গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ

কি শো র গ ঞ্জ

পাকবাহিনীর আগমন: ১৯ এপ্রিল বিকালে পাকসেনারা কিশোরগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনের পূর্ব পাশে সিগন্যাল পয়েন্টের নিকট তাদের প্রথম হত্যার শিকার হন জজ মিয়া নামে এক ব্যক্তি। এরপর তারা শহরের পুরানথানা এলাকায় জাহাঙ্গীর মামু নামে এক সাধুকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর তারা হত্যা করে পান দোকানদার বীরেন্দ্র সরকার, যতীন্দ্র পাল, জ্ঞানদাসুন্দরী সরকার ও তার পুত্র দুলু সরকার, রমেশ চন্দ্র দে, আব্দুল খালেক ভুঁইয়া, আব্দুল খালেকসহ অনেককে। শহরের অনেক বাড়ি-ঘর, দোকান-পাটে আগুন লাগিয়ে দেয় পাক বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। ২১ বীর তরুণের যুদ্ধযাত্রা: বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকেই বাঙালি জাতি বুঝে গিয়েছিল যে, সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়া এ জাতির মুক্তির আর কোন উপায় নেই। এলাকায় এলাকায় শুরু হয়ে গিয়েছিল ট্রেনিং। কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ও আজিমউদ্দিন হাইস্কুল মাঠে ডামি রাইফেল দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। প্রশিক্ষক ছিলেন আব্দুর রশিদ নামে এক সৈনিক ও একজন আনসার সদস্য। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়ে কিশোরগঞ্জের ২১ জন তরুণ সিদ্ধান্ত নেন তারা মুক্তিযুদ্ধে যাবেন। ’৭১-এর ১৪ এপ্রিল তারা ভারতের ত্রিপুরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। এদের মধ্যে ছিলেন- শহীদ মো. আতিকুর রহমান আতিক, নূরুল ইসলাম খান পাঠান বীরপ্রতীক, এ কে এম রফিকুল হক বীরপ্রতীক, মো. কামরুজ্জামান কমরু, বাশিরউদ্দিন ফারুকী, মো. খলিলুর রহমান, এ কে এম মুর্শেদুল হক মুর্শেদ, খায়রুল বাশার খান পাঠান (সিরু পাঠান), মো. ফজলুর রহমান বাচ্চু, মো. নাজিমউদ্দিন, প্রদীপ চন্দ্র সরকার ভজন, মো. পরশ আলী, শামসুল আলম বকুল, বিমল রঞ্জন সরকার, আব্দুর রশিদ, মো. বাবুল, আনিসুল হক সঞ্জু, রেজাউল করিম ও আজিজুল হকসহ মোট ১৯ জন (দুইজনের নাম জানা যায়নি)। কয়েকটি বধ্যভূমি: মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনা ও তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন কিশোরগঞ্জের অনেক নিরীহ মানুষ। লোকজনদের ধরে নিয়ে সারাদিন বেঁধে রাখা হতো জেলা পরিষদের ডাকবাংলোর সামনের মাঠে এবং রাতের বেলায় কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গুলি করে কিংবা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হতো। এসব বধ্যভূমির মধ্যে ছিল কিশোরগঞ্জ-ময়মনসিংহ রেলপথের মুশুলী রেলস্টেশন সংলগ্ন কালীগঞ্জ রেলব্রিজ, গচিহাটা স্টেশন সংলগ্ন ধুলদিয়া রেলব্রিজ, কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশন সংলগ্ন সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি ঘাট, মনিপুর ঘাট ব্রিজ, শোলমারা ব্রিজ, নীলগঞ্জ বাজার ব্রিজ, পানাউল্লারচর, মেঘনা রেল ব্রিজ, বাগমারা ব্রিজ, বয়রা বটমূল, হোসেনপুর উপজেলা সদরে হনুমানতলা ব্রিজ প্রভৃতি। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার মো. আসাদউল্লাহ ও ডেপুটি কমান্ডার আব্দুল মান্নান জানান, কিশোরগঞ্জে মোট ২৪টি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে। বড়ইতলা গণহত্যা: পাকসেনা ও তাদের দোসরদের হাতে সবচেয়ে বড় হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বড়ইতলা গ্রামে। তারিখটি ছিল ১৩ অক্টোবর। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ওই দিন ৩৬৫ জন নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল। সেদিন বেলা আড়াইটার দিকে তিনটি বগীভর্তি একটি বিশেষ ট্রেনযোগে আসে পাক মিলিশিয়া ও রাজাকারদের একটি দল। তারা যশোদল স্টেশনের কাছে বড়ইতলায় এসে নামে। ট্রেন থেকে নেমেই তারা পার্শ্ববর্তী দামপাড়া, চিকনীরচর, কালিকাবাড়ি, তিলকনাথপুর ও গোবিন্দপুর গ্রামে ঢুকে পড়ে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। আতঙ্কিত লোকজন বাড়ি-ঘর ছেড়ে নরসুন্দা নদীর পারে একটি আঁখ ক্ষেতে এসে আশ্রয় নেন। পরে মিলিশিয়া ও রাজাকাররা ক্ষেত ঘেরাও করে ফেলে এবং পাঁচ শতাধিক নিরীহ ব্যক্তিকে ধরে এনে বড়ইতলা গ্রামে রেললাইনের পাশে জড়ো করে। এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক ব্যক্তি নামাজ পড়ার অজুহাতে পার্শ্ববর্তী মসজিদে আশ্রয় নেয়। এরপর রেললাইনের পাশে জড়ো করা শত শত নিরীহ মানুষের ওপর ব্রাশফায়ার চালায় পাকবাহিনী। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়েও হত্যা করা হয় অনেককে। গুলি খেয়ে কয়েকজন মৃতের ভান করে পড়ে থেকে কোনরকমে বেঁচে যান। বড়ইতলার সেই নির্মম গণহত্যার হাত থেকে যারা কোনরকমে বেঁচে এসেছিলেন, তারা সেদিনের কথা মনে করে আজো ভয়ে শিউরে ওঠেন। কয়েকজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা: কিশোরগঞ্জ শহরের আজিমউদ্দিন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মতিয়ূর রহমানের পুত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আতিকুর রহমান আতিক ৪ জুলাই ভৈরবে এক অপারেশনকালে গ্রেনেড বিস্ফোরণে শহীদ হন। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া এলাকার আব্দুল হাই তালুকদারের পুত্র ময়মনসিংহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র খায়রুল জাহান ২৬ নভেম্বর প্যারভাঙ্গা নামক স্থানে পাকবাহিনী ও রাজাকারের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বিন্নাটি গ্রামের জমিরউদ্দিনের পুত্র সোমরাজ কামালিয়ারচর বালুকার বিলে রাজাকার বাহিনীর সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে আহত হন। রাজাকাররা তাকে ধরে সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি সংলগ্ন বধ্যভূমিতে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। কিশোরগঞ্জ শহরের কুটিগির্দী এলাকার মনসুর আলীর পুত্র সিরাজুল হক ছিলেন কিশোরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণীর ছাত্র। দেশমাতৃকাকে মুক্ত করার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে তিনি চলে যান ভারতে এবং ঢালু ক্যাম্পে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১২ নভেম্বর গোপনে পিতা-মাতাকে একনজর দেখার জন্য বাসায় এলে খবর পেয়ে রাজাকাররা তাকে আটক করে এবং পাকসেনাদের হাতে তুলে দেয়। ঐ রাতেই তাকে ধুলদিয়া রেল ব্রিজ বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়। কিশোরগঞ্জের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা:কিশোরগঞ্জে মোট ২০ জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। এরা হলেন- শহীদ লে. কর্নেল এ. টি. এম হায়দার (বীরউত্তম), এ. কে. এম রফিকুল হক (বীরপ্রতীক), সুবেদার মেজর ইদ্রিস মিয়া (বীরপ্রতীক), ক্যাপ্টেন (অব.) ডা. সেতারা বেগম (বীরপ্রতীক), শহীদ খায়রুল জাহান (বীরপ্রতীক), শহীদ লে. আবু মইন মো. আশফাকুস সামাদ (বীরউত্তম), অনারারি ক্যাপ্টেন এম. এ. জব্বার (বীরপ্রতীক), শহীদ মো. সিরাজুল ইসলাম (বীরবিক্রম), শহীদ মো. বদিউল আলম বদি (বীরবিক্রম), মো. মতিয়ূর রহমান (বীরবিক্রম), ক্যাপ্টেন এ. ওয়াই. এম. মাহফুজুর রহমান (বীরবিক্রম), মেজর জেনারেল (অব.) মো. আব্দুল মতিন (বীরপ্রতীক), মেজর জেনারেল (অব.) মো. আইনউদ্দিন (বীরপ্রতীক), মেজর সাফায়েত জামিল (বীরবিক্রম), শহীদ সিপাহী মো. লিলু মিয়া (বীরবিক্রম), শহীদ মো. সেলিম (বীরপ্রতীক), নায়েক সুবেদার নাজিমউদ্দিন (বীরপ্রতীক), মো. নুরুল ইসলাম খান পাঠান (বীরপ্রতীক), সিপাহী হারুনর রশীদ (বীরপ্রতীক) ও শহীদ সিপাহী আমির হোসেন (বীরপ্রতীক)। মুক্তি এল যেভাবে: একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সমগ্র বাঙালি জাতি যখন বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত, ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে যখন সারা দেশের আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত, সেদিনও কিশোরগঞ্জ শহরবাসী ছিল পাক হানাদারদের দোসর রাজাকার, আলবদর আর আল শামস বাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ। ভয়ে সেদিনও মানুষ ঘর ছেড়ে বের হতে পারেনি, পারেনি লাল-সবুজের পতাকা আকাশে উড়িয়ে বিজয়ের উল্লাসে মেতে উঠতে। ১৭ ডিসেম্বর সকালে স্বাধীনতা বিরোধীরা মুক্তিবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ২৩ মার্চ কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক রথখলা ময়দানে ছাত্রলীগের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভা। এই জনসভাতেই পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত লাল-সবুজ পতাকা। মুক্তিযোদ্ধারা কেমন আছেন: গেজেট অনুযায়ী কিশোরগঞ্জ জেলায় মোট মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৩ হাজার ৫৯১ জন। তন্মধ্যে ৩ হাজার ২৩৮ জন সরকারি ভাতা পাচ্ছেন বলে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ইউনিট কার্যালয় থেকে জানা যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশই অসচ্ছল। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুবই কষ্টে আছেন তারা।