বাংলাদেশে হেমাঙ্গ বিশ্বাস-চর্চা

এ বছর উপমহাদেশের গণসংস্কৃতি আন্দোলনের অগ্রগামী সেনা, গণগায়ক, সংগীতকার, শিল্পীসংগ্রামী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্মের শতবছর পূর্ণ হলো। ভারতের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কালপর্বে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলা গণসংগীতের প্রবাদপ্রতিম স্রষ্টা এবং শিল্পীসংগ্রামী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। প্রায় এক দশকব্যাপী বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধ আন্দোলনের পরিণতিতে ১৯১২ সালের ১ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত করেছিল। সেই একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর হেমাঙ্গ বিশ্বাস বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার চুনুরুঘাট থানার মীরাশি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পিতা হরকুমার বিশ্বাস ও মাতা সুরজিনী দেবী। পিতা ছিলেন ক্ষুদে জমিদার। হেমাঙ্গ বিশ্বাস গণসংগীতে দিয়েছেন নতুন মাত্রা। বলা যায় বাংলা গণসংগীতের ধারাটি তাঁর হাত ধরেই বিকাশের উচ্চমাত্রায় পৌঁছেছে। গণসংগীতে লোকসংগীতের সুর ব্যবহার করে এই সংগীতকে জনগণের কাছে নিয়ে গেছেন। লোকসংগীত এবং গণসংগীতে পরস্পর সম্পর্ক ও পার্থক্যের বিষয়টিকেও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, গণসংগ্রামের চেতনায় উদ্বুদ্ধ লোকসঙ্গীতের ধারাটি গণসংগীতেরই অন্তর্গত, কিন্তু গণসংগীতমাত্রই লোকগীতি নয়। গণসংগীত কথাটা অনেক বেশি ব্যাপক। স্বদেশি সংগীত বা দেশাত্মবোধক গীত বলতে আমরা যা বুঝি, তার সাথে ভাবে ও ভঙ্গিতে একটা পার্থক্য বোঝাবার জন্যই গণসংগীত বা গণগীতি কথাটার উত্পত্তি। বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম স্বদেশচেতনা এবং পরাধীনতার বেদনাবোধে যে গীতির জন্ম, তাকে আমরা স্বদেশি সংগীত কিংবা দেশাত্মবোধক সংগীত বলে থাকি। সেই স্বদেশি সংগীতের একটা বড় অংশ ধর্মীয় পুনরুজ্জীবনবাদের আদর্শে প্রভাবিত ছিল। সেসব গানের সাথে দেশাত্মবোধের আবেগ ও বেদনা থাকলেও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের চেতনা ছিল না। দেশের মুক্তির সঙ্গে শোষণমুক্তির চিন্তার মিলন ঘটেনি। তিনি বলেন, আমার অধিকাংশ গানের সুর উত্পাদনকারী শ্রমজীবীদের সৃষ্টি। তাঁর মতে, জনগণের চেনা-জানা পরিচিত আঙ্গিকে বিপ্লবী বিষয়বস্তু পৌঁছে দেওয়ার সঠিক রাস্তা। বিভিন্ন ঘটনা আর আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেক্ষিতেই তিনি গান রচনা করেছেন। তিনি বলেন, আমার গান আমার একার সৃষ্টি নয়, একটা আন্দোলনের সৃষ্টি। দেশাত্মবোধক গান বিষয়গত ও রূপগত—উভয় দিক দিয়েই কেবল স্বদেশি। তাতে শ্রেণীচেতনা নেই, নেই শোষণমুক্তি এবং মেহনতি জনগণের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী চেতনা। গণসংগীতে থাকে মেহনতি মানুষের আন্তর্জাতিক ঐক্য ও সহমর্মিতার বাণী। তবে তা রূপগতভাবে হতে হবে অবশ্যই দেশীয়। অজস্র রূপগত আত্তীকরণে রয়েছে তার স্বচ্ছন্দ অবাধ ও পরিপূর্ণ অধিকার। সে কাজটি যোগ্যতার সাথে সার্থকভাবে করেছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। গণসংগীত জনগণের সম্পদ। জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তার উদ্ভব। জনগণের প্রযত্ন ও পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া তার বিকাশ ও সমৃদ্ধি কোনোমতেই সম্ভব নয়। সে কারণে নিষ্ঠার সাথে, একাগ্রতার সাথে জনগণের সেবা করাই গণসংগীতের প্রধান ও একমাত্র কর্তব্য। ১৯৪০-এর দশকে প্রধানত তাঁর সাথে কলকাতা কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের যোগযোগ গড়ে ওঠে। তাঁর আগে অসমীয় সাংস্কৃতির অগ্রগণ্য ব্যক্তিত্ব জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস স্বদেশি আন্দোলন থেকে সমাজপরিবর্তনের মতাদর্শিক রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিলেন। বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠিত আন্দোলনের গান লিখছেন—নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। ১৯৪৭-এ দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হলে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গভীর মর্মবেদনা অনুভব করেন। তাঁর শৈশবস্মৃতি তাঁকে ভারাক্রান্ত করে তোলে। তিনি লেখেন, ‘পদ্মা কও কও আমারে’সহ নানা গান। দেশ বিভাগের পর হেমাঙ্গ বিশ্বাস কলকাতা কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কিন্তু বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তিনি তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন গানে গানে। লিখেছেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে নিয়ে ‘শোনো দেশের ভাই-ভগিনী, শোনো আচানক কাহিনী। কান্দে বাংলা জননী ঢাকা শহরে’। তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনেক গান দেশের বিভিন্ন জায়গায় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো পরিবেশন করত। রাজনীতিক আন্দোলনের পাশাপাশি তখন সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও যথেষ্ট জোয়ার তৈরি হয়েছিল। ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন বা আইয়ুব-বিরোধী গণ-আন্দোলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান উদ্দীপ্ত করেছে সবাইকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান কিছু কিছু গাওয়া হতো। শোনা যায়, সেসব গানের গীতিকার বা সুরকারের পরিচয় দেওয়া হতো না প্রায়ই। সাধারণে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের তেমন পরিচিতি ছিল না বললেই চলে। ১৯৮১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর গানের দল ‘মাস সিঙ্গারস’ নিয়ে বাংলাদেশে আসেন এবং ঢাকা-গাজীপুরসহ অনেক জায়গায় সংগীত পরিবেশন করেন। তখন থেকে হেমাঙ্গ বিশ্বাস বেশ পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাঁর গানও বেশ গাওয়া হতে থাকে। আশির দশকে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের ক্যাসেট সংগ্রহ করে বাম-প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো। তাঁর গান লিখেও বিভিন্ন জায়গায় পরিবেশন করা হতো। ধীরে ধীরে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান দেশব্যাপী প্রসার লাভ করে, পরিবেশিত হতে থাকে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে। একই সাথে হেমাঙ্গ বিশ্বাস সম্পর্কে আগ্রহ বাড়তে থাকে তরুণ শিল্পীদের কাছে। ধীরে ধীরে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সাংস্কৃতিক আন্দোলন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক ভাবনা—ইত্যাদি বেশ গুরুত্বের সাথে আলোচনায় আসতে শুরু করে। ১৯৮৭ সালে ২২ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর বাংলাদেশে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন এককভাবে অথবা যৌথভাবে তাঁর স্মরণে গান, গ্রন্থ, স্মরণিকা প্রভৃতি প্রকাশ করতে থাকে। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মৃত্যুর পর বাংলাদেশে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান বা তাঁর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দর্শন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণভাবে আলোচিত হতে থাকে। বলা যায়, বাংলাদেশে যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন বা গানের দল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন করে বা সমাজ বদলের সংগ্রামে লিপ্ত, তারা সকলেই হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশন করে থাকে। জনগণের মধ্যেও হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ আছে। ঢাকা শহরে শুধু নয়, মফস্বল শহরেও হেমাঙ্গ বিশ্বাস যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে আছেন। দিনে দিনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের প্রভাব, প্রাসঙ্গিকতা ও চর্চা বৃদ্ধি পাচ্ছে—এটা লক্ষ করা যাচ্ছে। তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে হেমাঙ্গ বিশ্বাস এখন খুবই জনপ্রিয়। হেমাঙ্গ বিশ্বাস নিয়ে যত লেখালেখি, আলোচনা, পত্রিকা, সংকলন হয়েছে, বোধ করি অন্য কোনো গণশিল্পী বা সংগঠকের এতখানি হয়নি। ১৪ ডিসেম্বর ২০১২ ছিল হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্মশতবর্ষ। এই মহান গণসংগীতশিল্পীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে এ বছর নানা অনুষ্ঠানে, আয়োজনে দেশের নানা প্রান্তে তাঁকে স্মরণ করা হয়। তিনি উপমহাদেশের জনগণের সন্তান। জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধার জানাই।