হত্যার নির্দেশের কথা স্বীকার করলেন অধ্যক্ষ সিরাজ

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফীকে হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা অবশেষ সবকিছু স্বীকার করে নিয়েছেন। গতকাল রবিবার ফেনীর আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, ‘আমি ওদের (ছাত্ররা) নির্দেশ দিয়েছিলাম কেউ যেন বুঝতে না পারে তাঁর শরীরে আগুন দেওয়া হচ্ছে। হত্যার পর বিষয়টি এমনভাবে প্রচার করতে হবে যে সবাই বিশ্বাস করে নুসরাত আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু সে বেঁচে থাকায় পুরো পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। ঘটনাস্থলেই নুসরাতের মৃত্যু হলে বিষয়টি কেউ জানতে পারত না। ওরা আগুন দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ঘটনাস্থলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে আসতে পারেনি।’

মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন- পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার ইত্তেফাককে বলেন, দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেওয়ার পর সিরাজ উদ দৌলা নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হন। তাই রবিবার তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। সেখানে তিনি পুরো পরিকল্পনা, কাকে কীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তার বর্ণনা করেছেন। নিজের অপরাধের কথাও তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন। ডিআইজি আরো বলেন, নুসরাত হত্যা মামলায় জড়িত ১৬ জনকে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আগামী মাসের মধ্যে চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে।

পিবিআই চট্টগ্রামের বিশেষ পুলিশ সুপার ইকবাল হোসেন জানান, দুপুরে ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসেনের আদালতে অধ্যক্ষ সিরাজকে হাজির করা হয়। রাত ৮ টা ৫০  মিনিটে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড শেষ হয়। জবানবন্দিতে তিনি নুসরাতকে যৌন হয়রানির ঘটনায় দায়েরকৃত মামলা তুলে নিতে পরিবারকে হুমকি দিয়ে কাজ না হলে পুড়িয়ে হত্যা করে তা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে কারাগারে দেখা করতে যাওয়া নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীমকে নির্দেশ দেন বলে স্বীকার করেছেন। সিরাজ উদ দৌলা এ হত্যার বিষয়ে আরো চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য দিয়েছে। কিন্তু মামলার তদন্তের স্বার্থে তা এখন বলা যাচ্ছে না।

গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসার নিজ কক্ষে ডেকে নুসরাতকে যৌন হয়রানি করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী মডেল থানায় ৯ এপ্রিল তাঁর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের দায়ের করা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ আটজনের নাম রয়েছে। ১০ এপ্রিল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শরাফ উদ্দিনের আদালতে অধ্যক্ষ সিরাজকে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ৭ দিনের রিমান্ড দেন।

গ্রেফতার ২১ জন: নুসরাত হত্যা মামলা পিবিআইয়ে হস্তান্তরের পর এখন পর্যন্ত এ মামলার এজহারভুক্ত আট আসামিসহ ২১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হলেন: সোনাগাজী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ দৌলা, কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম, শিক্ষক আফছার উদ্দিন, সহপাঠী আরিফুল ইসলাম, নূর হোসেন, কেফায়াত উল্লাহ জনি, মোহাম্মদ আলা উদ্দিন, শাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগনি উম্মে সুলতানা পপি, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহমেদ, নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, মো. শামীম, কামরুন নাহার মনি, আবদুর রহিম ওরফে শরিফ, ইফতেখার হোসেন রানা, এমরান হোসেন মামুন, মহিউদ্দিন শাকিল, হাফেজ আবদুল কাদের এবং উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও ওই মাদ্রাসার সহ-সভাপতি রুহুল আমিন। এর মধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজ ছাড়াও আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন: নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনি, জাবেদ  হোসেন, আবদুর রহিম ওরফে শরীফ, হাফেজ আবদুল কাদের ও জোবায়ের আহমেদ ।

অধ্যক্ষ সিরাজের এমপিও স্থগিত: নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে যাওয়ায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা এবং ইংরেজী বিষয়ের  প্রভাষক  আফসার উদ্দীনের এমপিও স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল রবিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এ সংক্রান্ত এক নথি অনুমোদন করেছেন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০১৮ এর অনুচ্ছেদ-১৮ এর উপানুচ্ছেদ ১৮.১ ও ১৮.২ এর আলোকে তাদের  এমপিও স্থগিত করা হয়েছে।

ওসি মোয়াজ্জেমের মামলার প্রতিবেদনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত আজ:সোনাগাজী মডেল থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের করা মামলার প্রতিবেদন কবে নাগাদ দাখিল করা হবে সে ব্যাপারে আজ সোমবার সিদ্ধান্ত নেবে পিবিআই। এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকতা এএসপি রিমা সুলতানা বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ব্যাপারে তিনি পিবিআই সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসবেন। তাদের মতামতের পরই সিদ্ধান্ত  নেওয়া হবে।