ভালো কাজ করলে ওসিদের বদলি করেন খুলনার ডিআইজি!

সন্ত্রাসী হামলার শিকার তিন সংখ্যালঘু গৃহবধূর বিরুদ্ধে উল্টে হামলাকারীর মামলা না নেয়ার ‘অপরাধে’ বটিয়াঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হেলালউদ্দিনকে বদলি করলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মেজবাহ উদ্দিন! আইনের শাসনের পক্ষে অনড় থাকায় ওসির যেখানে পুরস্কার পাওয়া উচিত ছিল সেখানে তাকে তিরস্কার ও শাস্তি দেয়ার অবিশ্বাস্য এই ঘটনার জন্ম দিয়ে উপজেলায় চরম ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি করেছেন তিনি। ওই আসনের বর্তমান এমপি, সাবেক সব ক’জন এমপি, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সবগুলো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় প্রধানগণ, উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলার সব কটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সাধারণ জনগণ ডিআইজির এই সিদ্ধান্তে চরম ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে উপজেলার জনগণের স্বার্থে এই বদলি আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। আর দুষ্টের পরিবর্তে শিষ্টকে সাজা দেয়ার নজির সৃষ্টি করায় উপজেলার ক্ষুব্ধ জনগণ ডিআইজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তাদের দাবি, যে ডিআইজি তার থানার ওসিদের দুর্বৃত্তদের পক্ষে কাজ করতে নির্দেশ দেন এবং নির্দেশ পালন না করলে বদলি করেন, সেই ডিআইজির এলাকাধীন সাধারণ মানুষ নিরাপদ নয়। এ ব্যাপারে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছেন, ঘটনাটি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুলিশ বিভাগের মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। যেভাবে ঘটনার শুরু : আহত তিন গৃহবধূ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, গত ২ ডিসেম্বর বটিয়াঘাটার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি জায়গা দখল করতে আসেন খুলনা শহরের বয়রা এলাকার জনৈক আব্দুল হাদী। মোটরসাইকেল ও নসিমনযোগে তার সঙ্গে আসে একদল সহযোগী। দখলে বাদা দিতে ওই হিন্দু পরিবারটির সদস্য ৩ জন গৃহবধু তাদের বাধা দিতে এগিয়ে যান। কিন্তু দুর্বৃত্তরা তাদেরকে দা দিয়ে কুপিয়ে ও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে জখম করে শহরে ফিরে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তিন গৃহবধু গীতা মন্ডল (৪৫), বেবী রানী বালা (৩০) ও ছনেকা বালাকে (৩৬) বটিয়াঘাটা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এই হামলার খবর ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হলে এলাকায় তোলপাড় সৃষ্টি হয় ও হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি ওঠে। কিন্তু হাদী পরে তাদের বিরুদ্ধেই মামলা গ্রহনের জন্য বটিয়াঘাটার ওসির উপর চাপ সৃষ্টি করেন। হাদীর দুলাভাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চাকরি করেন। দুলাভাইয়ের ক্ষমতার বলে বলীয়ান হয়ে শ্যালক হাদী ওসিকে বদলির ভয়ভীতি দেখাতে থাকেন। কিন্তু মিথ্যা মামলা নেয়া তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে ওসি জানিয়ে দেন। জানা গেছে, গত সপ্তাহে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মেজবাহ উদ্দিন ওসিকে ডেকে পাঠান। তিনি ওসিকে হামলার শিকার সংখ্যালঘু ওই পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হাদীর মামলা নিতে বলেন। কিন্তু এই অন্যায় নির্দেশ পালনে ওসি অপারগতা প্রকাশ করেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটির বিরুদ্ধে মামলা না নিলে ডিআইজি বদলির ভয় দেখান ওসিকে। কিন্তু তারপরেও অপারগতা প্রকাশ করে ওসি তার কর্মস্থলে ফিরে আসেন। পরদিনই খবর আসে, তাকে খুলনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ক্লোজড করা হয়েছে। খবরটি উপজেলায় ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ জনগণ ও জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এই সংসদীয় আসন থেকে (খুলনা-১) নির্বাচিত এমপি ননী গোপাল মন্ডল ইত্তেফাককে বলেন, ওসি হেলাল উদ্দিন অবশ্যই একজন যোগ্য ও ভাল অফিসার। তিনি ন্যায়ের পথে থাকায় এবং সংখালঘুদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা গ্রহন না করায় ডিআইজি তাকে অন্যায়ভাবে বদলি করেছেন। অপরদিকে সাবেক এমপি, খুলনা জেলা আওয়ামীলীগের বর্তমান সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, সাবেক বিরোধী দলীয় হুইপ শেখ হারুনুর রশীদ ইত্তেফাকের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওসি হেলাল উদ্দিন অবশ্যই একজন সত্ অফিসার। তাকে ডিআইজি এভাবে বদলি করায় বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এদিকে, এই আসনের সাবেক এমপি ও বটিয়াঘাটা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পঞ্চানন বিশ্বাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই উপজেলার জনগণের স্বার্থে হেলালউদ্দিনের মতো সত্ ওসিকে দরকার। তাকে এমন অন্যায়ভাবে বদলি করা এলাকার মানুষ মেনে নিতে পারেনি। তিনি সংখ্যালঘুসহ সব সমপ্রদায়ের মানুষের ভরসাস্থল ছিলেন। বটিয়াঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম খান বলেন, হেলালউদ্দিন এখানে যোগদানের পর থানা একদম দালালমুক্ত হয়। অন্যায়ভাবে জমি দখল ও ঘরবাড়ি দখলের ঘটনা বন্ধ হয়ে যায়। যিনি সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হয়ে ওঠেন তাকে বদলি করার ঘটনা অবশ্যই সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কজনক সংবাদ। একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও। ন্যাপের (মোজাফ্ফর গ্রুপ) সভাপতি নগেন্দ্র নাথ মন্ডল বলেন, একজন ভাল অফিসারকে এভাবে বদলি করায় আমরা অবশ্যই ক্ষুব্ধ ও হতাশ। গঙ্গারামপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গণি বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে চেয়ারম্যান হিসেবে পুলিশের সাথে কথা বলে আসছি। কিন্তু এমন সত্ অফিসার আজও আমার চোখে পড়েনি। তাকে অন্যায়ভাবে বদলির নিন্দা জানাচ্ছি। তাছাড়া বটিয়াঘাটার মনোরঞ্জন মন্ডল, ভান্ডারকোটের ইসমাইল হোসেন বাবু, জলমার আব্দুল গফুর মোল্ল্যা, সুরখালীর (ভারপ্রাপ্ত) সাকিব হোসেন, বালিয়াডাঙ্গার গোলাম হাসান, আমীরপুরের খায়রুল ইসলাম জনি প্রমুখ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা একই ভাষায় ওসিকে বদলির নিন্দা জানিয়েছেন। প্রত্যেকের একই দাবি, এই বদলি আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করে বটিয়াঘাটা থানায় পুনর্বহাল করা হোক। তারা মনে করেন, ডিআইজির এই পদক্ষেপ সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করবে। এ ব্যাপারে ঘটনার শিকার ওসি হেলাল উদ্দিন কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। অপরদিকে, ডিআইজি মেজবাহ উদ্দিনের মন্তব্য জানার জন্য গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর থেকে ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে তার ব্যক্তিগত ও অফিসিয়াল ফোন নাম্বারে অগণিতবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাই তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। ইতিমধ্যে দাকোপ থানার ওসিকে বটিয়াঘাটায় বদলি করে আনা হয়েছে।