জন্মদিনের শুভেচ্ছা

ভালোবাসার কবি

চিরকালই নারীরূপ প্রধান্য পেয়েছে সাহিত্য ও শিল্পকলায়। নারীর রূপ ও আবেদনময়তা নিয়ে হয় হয়েছে প্রশংসা নয়তো নিন্দা। আর এই সৌন্দর্যের আবেদন তৈরিতে সকল যুগেই চালকের আসনে থেকেছে কবিগণ। নারীর সৌন্দর্যমূল্য যেভাবে নিরূপণ করেছে সমাজ, সেখানেও কবির ভূমিকা প্রমাণযোগ্য। আর তাই স্বাভাবিক-সুন্দরের মাঝেও নারী আরও বেশি রূপসী, রমণীয় বা কলাবতী হওয়ার সাধনায় ব্যাপৃত হয়েছে। ফলে ‘মানুষ নারী’ স্বাভাবিকভাবেই নিষপ্রভ হয়েছে সুন্দরী তথা যৌনাবেদনময়ী নারীর কাছে। আর এই ক্রমধারায় সর্বশেষ ও সর্বাধুনিক সংযোজন ঘটালেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। এই দেহকাব্যের এক আকর গ্রন্থ ‘ভালোবাসার রাতে’। এখানে কবি দেহমন্দিরে দেবীমূর্তি নির্মাণে যতটা কারিগর, ততটাই পূজারি। আবার কখনো যোগ্য পুরোহিতও বটে। নারী, রমণ, রমণীয়—এই তিনটি শব্দের সমন্বয়ে নির্মিত ভালোবাসার রাতে গ্র্রন্থটি। একজন রমণী একজন রমকের কাছে যখন ক্রমশঃ আলগা হয়, তখন রমকও জ্বলে ওঠে নক্ষত্র হয়ে। একে একে লক্ষ-কোটি নক্ষত্রের স্ফুটন শুরু হয় তার কামুক দেহে। নারীশরীর আর শরীর থাকে না, হয়ে ওঠে নক্ষত্রের বাগান। কবির রমণী তখন হয়ে ওঠে এমন— যখন দু’স্তন মেলে ডেকে নিলে বুকের ওপরে, স্বর্গের জঘন খুলে দেখালে যে-দীপ্তির প্রকাশ, তখন কী হলো আমি কোন্ ভাষে বলবো কী করে? মুহূর্তেই ঘুচে গেলো তৃষিতের অপেক্ষার ত্রাস। [ভালোবাসার রাতে—২] একজন কবি নারীকে কীভাবে পূর্ণতা দিতে পারে, ‘ভালোবাসার রাতে’ তার প্রমাণ। একে রমণীর রমণ পূর্ণতার আকরও বলা যেতে পারে। নারীর স্তনর ব্যাপ্তি শুধু স্তনে নয়, তার অপার সৌন্দর্য নক্ষত্রকে ছাড়িয়ে। আর তাই তিনি বলতে পেরেছেন—না লেখা কবিতা এক দীপ্তিমান নক্ষত্র শরীরে। এখানে নারীশরীর শুধু শরীর নয়, কবিতালেখ্য। আমার জানা নেই, বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় কোনো গ্রন্থ আছে না কি, নারীশরীর যেখানে স্বয়ং কাব্যদেবী। যোগ্য দেবী। আর এর মাঝে প্রস্ফুটিত হয়েছে কবির দেহবাদ, সৌন্দর্যবাদ আর কামবাদের রমণীয়তা, যা ভালোবাসার রাতের কাব্য-ফসল। কবি নারীদেহে তার অংকশাস্ত্র ফলিয়েছেন স্বার্থকভাবে। জ্যামিতির হিসাবে কবি পাকা। কবির নারী জ্যামিতির বই হয়ে ফুটে ওঠে সমুখে। নারীতে আছে বৃত্ত, আছে ত্রিভুজ ও সমতল। আছে চাঁদাও। আবার কবি নিজেকে মূর্খ বলেছেন জ্যামিতি বিষয়ে। পাকা চাষি সেজেছেন চাষবাষে। যেখানে দেহ আর মাঠ একাকার। এ চাষি বীজের বপনঋতু ব্যর্থতায় বইয়ে দিতে পারেন না। তাহলে দেহের ভাগ্যে নির্ঘাত জুটবে অনাহার। এখানে কবি নারীকে দেখেছেন জো-ধরা ভূমিরূপে। কবি হয়ে ওঠেন স্বার্থক কৃষক। যদিও এ চিন্তা নতুন নয়। কবিকুল বারবার নারীকে উর্বর ভূমির সাথে তুলনা করেছেন। ঋতুমতী নারী আর বর্ষার ভূমি যেন একে অপরে একাকার। কিন্তু আমাদের আলোচ্য গ্রন্থে সৈয়দ শামসুল হকের উপস্থাপন অন্যমাত্রা পেয়েছে। এত বেশি আলগা আর এত বেশি রসদ উচ্চারণময়ী কবিকে এর আগে কখনো দেখিনি। এ যেন আর এক ‘পরানের গহীন ভেতর’ থেকে পড়া রসদমঞ্জুরী। কবি দেখিয়েছেন—খরার মাঠ যখন বৃষ্টিতে ভিজে ওঠে, তখন কীভাবে যোগ্য কৃষক হয়ে উঠতে হয়। কবির উচ্চারণ— এখন সে বৃষ্টিকাল দেখে হাতে তুলে নেয় বীজ রোপনের তাড়নায় নেমে পড়ে পিচ্ছিল কাদায়। যখন খুলছো তুমি দেহ থেকে শাড়ি ও শেমিজ তখন উদ্বেল কেউ হয়ে ওঠে কৃষি-প্রতিভায়। [ভালোবাসার রাতে—৬] এ বৃষ্টি থামবার নয়। কৃষকের চোখে-মুখে উন্মত্ততা। তার একটাই ইচ্ছা, অঙ্কুরোদ্গমে বীজ সফল হোক বা না হোক বৃষ্টিটা থাক বারো মাস। তবেই কৃষক ফসল আর জমিনের খুনসুটি জমে উঠবে। ঠিক একইভাবে আরও বেশ কিছু কবিতায় কৃষক ও জমিন ভিজেছে একই বৃষ্টিতে। অবশেষে কবির অতৃপ্ত মনের আকুতি—যে ভালোবেসেছে, সে-ই শুধু জানে রতির স্মৃতি-বীজ অঙ্কুরিত হয় যুগল দেহেই। প্রজননক্ষম ধরার তুল্য হয়ে উঠেছে নারী। রমণী যেন ফসলপুষ্ট উর্বর মাঠ। উর্বর শস্যক্ষেত্র তো বটেই, বিচিত্র ভান্ডারে সজ্জিত একটি দেশও। সত্যকথা বলতে কি, প্রিয় রমণী কবির প্রিয় খাতার মতো; প্রিয় জমিনও বটে। সৈয়দ হক যে জমিতে সহজেই জো আনতে পারেন। চষতেও পারেন ফসল বপনের উপযোগী করে। খরিপ কিংবা রবি। শুধু ফসল আর ফসল। খলবলিয়ে হাসাতে পারেন ওই জমিনকে। তবুও কোথায় যেন খামতি থেকে যায়। কারণ এ যে নারীদেহ। তার নির্মাণগত শৈলী অফুরান সৌন্দর্যে ঢাকা। এ যেন অসংখ্য কবিতা-সূচিত আদিম কবিতার পাণ্ডুলিপি, যা উদ্ধারের ভার এখানে নিয়েছেন সৈয়দ হক নিজেই। ভালোবাসার রাতে গ্রন্থের ১২ নম্বর কবিতাটি ভিন্নমাত্রার। সাধারণ নিয়মেই নারী ঋতুমতী হয়। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর মাঝে যে কত আকুতি কত আকাঙ্ক্ষা লাল-নিষিদ্ধ নিশানের তলে মাথা খোটে, তা স্পষ্ট হয়েছে এখানে। তার পরেও কামনার তাপ অগ্রসর হয় সেদিকেই। কবির সহজ উক্তি— বৃষ্টিও বৃষ্টি তো নয়—জরায়ুর রক্তিম ক্রন্দন। আজ তিনদিন থেকে অবিরাম, ক্ষান্তি নেই তার। নিষেধ পতাকা লাল, পতাকায় শরীরি স্পন্দন তবুও তবুও জাগে, জাগে ইচ্ছা সেখানে যাবার। শত বাধাসত্ত্বেও থামতে পারে না কামুক পুরুষ। দুজনের দেহ ছিড়ে বের হয় দুধ-পূর্ণিমা। আর তা নেমে আসে স্তনের চূড়ায়। বাড়তে থাকে কামনার জ্বর। আর জ্বরতপ্ত হাত কুড়ায় কামনার ফুল। এ টান শুধু এক পক্ষের নয়। সমান তালে দুজনের। অবশেষ ভেঙে যায় বাধ— তবে ভিজে যাক সব, বৃষ্টি থাক, এসো ভিজে যাই— জ্বরের আগুনে দেহ লাল বৃষ্টিধারায় ভেজাই \ সৈয়দ শামসুল হকের সামনে নারীদেহ যখন দেবীর মূর্তিরূপে মূর্ত হয়ে উঠে, তখন শয়নকক্ষ হয়ে উঠে মন্দির। আর পুরোহিত কবি। আসলে যোগ্য কামুক পুরুষই পারে সেই মন্ত্র পাঠ করতে। কামনার ফুলে জাগিয়ে তুলতে পারে দেবীকে। কবির সহজ উক্তি— দেবী তুমি দাঁড়িয়ে রইলে, আমি চুম্বনের ফুলে সারাদেহ ঢেকে দিয়ে পূজাপাঠ শুরু করলাম। তুমি তো মাটি নও—ছুঁয়ে আমি দেখেছি আঙুলে, তবুও মন্দিরে ঢুকে প্রথমেই তোমাকে প্রণাম। [ভালোবাসার রাতে—২৯] এ পুরোহিত দেবীর বুুকে বুক রেখে করতে চান স্তোত্রপাঠ। উচ্চারণ করতে চান একটিমাত্র শব্দ—ভালোবাসি। প্রেমিক নিজেকে বারবার ঘোষণা দেয় যোগ্য পুরোহিত বলে। কারণ, প্রেমিকা তার কাছে ঈশ্বরী। আরও ঘোষণা দেয় নিজেকে, কামদেবতার পুত্র বলে। আর তখনই শরীর ধুনুচি হয়ে কামরূপ ধূপগন্ধে ভরে ওঠে সমস্ত ঘর। তবে এই সত্যকারের পুরোহিত হয়ে ওঠার মন্ত্র নেবার পালা শুরু হয়েছে বলতে গেলে ‘পরানের গহীন ভিতর’ এবং ‘এক আশ্চর্য সঙ্গমের স্মৃতি’ গ্রন্থের মাধ্যমে। ভালোবাসার রাতে বীজ মূলত অঙ্কুুরিত হয়েছে সেখানেই। যার স্পষ্টতা আমরা এখানে দেখতে পাই— তোমার খামচির দাগ এখনো কি টকটকা লাল এখনো জ্বলন তার চোত্রার পাতার লাহান। শয়তান, দ্যাখো না করছ কি তুমি কি সোন্দর গাল, না হয় দুপুর বেলা একবার দিছিলাম টান? (পরানের গহীন ভিতর—৬) কবি নারী আর কবিতাকে আলাদা করে দ্যাখেননি। এখানে সৈয়দ হকের নারী কবিতা আবার কবিতাই নারী। আসলে সৈয়দ হকের কাব্যগ্রন্থে কবি, কবিতা আর নারী একসূত্রে গ্রথিত। কবি এখন সমস্ত কোলাহল, সমস্ত শব্দের জঞ্জাল পেরিয়ে পেতে চান নির্জনতা। শুধু তা-ই নয়, প্রিয়ার ঠোঁট থেকে শুনতে চান একটি মাত্র শব্দ ‘ভালোবাসি’। যে উচ্চারণে বৃক্ষপাতা বারবার কেঁপে উঠবে। কিন্তু এর স্থিরতা কোথায়? কবি খুঁজে চলেন আরেক ‘তুমি’কে। যে তুমি থাকে ভেতর সত্তায়। কবির প্রশ্ন— আরো এক ‘তুমি’ বাস করে নাকি তোমার ভেতরে?— সেই অতি মানবীর খোঁজে এই শরীর মথন। [ভালোবাসার রাতে—২১] যার জন্যে কবির এত আয়োজন, সে সারাক্ষণ থেকে যায় চোখের আড়ালে। সেই ‘তুমি’ নিজেকে গোপন রেখে আজীবন পালাতক থাকে। কেবল রতির কোলে হঠাত্ কখনো সেই মুখ দেখা দেয়। যদিও এ দেখা দেবার একটাই উদ্দেশ্য, কাম-আকাঙ্ক্ষা আরও জাগিয়ে তোলা। তবে এ-ও সত্য, প্রেমিক তথা কামুক পুরুষের কাছে শেষ বলে কিছু নেই। রাতের রমণ শেষে তাদের একটিই প্রার্থনা, রাত যেন শেষ না হয়। তার নেই কোনো ক্লান্তি। শুধু একটাই ভবনা—এ যুদ্ধের এখনো অনেক বাকি। কারণ প্রেমিকের আকাঙ্ক্ষার শেষ বলে কিছু নেই। লেহন, মর্দন সমস্ত পর্বই শেষ হয়, তবু খুঁজে পান না তার অধরাকে। আসলে প্রেমিক চান আরও আরও। তাই তো তার সহজ আকুতি— তোমার প্রত্নের খোঁজে ফিরে ফিরে এত বারবার রতির শয্যায় আসা, বস্ত্র খুলে দেখার তাড়না— তুমি তো তবুও দূর, কাছে তুমি আসতে পারো না? হতে কি পারো না তুমি ধরা ছোঁয়া অবাধ অপার? [ভালোবাসার রাতে—৬৯] এ যেন প্রিয়ার ভেতরে প্রিয়াকে খোঁজা। আসলে সৌন্দর্যানুভূতি যখন চেতনাকে আচ্ছন্ন করে, তখন কোনো বৈশিষ্ট্য দিয়ে তার বিচার করতে কবি অপারগ। সেই সৌন্দর্য-আকাঙ্ক্ষা জগত্-বস্তুর কোনো সৌন্দর্যই মেটাতে পারে না। আবদুল মান্নান সৈয়দ স্বীকার করেছেন এভাবে—প্রকৃতি যে নিরাবরণ নারীকে উপহার দিয়েছে, সেই অনিঃশেষ রূপমাধুরী একমাত্র ঈশ্বরই নির্মাণ করতে পারেন। নির্মাণ তো দূরের কথা, সে সৌন্দর্য ভাষায় অনুবাদের অযোগ্য। আসলে রক্তমাংসের কাঠামো স্পর্শযোগ্য হলেও নারী সৌন্দর্যের অন্তর্গত মহিমা অধরা থেকেই যায়। নারীর রূপ, লাবণ্য, ত্বক, ঠোঁট, চিবুক, বক্ষ ইত্যাদি দেহকাঠামো বিষয়ের অনেক ঊর্ধ্বে চলে যায় সুন্দর বস্তু। আর সেই অর্থেই সৈয়দ শামসুল হকের তৃষ্ণা অতৃপ্তই থেকে যায় তাঁর মুষ্টির মধ্যে থাকা অধরা বস্তুর নিরিখে। কারণ, নারী নিজেই রহস্যময়ী কিংবা রহস্যের অন্য নামমাত্র। আর সে থেকেই কবির কল্পনা আর নারীর রহস্য পরস্পর সংযুক্ত হয়ে তৈরি হয় কাব্যপ্রতিমা। সমাজতাত্ত্বিকদের মতে পৃথিবীর সকল দুর্বল প্রাণীর মধ্যেই রহস্য সৃষ্টির অভিপ্রায় লক্ষণীয়। অন্যকথায় মূল্য দিয়ে টিকে থাকার একটি কৌশল। এ অর্থেও নারী রহস্যময়ী, বিশেষত যৌবনকালে। আর এই রহস্যময়ী হওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে পুরুষ। যে কারণে সংবেদনশীল কবিকুল এই রহস্যের মুখোমুখী হয়ে সৃষ্টিশীল কল্পনায় মেতে ওঠে। অন্য পক্ষে নারীও হয়ে ওঠে আরও অচেনা, আরও দুর্বোধ্য। যেমন— বেদনা মাধুর্যে গড়া তোমার শরীর অনুভবে মনে হয় এখনও চিনি না, তুমি প্রতীক বুঝি এই পৃথিবীর: আবার কখনো ভাবি অপার্থিবা কিনা। [সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়: তুমি] এই রোমান্টিক কল্পনা অনেকটা বাস্তববিচ্যুত হলেও আলো-আঁধারি এখানে বেশ মিশেল। অন্যদিকে কবি আল মাহমুদ সুন্দরের পরিপূর্ণতার বিভাস দেখেছেন নারীতে। নারীশরীরের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পেতে চেয়েছেন তাবত আনন্দ ও সুখ। তার পরেও কবির কেন জানি মনে হয়, নারী তাঁর অভিজ্ঞতার বাইরের কিছু। তাঁর ভাষ্য—‘নারী দেহের চেয়ে নম্য কিছু নেই পৃথিবীতে’। বলেছেন—‘মাতা বধূ কন্যা হে, নারী এক রহস্যের নাম’। আবু হেনা মোস্তফা কামাল নারীকে দেখেছেন—নির্জন দ্বীপের বুকে রাত্রির প্রদীপ হিসাবে। যে শুধু জ্বলে ওঠে একা একা। কবি সৈয়দ শামসুল হকের নারীদেহের উপস্থাপন, গতি-ভঙ্গির আবেদন, কটাক্ষ, সাঙ্গীতিক উচ্চারণসহ ইত্যাদির মাধ্যমে নারী শুধু নন্দনপ্রতিমা হয়েই থাকেনি, হয়েছে শোভন-সামগ্রীও। আর এতে কবির রূপতৃষ্ণা মিটল না। কবির কল্পনা ধাবিত হয় অন্য কোথাও। কামে-প্রেমে চূড়ান্ত যৌবনবতীর জন্য সে এক অনিঃশেষ অন্বেষণ। আর এই কল্পিত সুন্দরীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, সে চির যৌবনা, অতুল লাবণ্য ও কামজ আবেদনের আকর। এই নিপুণ সৌন্দর্য বর্ণনার মাধ্যমে নরী হয়ে ওঠে যৌনভূমিকার শোভামণ্ডিত রহস্যের আধার। বাংলা সাহিত্যে রমণী বরাবরই রহস্যমধুরা। এখানেও কবিকল্পনায় যে নরীর বসবাস, সে নারী রূপজ ও কামজ রহস্যমহিমার এক জমাট আকৃতি বলা যেতে পারে। যার বর্ণ, লাবণ্য, বঙ্কিমতা কেবলই বাসনাকে উদ্দীপ্ত করে। প্ররোচিত করে কামচেতনাকে। নারী ক্রমন্বয়ে হয়ে ওঠে রমণী। আর তখনই কবি বাস্তবতা ছেড়ে হয়ে ওঠেন কল্পবিহারী। বিচরণ করেন স্বপ্নলোকে, আর নারীকে তখন মনে করেন স্বপ্নসহচরী। এখানে নারী অর্ধেক রক্তমাংসের আর অর্ধেক ভাবের বিষয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মানসী এখানে মিলে যায়—‘অর্ধেক মানবী তুমি, অর্ধেক কল্পনা’। প্রাচীন কবিরা নারীকে যেমন দেহসর্বস্ব করে গড়েছেন, আধুনিক কবিরা সেখানে থাকেননি। তারা প্রধান্য দিয়েছেন মনকে। বলেছেন—‘ নারীর মন সহস্র বছরের সাধনার ধন’ [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর]। আমার মনে হয়, এই মতবাদেই বিশ্বাসী পরবর্তী কবিগণ। তাঁদের বর্ণনার মর্ম কতকটা এমন—নারীকে অবোলকন করা যায়, ছেঁয়া যায়, বন্দী করা যায় প্রেমে বা কামজ আলিঙ্গনে। কিন্তু মন থেকে যায় দুর্লভ হয়েই। কবি রফিক আজাদের কথায় আরেকটু খোলামেলা বলা যায়। তিনি নারীকে বলেছেন— ‘নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বাস্তবতা’। এ বাস্তবতার অবস্থান দৈহিক। আর দেহের গহিনেই মনের বসবাস। কাজেই ভিন্ন করে মনের তালাশ না করাই ভালো। সেই অর্থেই হয়তো লোককবিরা নারীকণ্ঠে শুনিয়েছেন—‘দেহ দিলাম মন দিলাম, আর নাই কিছু বাকি’। দেহ দিলে নারীর আর কিছু বাকি থাকে না। এখানেও প্রমাণিত, সহস্র বছর মনের জন্য সাধনা না করাই উত্তম। বরং সেটি অধরা বা অচেনা থাকলে নারী সহজে রমণী-কামিনীতে স্থিত হতে পারে। তা ছাড়া নারী যদি মেনে নেয়, তার অর্ধেক অস্তিত্বকে পুরুষ কল্পনা দিয়ে সঞ্চারিত করে, তাহলে রহস্যময়তার আড়ালে তাকে অবস্থান নিতেই হয়। পুরুষ তাকে ‘রহস্যময়ী’ বলে যতই নিন্দা করুক, সে নিরুপায়। আর তাই হয়তো অটুট থেকেছে নারীর আদি পরিচয়—সুন্দরের আধার আর ভোগের আয়তন হিসেবে। সৈয়দ শামসুল হকও সেটা দেখিয়েছেন শেষ পর্যন্ত। শুধু তা-ই নয়, বলেছেনও বটে—দেহদেশে কবে কোন্ সেনাপতি হয়েছে বিজেতা ! এবার এর শিল্পমূল্য নিয়ে দু-কথা না বললে অপূর্ণতা থাকবে। যদিও আমার উদ্দেশ্য তা নয়। ‘ভালোবাসার রাতে’ গ্রন্থটি বর্তমান কবিকুল বা কাব্যভুবনে একটি বিস্ফোরণ বলা যেতে পারে। যখন তথাকথিত তরুণ কবিরা গদ্যছন্দের পূজারি, প্রকৃত ছন্দকে থোড়ায় কেয়ার করছেন, ঠিক তখনই চপেটাঘাত হানলেন কবি সৈয়দ হক। তিনি দেখিয়ে দিলেন, ছন্দ কবিতাকে কত বেশি মহিমান্বিত করে। নিটোল সনেটগুলো পাঠের সময় পাঠক রোমাঞ্চিত না হয়ে পারেন না। আট-দশ মাত্রায় যা কানায় কানায় পূর্ণ। অন্ত্যমিলেও খামতি নেই। এখানে রয়েছে ৭৫টি সনেট। এই সনেটগুচ্ছে আমরা পেয়েছি কবিতাশিল্পের দায় মিটাতে যা যা প্রয়োজন, তার সব। ছন্দ, উপমা, উেপ্রক্ষা, অন্ত্যমিল, অনুপ্রাস, বক্রোক্তি, শ্লেষ প্রভৃতিতে ষোলকলা পূর্ণ। এই গ্রন্থে বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারী বা ব্যভিচারী ভাবের প্রভাব যথেষ্ট লক্ষণীয়, যার পরিপূর্ণতা আনতে গিয়ে প্রতিটি শাখা-প্রশাখা—যেমন আলম্বন, উদ্দীপন, অলঙ্কার, উদ্ভাসর, বাচিকসহ অন্যান্য বিষয়ের সক্রিয় উপস্থিতি গ্রন্থটিকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে। এ গ্রন্থের মূল রস শৃঙ্গার বা মধুর। সবমিলিয়ে ‘ভালোবাসার রাতে’ শুধু রাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এ যেন কবিতাভুবনে দেহকাব্যের দিব্যলোক।