সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন
অফিস ঘেরাও, বিক্ষোভ
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৫১
জনবল নিয়োগে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগে সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন নিয়োগ বঞ্চিতরা। গতকাল সোমবার সকালে নিয়োগ বাতিলের দাবিতে শত শত বিক্ষুব্ধ প্রার্থী ও তাদের স্বজনরা অফিস চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। এক পর্যায়ে তারা অফিসের বিভিন্ন কক্ষে এবং সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় স্টেনোগ্রাফার ও পিয়ন ছাড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী পালিয়ে যান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ১৭৭টি পদে নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এর পরপরই চাকরি বঞ্চিতরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। তাদের অভিযোগ, সিভিল সার্জন ডা. নাজিমুদ্দিন খান কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জনপ্রতি ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা করে ঘুষ নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেন।
গতকাল বিক্ষোভ সমাবেশে চাকরিপ্রার্থী ইমরান হোসেন বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আমি আবেদন করেছি। মৌখিক পরীক্ষার দিন সিভিল সার্জন আমাকে গোপনে ডেকে বলেন, ৩ লাখ টাকা দিলে তোমার চাকরি হবে। সে মোতাবেক আমি অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোক্তার হোসেন, প্রধান অফিস সহকারী সাইফুল ইসলাম ও হিসাবরক্ষক রেজাউল করিমের মাধ্যমে ৩ লাখ টাকা জমা দেই। কিন্তু প্রকাশিত তালিকায় আমার নাম নেই। যাদের টাকা দিয়েছি অফিসে এসে তাদেরও খুঁজে পাচ্ছি না।’
জেলা চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক রাশেদ ইফসুফ জুয়েল বলেন, পোস্ট অফিসের মাধ্যমে নিয়োগপত্র প্রার্থীদের কাছে পৌঁছানোর নিয়ম থাকলেও অবৈধভাবে কর্মকর্তাদের বাসা থেকে প্রার্থীদের নিয়োগপত্র প্রদান করা হয়েছে। লাখ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তারা তাদের পছন্দের প্রার্থীদের চাকরি দিয়েছেন। তিনি নিয়োগ বাতিল করে দ্রুত পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানান।
সিরাজগঞ্জ হরিজন ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ হরিজন অভিযোগ করে বলেন, কোটা অনুযায়ী ৮০ ভাগ চাকরি হরিজনদের দেয়ার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। তিনি এ নিয়োগ বাতিলের দাবি জানান।
সিভিল সার্জন অফিসের স্টেনোগ্রাফার কামরুল হাসান জানান, চাকরি বঞ্চিতরা সকালে অফিসে এসে সকল রুমে তালা ঝুলিয়ে কর্মচারীদের অফিস থেকে বের করে দেন। তারা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান গেটেও তালা দিয়েছেন।
ঘুষের টাকাসহ হিসাবরক্ষক গ্রেফতার
এদিকে গত শনিবার ঘুষের টাকা ও বেশকিছু নিয়োগপত্রসহ সিভিল সার্জন অফিসের হিসাবরক্ষককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক রাকিবুল হাসান জানান, শহরের স্টেডিয়াম রোডের চাকরি বঞ্চিত গোবিন্দ কুমার দাসের স্ত্রী লক্ষ্মীরানী দাসের মামলার প্রেক্ষিতে সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান সহকারী সাইফুল ইসলামের বাড়ি থেকে বিভিন্ন পদের ৭৬টি নিয়োগপত্র উদ্ধার এবং হিসাবরক্ষক রেজাউল করিমের বাড়ি থেকে নগদ ১ লাখ টাকা ও ১১টি পদের নিয়োগপত্রসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে রেজাউল করিম ঘুষ লেনদেনের কথা স্বীকার করেন। যাচাই-বাছাই শেষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
প্রসঙ্গত, জেলার ৯টি উপজেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য সহকারী, অফিস সহকারী, পরিসংখ্যান, স্টোরকিপার, ওয়ার্ডবয়, সুইপারসহ ১৮৮টি পদে লোক নিয়োগের জন্য চলতি বছরের মার্চ মাসে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এপ্রিল মাসে আবেদন জমা নেয়া হয়। লিখিত পরীক্ষা শেষে গত ৫ নভেম্বর মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়। বিধি অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণের মধ্যে প্রতিটি পদের বিপরীতে ৫ জন করে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। গত ২ ডিসেম্বর নিয়োগ পরীক্ষার রেজাল্টসিট তৈরি করার পর সিভিল সার্জন ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা অজ্ঞাত কারণে ঢাকায় চলে যান। বুধবার রাতে লোক মারফত নিয়োগপত্রের কপিগুলো সিরাজগঞ্জে পাঠানো হয়। পোস্ট অফিসের মাধ্যমে নিয়োগপত্র প্রদানের নিয়ম থাকলেও তড়িঘড়ি করে রাতের আঁধারে প্রার্থীদের ডেকে এনে সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান সহকারী সাইফুল ইসলাম, হিসাবরক্ষক রেজাউল করিম এবং অফিস সহকারী শাহ আলম নিজেদের বাড়িতে বসে নিয়োগপত্র বিলি করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।