বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসের আয়োজনে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের সংগৃহীত শিল্পকর্মের প্রদর্শনী
তাঁর আলো তাঁর ছায়া
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৩
খ্যাতিমান মানুষ থেকে অচেনা মানুষের মুখের আলোকচিত্র নিয়ে ৪০ বছর ধরে কাজ করছেন নাসির আলী মামুন। ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখার সাথে আরেক প্রার্থনায় তিনি মগ্ন থাকেন। তা হলো, খ্যাতিমান লেখক, শিল্পী ও সমাজের নানা স্তরের আলোকিত মানুষের কাছ থেকে ছবি আঁকিয়ে নেওয়া। এ ধ্যান থেকে ক্রমে তাঁর সংগ্রহ বাড়তে থাকে। দেশে এবং দেশের বাইরের খ্যাতিমান মানুষের কাছ থেকে সংগৃহীত শিল্পকর্মগুলোর ১০১টি রেখাপ্রধান কাজের প্রদর্শনী শুরু হয় গত ১৮ ডিসেম্বর বেঙ্গল গ্যালারি অব ফাইন আর্টসে। ৩৭ জন শিল্পী, কবি, সুহূদ নাসির আলী মামুনকে এঁকে দিয়েছেন এসব ছবি। কোনো কোনো ছবির সাথে কবিতার ছাদেরও দেখা মেলে। শুধু হূদ্যতার জন্য আঁকিয়ে না হয়েও এঁকেছেন। কবি শামসুর রাহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, পূর্ণেন্দু পত্রী—এরা শিল্পপথের যাত্রী হলেও প্রকাশের মাধ্যম ভিন্ন। নাসির আলী মামুনের মনোভূমিতে শিল্পের তৃষ্ণা খেলা করে। তিনি আঁকিয়ে দিয়ে শুরু আঁকতে চাননি সাথে যুক্ত করেছেন আঁকিয়ে নয় এমন মানুষের হাতে শিল্প সৃষ্টি করাতে। এ শুধু আত্মিক যোগ থাকলেই সম্ভব। প্রদর্শনীর সংগৃহীত ছবিগুলো স্বত্ব অর্থমূল্যে বিকিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে মামুন বলেন, মনে হচ্ছে, আমার পাঁজরের হাড়গুলো একেকটি খুলে কাউকে দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু এর বিনিময়ে তিনি গড়তে চলেছেন ‘ফটোজিয়াম’—আলোকচিত্রের জাদুঘর। এ প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম বিপণন থেকে আসা অর্থে শুরু হবে ফটোজিয়ামের কাজ। শিল্প বেচে শিল্পাঙ্গন গড়া। নাসির আলী মামুনের স্বপ্নের বাস্তব রূপের এভাবেই শুরু হলো। মামুন পথ থেকে পথে, দেশ থেকে দেশে ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর সঙ্গী ছিল একটি প্রার্থনা—ছবি সংগ্রহ। ভ্রমণ-ব্যাগে সবসময় বয়ে বেড়াতেন স্কেচবুক, অ্যাক্রিলিক কালার, জলরংয়ের তুলি, প্যাস্টেল। আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন ১৯৫১ সালে শিল্পাচার্য জয়নুলের আঁকা কাগজে-কালিতে আঁকা রেখাচিত্র রেখেছেন। ছবিটিতে কালি-তুলিতে ধানের পাতা ও ধান গাছের ছন্দ সমুজ্জ্বল। ছবির শিরোনাম ‘সিড অব রাইস’ কাজটির পাশে শিল্পগুরু নন্দলাল বসুর শিল্পকথা বইয়ের উদ্ধৃতি লেখা আছে ‘সৌন্দর্যবোধের অভাবে মানুষ যে কেবল রসের ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হয়, তা নয়। তার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের দিক দিয়েও সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ ছবির এক কোণে লেখাটির পাশে নন্দলালের স্বাক্ষর রয়েছে। পটুয়া-শিল্পী কামরুল হাসানের চল্লিশটি কাজ এ প্রদর্শনীতে রয়েছে। কামরুল হাসানের নিরন্তর চিত্রচর্চার বহুমাত্রিক প্রকাশ এসব ছবি সাক্ষ্য দেয়। সিগারেটের প্যাকেট থেকে শুরু করে টুকরো কাগজের কালো রেখা কিংবা রংয়ের ব্যবহারে কামরুলের গতিশীল নারীমুখ ও প্রকৃতি চেনা যায়। বাংলার লোকশিল্পের বিষয় ও আকৃতিকে আত্মস্থ করে পথ চলতেন কামরুল। অপ্রাতিষ্ঠানিক শিল্পসৃষ্টির সাথে যুক্ত শিল্পীদের কৌশল আত্মস্থ করতে ছুটে যেতেন শখের হাঁড়ি, লক্ষ্মীর সরা, শীতল পাটি, নকশী কাঁথার নকশা করার মানুষের কাছে। কামরুল আমাদের ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে নতুন ধ্রুপদি শিল্পরূপ প্রদর্শন করেছেন। নাসির আলী মামুনের কামরুলের আঁকা ছবির সম্ভার দেখে বোঝা যায়, কামরুল কত বেশি নিরীক্ষায় মগ্ন ছিলেন। জয়নুলের সমসাময়িক ব্যঙ্গচিত্র আঁকিয়ে কাজী আবুল কাসেম আমাদের অনেকেরই অচেনা। রেখাচিত্রে আঁকা তাঁর তিন কন্যার মুখ দেখে বাস্তবধর্মী রচনাশৈলী সম্পর্কে ধারণা নেওয়া যায়। এস এম সুলতানের সাথে দীর্ঘ নয় বছর নাসির আলী মামুন কাটিয়েছেন। তাঁর সবচেয়ে বড় পাওয়া সুলতানের সান্নিধ্য। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় আসা সুলতানকে ঘিরে কৌতূহলী মানুষের ভিড়। সুলতানের আঁকা দেখে মুগ্ধ মামুন। দেহভঙ্গিতে শক্তির রূপ, গতির আভাস বাংলার কৃষকের গায়-গতরে। সুলতান মামুনের প্রতিকৃতি এঁকে দেন ১৯৮০ সালে। তরুণ মামুনের দৃষ্টিতে সুলতান আলোছায়া দেখেন। সুলতানের জীবনযাপনের নানা পর্যায় নিয়ে পাঁচ শতাধিক আলোকচিত্র নির্মাণ করেন। মোহাম্মদ কিবরিয়ার আড়াআড়ি ও উলম্ব রেখার চলাচল মামুনের যাত্রায় গতি নির্ণয় করে দেয়। হামিদুর রহমান, আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর রেখাচিত্রের গতির সাথে যোগ করেছেন মামুনকে। মুর্তজা বশীরে আঁকাগুলো একেবারে সাম্প্রতিক। নাসির আলী মামুনের কাছ থেকে তাঁর স্বপ্নের কথা শুনে এঁকেছেন পাঁচটি ছবি। বশীরের প্রিয় বিষয় নারী ও নারীমুখ উদ্ভাসিত হয়েছে উজ্জ্বল গতিতে। কাইয়ুম চৌধুরী, আবদুর রাজ্জাক, দেবদাস চক্রবর্তী, কাজী আব্দুল বাসেত রেখায় প্রকাশ করেছে মানুষের মায়াময় মুখ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শামসুর রাহমান, নওয়াজেশ আহমেদ রং-তুলিতে ছোপছাপ দিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ছবির বাজার একেবারে মন্দা নয়। বাংলাদেশের শিল্পসংগ্রাহকগণ একটি জয়নুল খোঁজেন; কামরুল, সুলতানের আঁকা তো বটেই। কোথাও না বিকিয়ে দুর্লভ ছবিগুলো বুকে আঁকড়ে রেখেছেন এতকাল ধরে। আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন এক স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বেচেছেন অন্য স্বপ্নভান্ডার। এভাবেই হয়তো গড়ে ওঠে স্বপ্ন, শিল্প, আর দেখা-অদেখার সুরম্য পরিধি। প্রদর্শনীটি শেষ হবে ২৫ ডিসেম্বর।