ব্যাংক খাতে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে বিশ্বমান থেকে সরে আসছে বাংলাদেশ। কোনো গবেষণা না করেই ব্যাংকিং খাতে নানা বিষয় শিথিল করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে অযাচিত হস্তক্ষেপ, ঋণ পুনর্ভরণ, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে খেলাপি নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হতে সরে এসেছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের চাপেই ব্যাংকিং খাতে এই পরিবর্তন করা হচ্ছে যার ফল ভালো হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদ (বিআইডিএস) আয়োজিত ‘বিআইডিএস ক্রিটিক্যাল কনভার্সেশন-১০১৯’ শিরোনামে দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে তিনি এ মন্তব্য করেন। বিআইডিএস এর মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুর্শিদের সভাপতিত্বে আয়োজিত উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সম্মাননীয় অতিথি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলম।

সম্মেলনের প্রথমদিনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত, বৈষম্য ও দারিদ্র্য এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পর্যায় নিয়ে তিনটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

উদ্বোধনী পর্বে অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ আরো বলেন, সুশাসন ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত না করতে পারলে বৈষম্য দূর হবে না। তিনি বলেন, আমরা এমন একটি অবস্থায় এসেছি যাতে দেশে একক রাজনৈতিক দলের প্রাধান্য রয়েছে। এই ধরনের শাসন কাঠামোতে জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত হবে সেটি দেখতে হবে। শুধু একজনের কাছে জবাবদিহিতা থাকলে নিচের কাঠামোতে কি হবে। সবকিছু প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রিক হলে হবে না। অর্থনৈতিক কাঠামোতে জবাবদিহিতা থাকতে হবে। শুধু স্বজন তোষণের গণতন্ত্র দিয়ে এই জবাবদিহিতা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সামাজিক খাতে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু এসডিজির লক্ষ্য পূরণে এই অর্জনকে টেকসই করতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শুধু স্বল্প খরচের সমাধান খুঁজলেই হবে না। পাশাপাশি সুশাসনের উন্নতি করতে হবে, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হবে। বর্তমান সময়ে মাথাপিছু আয় বাড়লেও বৈষম্য বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রস্তুতি ছাড়াই আমরা জনসংখ্যার বোনাস যুগে প্রবেশ করেছি। এজন্য মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। ভারতের দ্বিতীয় শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির গ্র্যাজুয়েটরা বাংলাদেশে চাকরি করে বছরে চার/পাঁচ বিলিয়ন ডলার নিয়ে যাচ্ছে। এজন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে’।

উন্নয়নের জন্য মেগা প্রকল্পের অর্থনৈতিক উপযোগিতা নিয়ে গবেষণার আহ্বান জানান তিনি। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে আমাদের কর্ণফুলির তলদেশে টানেল প্রয়োজন না বুড়িগঙ্গার তলদেশে টানেল প্রয়োজন সেটির যৌক্তিকতা দেখতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ব্যাংকিং খাতে যা হচ্ছে তা নিয়ে আমরা খুশি নই। সরকারের নীতিনির্ধারকরা আন্তরিক, তারা ইতিমধ্যে কিছু উদ্যোগও নিয়েছেন। বেকারত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশে শ্রমিক, কৃষক কেউ আর বেকার নয়। কিন্তু শিক্ষিতরাই আমাদের আশাহত করে। তারা যে ধরনের কর্মসংস্থান চান সেটি হয়তো পান না। তারা তাদের মতো চাকরি চান। এটা আমরা কীভাবে ব্যবস্থা করবো। তিনি বলেন, আমরা কর্ণফুলির তলদেশে টানেল করবো, উত্তরবঙ্গের নদীর নিচেও টানেল করবো। অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার চেয়ে অন্য বিষয়ও আমাদের দেখতে হবে।

কে এ এস মুর্শিদ বলেন, সমসাময়িক অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিয়ে এই সংলাপের আয়োজন করা হয়েছে। বিআইডিএস এর গবেষণার মান উন্নত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১৯ সালে বিশ্বের আটশতটি থিংকট্যাংকের মধ্যে বিআইডিএস ১০৪তম অবস্থানে রয়েছে।

উদ্বোধনী সেশনের পর ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থার উপর আয়োজিত একটি সেমিনারে বিআইডিএস এর ফেলো গবেষক মনজুর হোসেন উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ৬ শতাংশ সুদে আমানত ও ৯ শতাংশ সুদের ঋণ ঘোষণা করলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। আমানতের সুদ হার এখন গড়ে ৯-১১ শতাংশ এবং ঋণে সুদহার ১৩-১৫ শতাংশে রয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতে বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনের জন্য পরিবারভিত্তিক পরিচালন ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে পেশাদারিত্ব সম্পন্ন পরিচালক নিয়োগের সুপারিশ করেন তিনি।