাপ্ত জ্ঞান নাই। বর্তমানে উবার, পাঠাও, স্যাম, বাহন ও সহজসহ কয়েকটি মোটরসাইকেলের রাইড শেয়ারিং সার্ভিস চালু রহিয়াছে। কিন্তু চালকের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে এই সব কোম্পানির কোনো মাথাব্যথা আছে বলিয়া মনে হয় না। আবার চালকরা ভুয়া ঠিকানায় নিবন্ধন করিলেও কোম্পানি সেই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতেছে না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, ২০১৬ সালে নিবন্ধন দেওয়া হইয়াছিল ৫৩ হাজার ৭৩৮টি মোটরসাইকেল। অথচ ২০১৮ সাল ও চলতি বত্সরের এই পর্যন্ত মোটরসাইকেলের নিবন্ধন বাড়িয়া দাঁড়াইয়াছে ৮২ হাজারের বেশি। শুধু রাইড শেয়ারিং নহে, অন্যান্য চালকরাও বেপরোয়া গতিতে বাইক চালাইতেছে। বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালাইয়া দুর্ঘটনা ঘটাইলেও কাহারও কিছু হয় না- এই পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে আরো বাড়িতেছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। শনিবার পাবনার চাটমোহরে বালুভর্তি একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঢুকিয়া পড়ে। রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে একটি কাভার্ডভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারাইয়া ফুটপাতে উঠিয়া গেলে স্কুলছাত্রীসহ দুইজন নিহত হন। বাস, ট্রাকের পাশাপাশি আজ কাভার্ডভ্যান ও মোটরসাইকেলও সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অদক্ষ চালক ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন রাস্তায় চলাচলকারী ও যাত্রীদের জীবন বিপন্ন করিয়া তুলিতেছে। এইক্ষেত্রে জনগণের অসচেতনতা যে নাই, তাহা আমরা বলিব না। তবে জনসচেতনতার কথা বলিবার আগে সঠিক রোড ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইন-সিম্বল, যথেষ্ট ফুটপাত ও ফুটওভারব্রিজ সারা দেশ জুড়িয়া কী পরিমাণে আছে তাহা লইয়া আমরা প্রশ্ন না করিয়া পারি না। সর্বোপরি, গত বত্সর সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ নামে যে আইনটি সংসদে পাস করা হইল, তাহা বিধিমালার অভাবে কেন অকার্যকর রহিয়াছে? কেন নূতন আইন অনুযায়ী দায়ী চালকের শাস্তি হইতেছে না? কেন ক্ষতিগ্রস্তরা ক্ষতিপূরণ পাইতেছে না? শিক্ষার্থীদের এত আন্দোলনের পরও সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা কি অধরাই থাকিয়া যাইবে? এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকলের দ্রুত ও সক্রিয় ভূমিকা পালন একান্ত কাম্য।