কিংবদন্তি সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবি শঙ্কর

প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের মিলনসুরের সাধক

রবি শঙ্করের বড় ভাই উদয় শঙ্কর মস্ত নৃত্যশিল্পী। কথা ছিল, তিনিও নৃত্যশিল্পী হবেন। ছেলেকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে মা হেমাঙ্গিনী প্যারিস যাত্রা করলেন। বড় ভাই উদয় তখন প্যারিসেই থাকতেন। ১৯৩০ সালে মায়ের সাথে প্যারিসে বড় ভাইয়ের কাছে যান ১০ বছরের বালক রবি শঙ্কর এবং সেখানেই আট বছর স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ করেন। বারো বছর বয়স থেকেই তিনি বড় ভাইয়ের নাচের দলের একক নৃত্যশিল্পী ও সেতারবাদক। ওই বয়স থেকেই তিনি অনুষ্ঠান করে বেড়িয়েছেন ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে। নাচের দলে তার বেশ সুনামও ছিল। একহারা গড়নের সেই নাচের ছেলেটা নাচ ছেড়ে দিয়ে সুরের জগতে পা রাখল। সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল না। বিশ্বসংগীতের অন্যতম দিকপাল, কিংবদন্তি সেতারবাদক রবীন্দ্র শঙ্কর চৌধুরী; যিনি রবি শঙ্কর নামেই বিশ্বব্যাপী পরিচিত—তিনিই নাচ ছেড়ে সুরের সন্ধানে যাত্রা শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্র শঙ্করের (ডাকনাম রবু) আদি পৈতৃক বাড়ি বাংলাদেশের নড়াইল জেলার কালীয়া উপজেলায়। তাঁর জন্ম হয় ভারতের উত্তরপ্রদেশের শহর বানারসে। রবি শঙ্কর ছিলেন চার ভাইয়ের মধ্যে ছোট। বাবা শ্যাম শঙ্কর ছিলেন একজন প্রথিতযশা জ্ঞানী, রাজনীতিবিদ ও আইনজ্ঞ। কিন্তু তাঁর প্রায় পুরো ছেলেবেলাই বাবার অনুপস্থিতিতে কেটে যায়। মা হেমাঙ্গিনী আর বড় ভাই উদয় শঙ্করের কঠোর অনুশাসনে বড় হন তিনি। ১৮ বছর বয়সে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের মাইহার ঘরানার স্রষ্টা আচার্য আলাউদ্দীন খাঁর অনুপ্রেরণায় ভারত ফিরে আসেন রবি শঙ্কর। রবি শঙ্কর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্য এবং সংগীতকে পাশ্চাত্য-বিশ্বের কাছে প্রথম জনপ্রিয় করে তোলেন। দীর্ঘ সাত দশক ধরে বিশ্বের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিয়েছেন ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সুর। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘতম কর্মজীবনের জন্য গিনেস রেকর্ডের অধিকারীও হন এই অসামান্য সুরস্রষ্টা ও সেতারবাদক রবি শঙ্কর। রবি শঙ্করের সংগীত-ব্যক্তিত্বের দুটি ভিন্ন দিক রয়েছে। উচ্চাঙ্গ সেতারশিল্পী হিসেবে তিনি সব সময়ই ঐতিহ্যমুখী ও শুদ্ধতাবাদী। কিন্তু সংগীত রচয়িতা হিসেবে তিনি সব সময়ই নিজের সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছেন। ১৯৬৬ সালে বিটলসের জর্জ হ্যারিসনের সাথে যোগাযোগের আগে থেকেই তিনি সংগীতের বিভিন্ন ধারা ও তার প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন। এ সময় তিনি জ্যাজ সংগীত, পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সংগীত ও লোকসংগীত নিয়ে কাজ করেছেন। দীর্ঘদিন বিশ্বখ্যাত বিটলস ব্যান্ডের সঙ্গে থেকে সুর নিয়ে কাজ করেছেন। ১৯৬৫ সালে বিটলসের জর্জ হ্যারিসন সেতারের সুর নিয়ে গবেষণা শুরু করলে রবি শঙ্করের সাথে তাঁর যোগাযোগ হয় এবং পরবর্তী সময়ে তা বন্ধুত্বে গড়ায়। এই বন্ধুত্ব রবি শঙ্করকে অতি দ্রুত আন্তর্জাতিক সংগীত পরিমণ্ডলে নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টিতে সাহায্য করে। রবি শঙ্কর পপ সংগীতের গুরু জর্জ হ্যারিসনের ‘মেন্টর’ হিসেবে পাশ্চাত্য সংগীতজগতে সমাদৃত হন। ফলে রবি শঙ্কর এমন সব সংগীত-উত্সবে সংগীত পরিবেশনের আমন্ত্রণ পেয়েছেন, যেখানে শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশনের উপযোগী পরিবেশ ছিল না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘মন্টেরি পপ ফেস্টিভ্যাল’, মন্টেরি, ক্যালিফোর্নিয়ার এ অনুষ্ঠানে ওস্তাদ আল্লারাখা তবলায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন। ১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে করা বেশ কয়েকটি কনসার্ট তাঁর ক্যারিয়ারে অভাবনীয় সফলতা এনে দিয়েছিল। অনুষ্ঠানের পর তাঁকে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এ ছাড়া ১৯৬৯ সালে তিনি উডস্টক ফেস্টিভ্যালে সংগীত পরিবেশন করেছিলেন। পণ্ডিত রবি শঙ্করের অমর কীর্তি হচ্ছে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সংগীতের মিলন। পাশ্চাত্য সংগীতের বিখ্যাত বেহালাবাদক ইয়াহুদি মেনুহিনের সঙ্গে সেতার-বেহালার কম্পোজিশন তাঁর এক অমর সৃষ্টি, যা তাঁকে আন্তর্জাতিক সংগীতের এক উচ্চ আসনে বসিয়েছে। তিনি আরও একটি বিখ্যাত সংগীত কম্পোজিশন করেছেন, বিখ্যাত বংশীবাদক জ্যঁ পিয়েরে, জাপানি বাঁশির সাকুহাচি গুরু হোসান ইয়ামামাটো এবং কোটো (ঐতিহ্যবাহী জাপানি তারযন্ত্র) গুরু মুসুমি মিয়াশিতার জন্য। ১৯৯০ সালে বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ ফিলিপ গ্রাসের সঙ্গে যৌথ প্রযোজনা প্যাসেজেস তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। ২০০৪ সালে পণ্ডিত রবি শঙ্কর ফিলিপ গ্রাসের ওরিয়ন প্রযোজনায় সেতার অংশের সংগীত রচনা করেন। রবি শঙ্কর নিজেই স্বীকার করেন, বড় ভাই উদয় শঙ্করের নাচের দলে কাজ করতে করতেই সেতারের দিকে ঝোঁকেন তিনি। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গে যখন তাঁর দেখা হয়, তখন তিনি মাত্র ১৫ বছরের। তাঁর অনুপ্রেরণায় শুরু হয় সংগীতের নতুন ধারার উন্মোচন। আলাউদ্দিন খাঁর কাছে সাত বছর তালিম নিয়েছিলেন তিনি। সেটি ছিল ১৯৩৮ সাল। নাচের দল ছেড়ে মাইহারে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অমর শিল্পী ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর কাছে সেতারে দীক্ষা নিতে শুরু করেন। দীক্ষা গ্রহণকালে তিনি ওস্তাদেরর ছেলে সরোদের অমর শিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খাঁর সংস্পর্শে আসেন। তাঁরা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানে সেতার-সরোদের যুগলবন্দী বাজিয়েছেন। গুরুগৃহে রবি শঙ্কর ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত সেতারে সংগীত শিক্ষাগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে ভারতের আহমেদাবাদ শহরে রবি শঙ্করের সর্বপ্রথম সাধারণের জন্য উন্মুক্ত একক অনুষ্ঠানে সেতার পরিবেশন করেন। সেই থেকে পণ্ডিত রবি শঙ্কর নিজেকে তুলে ধরেছেন একজন বৈশ্বিক সংগীতজ্ঞ, সংগীতস্রষ্টা এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন মেধাবী দূত হিসেবে। ১৯৪৫ সাল নাগাদ রবি শঙ্কর সেতার বাদক হিসেবে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রীয় সংগীতের একজন শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যান। এ সময়ে রবি শঙ্কর তাঁর সাংগীতিক সৃজনশীলতার অন্যান্য শাখায়ও পদচারণা শুরু করেন। তিনি সুরসৃষ্টি, ব্যালের জন্য সংগীত রচনা এবং চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেন। এ সময় বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘ধরত্রী কি লাল’ এবং ‘নীচা নগর’রে সংগীত রচনা ও সুরারোপ করেন। তিনি কবি আল্লামা ইকবালের সারে জাহাঁসে আচ্ছা কবিতাকে অনবদ্য সুরে ভারতীয় জাতীয় সংগীতের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় গান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ১৯৪৯ সালে রবি শঙ্কর দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর সংগীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। একই সময়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বৈদ্য বৃন্দ চেম্বার অর্কেস্ট্রা। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত রবি শঙ্কর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সংগীতসৃষ্টিতে মনোযোগী হন। এ সময়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হলো সত্যজিত্ রায়ের অপু ট্রিলজি (পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার) চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা। পরবর্তীকালে তিনি চাপাকোয়া (১৯৬৬), চার্লি (১৯৬৮) ও গান্ধী (১৯৮২)-সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। ১৯৬২ সালে পণ্ডিত রবি শঙ্কর কিন্নর স্কুল অব মিউজিক, বম্বে ও ১৯৬৭ সালে কিন্নর স্কুল অব মিউজিক, লসঅ্যাঞ্জেলেস স্থাপন করেন। ইলেকট্রনিক মিউজিক একেবারেই পছন্দ করতেন না রবি শঙ্কর। ক্ষোভ ছিল হেভি মেটালের প্রতিও। তবে তরুণদের প্রশংসা করতে বা তাদের শিক্ষা দিতে কোনো কার্পণ্য ছিল না তাঁর। বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে ম্যাডোনা বা হালের লেডি গাগার মিউজিক ভিডিওর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন তিনি। এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘১৯৬৬ সালে আমি যখন জর্জ হ্যারিসনের সাথে কাজ শুরু করি, আমি একজন পপ স্টারের মতো হয়ে উঠেছিলাম। যেখানেই যাচ্ছিলাম, স্বীকৃতি পাচ্ছিলাম। কিন্তু সেটা আমি একদমই পছন্দ করিনি।’ স্বীকৃতির ধার ধারেননি তিনি; তবু কোনো স্বীকৃতি তাঁর পিছু ছাড়েনি। সংগীতে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রভূত সম্মান আর সম্মাননা লাভ করেছেন রবি শঙ্কর। ১৯৬২ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদক; ১৯৮১ সালে পদ্মভূষণ; ১৯৮৬ সালে রাজ্যসভার সদস্য মনোনীত হন; ১৯৯১ সালে ফুকোদা এশিয়ান কালচারাল প্রাইজেসের গ্র্যান্ড প্রাইজ; ১৯৯৯ সালে ভারতরত্ন; ২০০০ সালে ফরাসি সর্বোচ্চ সিভিলিয়ান অ্যাওয়ার্ড লিজিয়ন অব অনার; ২০০১ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক প্রদত্ত অনারারি নাইটহুড; ২০০২ সালে দুটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড; ভারত-সরকার কর্তৃক প্রদত্ত পদ্মবিভূষণ, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত দেশিকোত্তম। সর্বশেষ গ্র্যামির মরণোত্তর আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন। এ ছাড়া ১৯৮২ সালে তিনি ‘গান্ধী’ ছবির গানের জন্য অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। ১৯৫৭ সালে বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে রবি শঙ্কর ‘কাবুলিওয়ালা’ চলচ্চিত্রে গানের জন্য সিলভার পদক লাভ করেন। ১৯৬২ সালে পান সংগীত নাটক একাডেমি পদক। ২০০৩ সাল পর্যন্ত ৬০টি মিউজিক অ্যালবাম করেছেন রবি শঙ্কর। আমৃত্যু বিশ্বসংগীতকে দিয়েই গিয়েছেন তিনি। নিজের কন্যাদেরও প্রতিষ্ঠিত করেছেন সংগীতজ্ঞ হিসেবে। দশটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড-জয়ী নোরা জোন্স পিতা রবি শঙ্করের সুযোগ্য কন্যা। অন্য দিকে আনুশকা শঙ্কর বাবার থেকেই শিখেছেন সেতারবাদন। তিনিও আন্তর্জাতিক মহলে খ্যাতনামা সেতারবাদক। সুরের ইতিহাসের এই কিংবদন্তির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।