সমুদ্রের নতুন ব্লকের গ্যাস রপ্তানিতে কোন বাধা নেই

রপ্তানি নীতিতে ‘গ্যাস-তেল এলএনজি’ রপ্তানিযোগ্য পণ্য

সমুদ্রের নতুন ব্লকের গ্যাস রপ্তানিতে কোন বাধা নেই। উত্পাদন বন্টন চুক্তি (পিএসসি) অনুযায়ী বিদেশি কোম্পানির অংশটুকু তারা রপ্তানি করতে পারবে। তবে সরাসরি নিয়মটি রাখা হয়নি। ২০১২ সালে উত্পাদন বন্টন চুক্তির প্রাথমিক খসড়ায় গ্যাস রপ্তানির বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি নীতিতে, বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অংশের পেট্রোলিয়াম ও এলএনজি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা নেই। ২০০৮ সালের পিএসসিতে বলা ছিল, বিদেশি কোম্পানি সরাসরি পাইপ লাইনে গ্যাস রপ্তানি করতে পারবে না। তবে এলএনজি করে রপ্তানি করতে পারবে। পিএসসি অনুমোদন হওয়ার পর থেকে জ্বালানি মন্ত্রণালয় ও পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন যে, এবারের পিএসসিতে কোন প্রকারেই গ্যাস রপ্তানির সুযোগ নেই। কিন্তু পিএসসি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেখানে কোথাও গ্যাস রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয়নি। শুধু বলা হয়েছে, গ্যাস উত্পাদনকারী কোম্পানির অংশ পেট্রোবাংলা কিনতে না পারলে দেশের মধ্যে অন্য কোন পক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি সরাসরি বিক্রি করতে পারবে। ২০০৯-১২ রপ্তানি নীতির ৮.১(ক) ধারায় বলা হয়েছে, প্রাকৃতিক গ্যাস উদ্ভূত পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য (যথা: ন্যাপথা, ফারনেস অয়েল, লুব্রিক্যান্ট অয়েল, বিটুমিন, কনডেনসেট, এমটিটি ও এমএস) ব্যতিরেকে সকল পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্য রপ্তানি করা যাবে না। তবে প্রডাকশন শেয়ারিং কণ্ট্রাক্ট-এর আওতায় বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক চুক্তি মোতাবেক তাদের হিসাবের পেট্রোলিয়াম ও এলএনজি রপ্তানির ক্ষেত্রে এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। নতুন পিএসসিতে করের ক্ষেত্রে কোম্পানিকে কর্পোরেট আয়কর, সাব-কন্ট্রাক্টরের আয়কর, কন্ট্রাক্টর ও সাব-কন্ট্রাক্টরের অধীনে যাদের নিয়োগ দেয়া হবে তাদের আয়কর দিতে হবে। এই কর এখন পেট্রোবাংলা দিয়ে দেয়। এ কাজে যে সম্পদ ও তথ্য ব্যবহার হবে তার মালিকানা পেট্রোবাংলার হবে। এছাড়া অগভীর সমুদ্রের নয়টি ক্ষেত্রে বাপেক্স এর জন্য ১০ শতাংশের অংশীদার (ক্যারিড ইন্টারেস্ট) রাখা হয়েছে । সাগরে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। দরপত্র আহবান করেছে পেট্রোবাংলা। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সমুদ্রের ১২টি ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের কাজ দেয়া হবে। আগামী ১৮ই মার্চ পর্যন্ত আগ্রহীদের কাছ থেকে প্রস্তাব নেয়া হবে।পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, আগামী জুন মাসের মধ্যে পিএসসি সই এবং আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে অনুসন্ধান শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তেল গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটির আহবায়ক বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ ইত্তেফাককে বলেন, যেহেতু রপ্তানি নিষিদ্ধ নেই, সেহেতু সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ইচ্ছে করলেই রপ্তানি করতে পারবে। সমুদ্রে যদি বেশি গ্যাস পাওয়া যায় তখন আমাদের চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস সরবরাহ হতে থাকবে। আর চাহিদার চেয়ে বেশি গ্যাস উত্পাদন হতে থাকলে রপ্তানির বিষয়টি চলে আসবে। তিনি বলেন, চাহিদা থাকা সত্বেও পেট্রোবাংলা সাঙ্গুর গ্যাস কেনেনি। তৃতীয় পক্ষের কাছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বেশি দামে বিক্রি করার সুযোগ পেয়েছে। আর ভবিষ্যতে এক সাথে বেশি গ্যাস পাওয়া গেলে কিম্বা বর্তমান অবস্থায় যে গ্যাস রপ্তানি বা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি হবে না তার নিশ্চয়তা নেই। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক ই ইলাহী চৌধুরী সম্প্রতি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, এবারের পিএসসিতে দেশের জন্য ভালো এবং কোম্পানিগুলোর জন্য আকর্ষণীয় এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা হয়েছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মুহাম্মাদ ইমাদুদ্দীন বলেন, নতুন পিএসসিতে একটা ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। কারণ, কিছু জিনিস না ছাড়লে কোনো কোম্পানি আসবে না। আবার কিছু জিনিস হাতে না রাখলে আমাদেরও কিছু থাকবে না। গত ১১ সেপ্টেম্বর অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিএসসিটি অনুমোদন করে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর অনুমোদন দেন। নতুন পিএসসিতে ৩৫টি ধারা রয়েছে। প্রথমে পাঁচ বছরের জন্য কাজ করার চুক্তি করবে ঠিকাদার কোম্পানি। এরপর আরো তিন বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করতে পারবে। অগভীর সাগরের ক্ষেত্রে ঠিকাদার কোম্পানি যদি ভূতাত্ত্বিক জরিপ করার পর অনুসন্ধান কূপ খনন না করে তবে তিন বছর পর এ চুক্তি বাতিল হবে। ন্যূনতম কাজের মধ্যে কোম্পানিকে অনুসন্ধানের প্রথম ধাপে দ্বি-মাত্রিক জরিপ এবং দ্বিতীয় ধাপে কমপক্ষে একটা অনুসন্ধান কূপ করতে হবে। নিরাপত্তা জামানত (গ্যারান্টি) হিসেবে চুক্তি স্বাক্ষরের ত্রিশ দিনের মধ্যে পেট্রোবাংলার কাছে প্রাথমিক অনুসন্ধানের সময় কোম্পানিকে বাজার দর অনুসারে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখতে হবে। কোম্পানিকে সংখ্যা ও মান অনুসারে দেশীয় জনবল নিয়োগ দিতে হবে। অনুসন্ধানের সময় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং উত্পাদনের সময় ৬০ থেকে ৯০ শতাংশ বাংলাদেশি জনবল নিয়োগ দিতে হবে। মুনাফা বা লভ্যাংশ বণ্টন: পিএসসি ২০১২ অনুযায়ী, অগভীর সমুদ্রের কোনো ক্ষেত্রে দৈনিক গ্যাস উত্পাদন সাড়ে সাত কোটি ঘনফুটের মধ্যে হলে পেট্রোবাংলা লভ্যাংশের কমপক্ষে অর্ধেক পাবে। দৈনিক উত্পাদন ১৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত হলে পেট্রোবাংলা লভ্যাংশের ৫৫ শতাংশ, উত্পাদন ২৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত হলে পেট্রোবাংলা ৬০ শতাংশ, উত্পাদন ৪০ কোটি ঘনফুট হলে পাবে ৬৫ শতাংশ। উত্পাদন ৬০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত হলে ৭০ শতাংশ এবং ৬০ কোটি ঘনফুটের বেশি উত্পাদন হলে পেট্রোবাংলা পাবে লভ্যাংশের কমপক্ষে ৭৫ শতাংশ। গভীর ক্ষেত্রতে পেট্রোবাংলার লভ্যাংশ ৫৫ শতাংশ থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পাবে। কুতুবদিয়া এবং টেকনাফ গ্যাসক্ষেত্র দুটি থেকে উত্তোলিত গ্যাসের লভ্যাংশ হিসাবের অতিরিক্ত পাঁচ শতাংশ গ্যাস পেট্রোবাংলাকে দিতে হবে। কারণ ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের মাধ্যমে আগেই টেকনাফ চিহ্নিত ছিল। দাম: দামের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম সিঙ্গাপুরের বাজারে হাই সালফার জ্বালানি তেলের বাজার অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে। এই ধারা প্রতিটন তেলের দাম সর্বোচ্চ ২০০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে গ্যাসের দাম পড়বে অগভীর সাগরে প্রতি হাজার ঘনফুট পাঁচ ডলার এবং গভীর সাগরে সাড়ে পাঁচ ডলার। তেল বা কনডেনসেটের দামও একই প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করা হবে। গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রে পেট্রোবাংলা কিনতে না চাইলে কোম্পানিগুলো দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে পারবে। পাশাপাশি গ্যাস বা তেল ক্ষেত্রে কোনো বিস্ফোরণ ঘটলে অথবা অন্য কোনো ধরনের ক্ষতি হলে ঠিকাদার কোম্পানিকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কিছু শর্তযুক্ত করা হয়েছে। এরসঙ্গে প্রোটেকশন অব এনভায়রনমেন্ট নামে নতুন একটি অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে। যাতে করে ক্ষেত্রের পরিবেশের বিষয়ে ঠিকাদার কোম্পানি আলাদাভাবে দায়িত্ব পালন করে। কার্যক্রমের ৫০ ভাগের বেশি ছেড়ে দেশ থেকে চলে গেলে সরকারের অনুমোদন লাগবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের (যৌথ পর্যালোচনা কমিটি) অনুমোদন না নিয়ে কোনো কাজে খরচ করা যাবে না। কমিটি থেকে কাজের বাজেট অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। খরচ তোলার ক্ষেত্রে (কস্ট রিকভারি) প্রতি বছর ৫৫ শতাংশের বেশি নেয়া যাবে না। জরুরি কোন সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিতে হলে তা ৭২ ঘন্টার মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। পরিত্যাজ্য স্থাপনা অপসারণের জন্য একটি তহবিল তৈরির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আয় থেকে অর্থ সংগ্রহ করে এ তহবিল গঠন করা হবে। তবে সংশ্লি¬ষ্ট প্রতিষ্ঠান যদি নিজ উদ্যোগে পরিত্যাজ্য স্থাপনা অপসারণ করে তাহলে ওই অর্থ ফেরত দেয়া হবে। যে স্থানে অনুসন্ধান হবে: সাগরের ৬১ হাজার ৬৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে নয়টি অগভীর (এসএস) ও তিনটি গভীর সমুদ্র (ডিএস) ক্ষেত্রে গ্যাস তেল অনুসন্ধান করা হবে। এরমধ্যে ১০ হাজার ৪১ বর্গকিলোমিটার এলাকা গভীর সমুদ্রে। বাকি ৫১ হাজার ৫৮৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা অগভীর সমুদ্রে। মোট ১২টি ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে। অগভীর ক্ষেত্রগুলো হলো, দুই, তিন, চার, ছয়, সাত, আট, নয়, ১০ ও ১১ নম্বর। গভীর সমুদ্র ক্ষেত্রগুলো হলো: ১২, ১৬ ও ২১ নম্বর। ক্ষেত্রগুলোর আয়তন: অগভীর সাগরের দুই নম্বর ক্ষেত্রের আয়তন চার হাজার ৪৬৩ বর্গকিলোমিটার। তিন নম্বর ক্ষেত্রের আয়তন পাঁচ হাজার ৪১৫ বর্গকিলোমিটার। চার নম্বর ক্ষেত্রের আয়তন সাত হাজার ২৭১ বর্গকিলোমিটার। এই ব্লকে অবস্থিত সাঙ্গু ছাড়াও মগনামা ‘রিংফেঞ্চ’ বাদ রেখে এই ক্ষেত্রের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হবে। অগভীর সাগরের অন্যান্য ক্ষেত্রের মধ্যে ছয় নম্বর সাত হাজার ৬৯২, সাত নম্বর পাঁচ হাজার ৭৭০, ৮ নম্বর চার হাজার ৭৯৪, নয় নম্বর সাত হাজার ২২, ১০ নম্বর চার হাজার ৬৮৭, ১১ নম্বর চার হাজার ৪৭৫ এবং গভীর সাগরের ১২ নম্বর তিন হাজার ৫১৬, ১৬ নম্বর তিন হাজার ৩৩৫ ও ২১ নম্বর ব্লকের আয়তন তিন হাজার ১৯০ বর্গকিলোমিটার। শুধু মিয়ানমার অংশের ক্ষেত্রগুলোতে অনুসন্ধানের জন্য দরপত্র আহবান করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা থাকায় ভারত অংশে অনুসন্ধানের জন্য এখনো দরপত্র আহবান করা হয়নি।