বাংলাদেশে কল সেন্টার এবং শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থান
মো. আবদুল্লাহ আল রায়হান (রবিন)
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:৫১
বর্তমানে কল সেন্টার বিশ্বব্যাপী সম্ভাবনাময় একটি ব্যবসা ও পেশা। সারা বিশ্বে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। কল সেন্টারের বাজার অনেক বড়— বিশেষজ্ঞরা মনে করেন প্রায় ৪০০-৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কেট। বৈদেশিক রেমিটেন্স অর্জনে বাংলাদেশের জন্য এটি অনেক বড় একটি সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে বর্তমানে এ সেক্টরে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছে ফিলিপাইন। বাংলাদেশে বর্তমানে ছোট বড় ২০০টি কল সেন্টার তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে এবং প্রায় ১ লাখের মতো দক্ষ জনশক্তি কাজ করছে। এই পেশার এজেন্টদের বেতনভাতাও কম নয়, ১০-২০ হাজার টাকার মতো। তবে দক্ষতার ভিত্তিতে বেতন ও সুবিধাদি আরও বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রে কল সেন্টার-এ একজন এজেন্টের ১ ঘণ্টা সার্ভিস চার্জ সর্বনিম্ন ২৫ ডলার। ভারতে প্রতি ঘণ্টা ১০-১২ ডলার। এতে কোম্পানির খরচ সাশ্রয় হচ্ছে অর্ধেক। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বড় বড় শিল্প কারখানা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাল্লা দিয়ে কস্ট-কাটিং করছে। তাই কল সেন্টারের সার্ভিসগুলো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ থেকে স্বল্প খরচে করিয়ে নেয়ার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে তারা। আমরা যদি প্রতি ঘণ্টা ৬-১০ ডলারে করে দিতে পারি তাহলে আমাদের দেশে কাজ আসবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।
ভারতে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাকরি সুবিধা রয়েছে কল সেন্টার সেক্টরটিতে। কেনিয়া, মিশর, ফিলিপাইন, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাও এ সেক্টরে ভালো পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। কল সেন্টার মার্কেটের ৪% কাজ আসছে ভারতে। ভারত ইতিমধ্যে কল সেন্টার সার্ভিস বা বিপিও খাতে রাজস্ব আয় করছে ৩৩%। আমরা যদি ১% কাজও আনতে পারি সেটাও অনেক বেশি। এতে বৈদেশিক মুদ্রা যেমন আয় করা যাবে তেমনি ব্যাপক কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হবে। গত দুই দশক থেকে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। তাদের কর্মক্ষেত্রের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য কোনো পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এতে কিছুদিন পরে ‘জনসংখ্যার বিষ্ফোরণ’ না বলে বলা হবে ‘শিক্ষিত বেকারের বিষ্ফোরণ’। সে হিসেবে কল সেন্টার শিক্ষিত বেকারদের জন্য একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় ও স্মার্ট পেশা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের জন্য পার্টটাইম জবের কোনো ব্যবস্থা নেই। কল সেন্টার ভালোভাবে দাঁড় করাতে পারলে ছাত্রছাত্রীদের জন্য পার্টটাইম কাজের দ্বার উন্মোচিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, শিক্ষিত বেকার বা সদ্য পাশ করে বের হওয়া ছাত্রছাত্রী, ইংলিশ মিডিয়াম শিক্ষার্থী, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ও দীর্ঘদিন বিদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষিত ব্যক্তি ও অবসরপ্রাপ্ত ডিফেন্সের লোকদের এ সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
কল সেন্টার সেক্টরে যেমন রয়েছে সম্ভাবনা তেমনি রয়েছে সমস্যা। আমাদের দেশে জনশক্তির পর্যাপ্ততা রয়েছে কিন্তু দক্ষ জনশক্তির অভাবও প্রকট। আর এ সেক্টরে ভালো করতে হলে দরকার দক্ষ জনশক্তি। অভিজ্ঞরা বলেন, কল সেন্টারে ভালো করার প্রথম এবং প্রধান অন্তরায়গুলো হচ্ছে কল সেন্টার উপযোগী সাশ্রয়ী টেকনোলজিক্যাল সাপের্ট, উচ্চগতির ইন্টারনেট, আইপিএলসি ফি কমানো, বিদ্যুত্ সরবরাহ ইত্যাদি। কল সেন্টার সেক্টরে পুঁজি কম, আয় বেশি। এর মূল পুঁজি হচ্ছে দক্ষ প্রশিক্ষিত ইংরেজি জানা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে কমিউনিকেট করার যোগ্যতা সম্পন্ন জনশক্তি। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণা করেছেন, কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে, সরকারি পর্যায়ে, পেশাগত পর্যায়ে ডিজিটালাইজেশন না হলে দেশ কীভাবে ডিজিটাল হবে? এগুলো নিয়ে চিন্তা করতে হবে সর্বপ্রথম সরকারকে এবং সচেতন করতে হবে দেশের জনগণকে।
বাংলাদেশে ২০০৮ সালের গোড়ার দিকে এ ব্যবসা নিয়ে হৈচৈ শুরু হয়। কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সকল সম্ভাবনা আস্তে আস্তে চুপসে যাচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্য একটি বড় টার্গেট হতে পারে। আরব আমিরাত, কাতার, সৌদিআরব, বাহরাইন, ওমান এসব দেশ থেকে কল সেন্টার বা বিপিওর কাজ আমরা পেতে পারি। তাছাড়া আরবি ভাষায় দক্ষ জনবল আমাদের দেশে প্রচুর রয়েছে। তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কল সেন্টার সেক্টরে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগানো যেতে পারে। দাবা খেলায় যদি সব সময় আক্রমণ ঠেকানোর পরিকল্পনা থাকে তাহলে কখনোই প্রতিপক্ষকে হারানো যাবে না। আক্রমণ ঠেকিয়ে যদি আক্রমণ করার পরিকল্পনা থাকে তাহলে বিপক্ষকে হারানোর সম্ভাবনা থাকে। তেমনি আমাদের সরকার সবসময় দেশের সমস্যাগুলো রোধের চেষ্টায় থাকেন, কিন্তু উন্নতির জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলো নিয়ে ভাবার সময়ই পান না। সুতরাং উন্নতির সোপানে উন্নীত হওয়ারও সুযোগ হয়ে ওঠে না।
অতএব, সরকার সব দিক চিন্তা করে, এসব বিষয় বিবেচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন বলে আমরা আশা করছি।
ঢাকা