মাঠে নামলেন জো বাইডেন

ওয়াশিংটনের জন্য এই সময়টা বড্ডো বেশি বিভ্রান্তিকর। বিশেষ করে দিনদশেক আগে মুলারের প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর থেকে। মুলারের এই প্রতিবেদন দারুণ এক ধোঁয়াশা তৈরি করেছে, ঢেকে দিয়েছে অনেক কিছু। পাঠকের অবগতির জন্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, প্রায় পাঁচশটি  সাক্ষাত্কার, পাঁচশটি তল্লাশি পরোয়ানা এবং ২৩০০টি লিখিত ও মৌখিক সাক্ষ্যের পরে, ২৩ মাস তদন্তের শেষে প্রকাশিত হয় মুলার রিপোর্ট। বহু প্রতীক্ষিত এই রিপোর্টে বলা হয় যে, তদন্তকারীদের সামনে এমন কিছু কঠিন পরিস্থিতি ছিল যার ফলে সত্যিই বলা মুশকিল যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রুশ হস্তক্ষেপ বিষয়ে তদন্তে বাধা দিয়েছিলেন কি না। মুলার অবশ্য বলেছেন যে, কংগ্রেস চাইলে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যেতে পারে। রিপোর্টটিতে মূলত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দশটি ‘আচরণ’ খুঁটিয়ে দেখেছেন রবার্ট মুলার। তার মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ স্পষ্ট। তবে রুশ হস্তক্ষেপের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রচারের সম্পর্ক ছিল কি না, সেটা বলা সম্ভব নয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিষয়ে মুলারের প্রতিবেদনটি যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে, তা ওয়াশিংটনের বাতাসে বাড়িয়ে দিয়েছে ধোঁয়াশার কুণ্ডলী। এসবের মধ্যেই এক দমকা সজীব বাতাস ঢুকে পড়েছে জো বাইডেনের কারণে। এটা সত্যিই সঞ্জীবনীসুধার মতো—যখন আমরা শুনতে পেলাম, আমেরিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গত ২৫ এপ্রিল বৃহস্পতিবার জো বাইডেন যখন ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে থেকে এই ঘোষণা দেন, এটা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের যে, সেই সময়টায় আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম। 

ভার্জিনিয়ার এই শার্লটসভিলের একটি ঘটনা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না। ২০১৭ সালের গ্রীষ্মের সময় শার্লটসভিলে নব্য নািসবাদীদের তাণ্ডব দেখেছি আমি। আমার প্রিয় কলেজ টাউনকে জ্বলতে দেখেছি টেলিভিশনের পর্দায়। অশান্তির সূত্রপাত হয়েছিল শার্লটসভিল থেকে মার্কিন গৃহযুদ্ধের সময়ের কনফেডারেট জেনারেল রবার্ট ই লি-র একটি মূর্তি অপসারণ নিয়ে। ১১ আগস্ট শুক্রবার এর প্রতিবাদে পথে নামেন অতি দক্ষিণপন্থিরা। অন্যদিকে লি-র মূর্তির তলায় জমায়েত করেন বিক্ষোভকারীরা। ‘দেশের রক্ত—দেশের মাটি—এক দেশ, এক মানুষ, অভিবাসন বন্ধ হোক’— এসব স্লোগান দিতে দিতে এগোতে থাকেন তাঁরা। এর প্রতিবাদে পালটা শান্তিমিছিল করে বিরোধীরাও। তারপর দুপক্ষের মধ্যে শুরু হয় প্রবল সংঘর্ষ। শার্লটসভিলে সেই ভিড়ের মধ্যে গাড়ি নিয়ে ঢুকে পড়ে ওহায়োর বাসিন্দা জেমস ফিল্ড নামে নব্য নািসবাদী তরুণ এক শ্বেতাঙ্গ যুবক। তার গাড়ির চাপায় মৃত্যু হয় তিনজনের। গুরুতর আহত হয় অনেকে।

আমি যখন টেলিভিশন এবং অনলাইনে এই নৃশংসতা দেখছিলাম, তখন আমার ভেতরে একটি সহজাত তাড়না তৈরি হয়েছিল যে, এই শহরটাকে রক্ষা করতে হবে। এই সেই শহর যেখানে আমি দুই দশক আগে বাংলাদেশ থেকে এসে বসতি গড়েছিলাম। এই শহরটাকে বলা যায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়ে ওঠার পথে আমার জীবনের সূচনা। আমার মা-বাবা, বন্ধুবান্ধব, পরিজনদের থেকে বহু দূরের এই সুন্দর শহরে এসে বসবাসের ভেতর দিয়ে আমি আবিষ্কার করি এক শ্রেষ্ঠ আমেরিকাকে।

তাই, ২৫ এপ্রিল জো বাইডেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন তখন তা দারুণ এক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে শার্লটসভিলে নব্য নািসবাদীদের তাণ্ডবের পর জো বাইডেনের এই ঘোষণা শার্লটসভিলের জন্য অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। একইসঙ্গে বলতে হয় যে, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশা করছেন যে, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ক্রমশ আমেরিকানদের কাছে একজন জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছেন। বাইডেন বলেছেন যে, ‘আমরা একটি যুদ্ধের মধ্যে আছি। আর সেই যুদ্ধটা এই জাতির আত্মাকে রক্ষার।’ ভিডিওবার্তায় তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যদি ট্রাম্পকে আট বছরের জন্য হোয়াইট হাউসে জায়গা করে দিই, তাহলে তিনি চিরকালের জন্য এবং মৌলিকভাবে এই জাতির চরিত্র বদলে দেবেন যে— আমরা আসলে কী। আমি নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে তা ঘটতে দিতে পারি না।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য কালক্ষেপণ করেননি বাইডেনের বার্তার প্রত্যুত্তর দিতে। ট্রাম্প তাঁর জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে বাইডেনকে স্বাগত জানান ‘ঘুমকাতুরে জো’ সম্বোধনে খোঁচা দেওয়ার মাধ্যমে। ট্রাম্প টুইটারে লিখেছেন, স্বাগতম ঘুমকাতুরে জো। তবে প্রাথমিক প্রচারণায় সফল হওয়ার মতো বুদ্ধিমত্তাই তোমার আছে কি না সে বিষয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। এ এক নোংরা বিষয় হবে। কেননা তোমাকে এমন সব লোকের সঙ্গে পথ চলতে হবে যাদের মাথা অসুস্থ এবং বিকৃত সব ধ্যান-ধারণায় পূর্ণ। তবে তুমি যদি তা উতরে যেতে পারো তাহলে তোমার সঙ্গে শুরুর দরজায় দেখা হবে!’

এটা ঠিক যে, নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে জো বাইডেনকে মোকাবিলা করতে হবে ডেমোক্রেটিক দলের অনেক সম্ভাবনাময় প্রার্থীর সঙ্গে। তবে জো বাইডেনের ব্র্যান্ডিং ভাবমূর্তি অনেক বেশি শক্তিশালী। তিনি যে কেবল বারাক ওবামার দুই মেয়াদে ভাইস প্রেসিডেন্টের ভূমিকা পালন করেছেন, তাই নয়, তিনি কয়েক দশক ধরে ইউএস সিনেট এবং ডেলাওয়ারে সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। 

ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের ভূমিকা নিয়ে ওবামার মুখপাত্র বলেছেন যে, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রায়শই বলে থাকেন— ২০০৮ সালে জো বাইডেনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করা ছিল তাঁর শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্তগুলির একটি। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জো বাইডেনের জ্ঞান, প্রজ্ঞা, গভীরতা ও বিচারিক ক্ষমতা ছিল অতুলনীয়, যার ওপর ওবামা তাঁর সমগ্র প্রেসিডেন্সি সময়ে বিশেষভাবে নির্ভর করতেন।

বর্ণবাদী উগ্রবাদী নেতৃত্বকে বাতিল করার জন্য জো বাইডেন আমেরিকানদের সামনে নতুন আশা হয়ে দাঁড়াবেন।  আমেরিকার যে প্রধান শক্তি, তার বিপরীতে ট্রাম্প যে আদর্শ ধারণ করেন— জো বাইডেনকে যুদ্ধ করতে হবে সেই উগ্রশক্তির বিরুদ্ধে।

আশা করছি, সেরা ব্যক্তিটি আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করবেন।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: তাপস কুমার দত্ত

n লেখক : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি সাংবাদিক, নারী অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ