চতুর্মাত্রিক ডানা
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৪
জন্মসত্য। বোধ, দেখা এবং প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতাকে মলিন করে দিয়ে ততোধিক বাস্তবতার বয়ান হাজির করার বাসনা রয়েছে প্রত্যেকটি কাজে। গ্যালারি দৃকে ‘তিস্তা’ জাহির করছে একটি চিত্রকলার এবং ভাস্কর্যের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। এই প্রদর্শনীর সকল শিল্পীর বাসস্থান ভারতে। এবং বলে রাখা ভালো, সকলেই একই অঞ্চল থেকে আগত না হলেও সবাই বাঙালি। এখানকার অর্থাত্, বাংলাদেশের মহান বিজয় দিবসকে উপলক্ষ করে এখানকার দর্শকদের সাথে আপন চৈতন্যমিশ্রিত নির্মাণের পরিচয় এবং সংলাপ সৃষ্টি করার তাগাদা থেকেই মূলত এই আয়োজন। প্রদর্শীত কাজের ধরন নিয়ে খোলামেলা কথাবার্ত বলাটা অত্যন্ত শক্ত একটি কাজ। কারণ, তথাকথিত ‘বিশ্বশিল্পকলা’ নামক সাজানো একটি শব্দ এবং এর নানামাত্রিক তত্পরতা এই প্রদর্শনীর কাজগুলোকেও আচ্ছন্ন করেনি যে, তেমন নয়। এ ছাড়া মহাভারতের বিশাল কর্মযজ্ঞের ভেতর থেকে বাংলাভাষাভাষিদের শিল্পসৃষ্টির পরিধিও ছোট নয়। আসাম, ত্রিপুরা, আগরতলা কিংবা পশ্চিমবঙ্গের কাজের মধ্যে একটা স্বাতন্ত্রিকতার সুর বরাবরই পাওয়া যায়। সেটাও বোধ করি কাজে লেগেছে এই প্রদর্শনীর পটভূমিতে। আমাদের এখানকার সাম্প্রতিক কাজের মধ্যে ইনটেলেকচ্যুয়ালিটি বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিন্যাস জোরালোভাবেই সামনে চলে আসছে। ‘দেখা’ আকার-আকৃতিকে বিমূর্তায়নের মধ্য দিয়েই সেই তত্পরতা ক্ষান্ত নয়। টোটালিটিকে সিম্বলাইজ করার একটা প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চোখে পড়ে। কিন্তু এই গ্রুপের কাজের মধ্যে রয়েছে সিম্পলিসিটি, রয়েছে অর্গানিক বা জৈব সত্তার মধ্য দিয়ে শিল্পকর্মকে বিনির্মাণ করার ঝোঁক। এক ঝাঁক শিল্পীকে পাওয়া যাবে, যাঁরা রং-তুলি, ধাতব বস্তু বা বাটালের সাহায্যে স্রোতকে আরও বেশি ধাবমান করে তুলেছেন। চিরজয়তি ভট্টাচার্য, ড. স্বপন পল এবং রাজু সিং-এর কাজের মধ্যে যার একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। মানবজমিনের আনসিন প্যাসেজকে ‘সিন’ অর্থাত্ দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলা হয়েছে। এরূপ ড্রইং আমরা তন্ত্রশাস্রের ভেতর পাব। যেখানে ‘যন্ত্র’ রয়েছে প্রতীকের মুখোশে। দেহকে মুখ্য করে ‘ত্র’ বা তরণ করার প্রক্রিয়া এটি। সৃষ্টির আধার মাতৃযোনি এবং যেখান থেকে আমরা অনবরত বের হয়ে আসছি, সেই দিকটার অভ্যন্তরীণ লীলা এবং আমরা যে পুনরায় সেই দিক থেকেই আগত এবং গত—এ রকম বাইনারি উপস্থাপনারও সঙ্কেত বহন করে। রাজু সিং-এর ‘আনটাইটেল-৩’ ছবিটি ক্যানভাসে অ্যাক্রেলিক। মানব দেহাংশ, আপেলসদৃশ ফেসিয়াল, গহ্বর = জন্মসত্যপথ—এর ভেতর শেকড়বেষ্টিত নৃত্যরতা। শেকড় এখানে জাগতিকতার মোটিভসঙ্কেত। বা সম্পর্কযুক্ত ফেনোমেনার কাল। রয়েছে ফুলের আভাস। তত্ত্বকথার ফুল। ‘যে জন্মপথে ফুলের ধ্বজা’। রাজু সিং দারুণভাবেই ব্যবহার করেছেন বাউলকথা বাঙালির গূঢ়জিজ্ঞাসা। চিরজয়তি ভট্টাচার্য্যের কাজ দেখে মনে হতে পারে পরাবাস্তবসুলভ। এটাকে অধিবিদ্যক বলা শ্রেয় হবে। চিত্রকলার অধি-ইংরেজি মেটা বা ‘পরা’ হিসেবে অনুবাদের রেওয়াজ থাকলেও এই ‘অধি’ বাস্তবতাকে কনফার্ম করে। সম্মুখস্থ সারফেসের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে আছে একটি দরজা। স্বাভাবিকভাবেই দরজা মানে প্রবেশপথ এবং ভেতর মানেই অজানার সান্নিধ্য, অজানাকে জানার কৌতূহল। এই অজানা আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে প্রকাশ্য। সারিবদ্ধ পাহাড়। তারপর দিগন্তরেখা। এরপর আকাশ। আকাশ মানে নীলাভতা। এই যে রং-তুলির সার্বিক প্রকাশ, সেটা মুখ্যত গৌণ, ডিভাইন কোনো বর্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আপনাকে এই দৃশ্য-গ্রাহ্যতার পর দাঁড় করিয়ে দেবে চিরজয়তি। কারণ, বন্ধ দরজা। প্রকৃতির কাছেই আহ্বান, ‘খোলো খোলো দ্বার’। ‘ক্ষণিক আলোকের’ উপস্থিতি রয়েছে টি দেবেনের কাজে। আলো এখানে বস্তু নয়, রং? এমন আলোকের সাক্ষাত্ বিনম্রচিত্তেই স্বীকার্য, আমরা অত্যন্ত কম দেখি। অর্গানিক ফর্মের ওপর তাত্ক্ষণিক ইমপ্রেশন রয়েছে রিনা মুস্তাফির কাজে। অ্যাকশন পেইন্টিংয়ের নির্মাণ-কৌশল, সুগঠিত পদ্ধতির তুলির তীব্র আঁচড় পড়েছে ক্যানভাসে। শান্তনু ধরের কাজের বৈশিষ্ট্যও রিনা মুস্তাফির কাজের মতো। অর্থাত্, অ্যাকশন পেইন্টিংয়ের তুলির ক্ষিপ্রতা-সমেত একটা ইন্টোরিয়ো ফিলিং আছে এতে। জ্যামিতিক প্রপরশনে বিন্যস্ত ফিগার-কাঠামোর ভেতর রেখার রিপিটেড গড়ন একসূত্রিতা নির্মাণ করেছে। লাল, হলুদ বা নীলের উজ্জ্বলতা এখানে আলোকাভাস দিলেও শেষ পর্যন্ত ফিরে দেখা মূক মানব-অবয়বের দিকেই দর্শকের চোখ আটকে যাবে। রাজকুমার মাজিনদারের কাজ অ্যানাটমিক্যাল ডিস্ট্রিবিউশন অন সারফেস। কানেকটিং লিঙ্ক কম্পোজিশন। পুরোটা মিলিয়েই একটা অ্যালকেমি। টোটাল উপস্থাপনার ভেতর যে ফর্মেশন আছে, ইউনিটির জোরালো ভূমিকায় খণ্ডাকারে দেখার জো নেই। তালাত মহাম্মদ, ঈশ্বর লেইসাংদেম, সিএইচ ললিত, নিরঞ্জন দেবনাথ, সুকান্ত সরকারের কাজ ফিগারেটিভ। তালাত মহম্মদের কাজে উঠে এসেছে আবহমান গ্রামবাংলার রূপ। অর্গানিক এবং জ্যামিতিক কাঠামোর সংমিশ্রণ ঘটেছে এই কাজে। কৌণিক থেকে ধাবমান নারীদেহ। দর্শকের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, পেছনে গ্রামীণ কাঠামো বাড়ি-ঘর, খোলা মাঠ-প্রান্তর, পাশে ছোট ছোট বন। রশিদ চৌধুরীর এ রকম বেশ কয়েকটি কম্পোজিশন রয়েছে। ঈশ্বর লেইসাংদেমের কাজে ফিগার থাকলেও ক্রমেই সে ফিগার মূর্ত থেকে জ্যামিতিক এবং বিমূর্তায়নের দিকেই এগিয়েছে। উপবেশিত ধ্যানস্থ নারীসাধক। উপঢৌকন গ্রহণ করছেন অদৃশ্য থেকে দৃশ্যত ফিরে আসা হাত থেকে, দূরে ডান দিকে ক্রমেই মিলিয়ে যাওয়া আরও কিছু ফিগার, আধেক ঝাপসারূপ, আলোকবলয় এবং পেছনে অধিকতর স্পষ্ট আলোকবলয়ের ভেতর জলজ উপাখ্যান দারুণভাবেই মনোজাগতিক বলয়ে শুভ্রতা ছড়ায়। সিএইচ ললিতের কাজের নাম ‘ডল সেলার’। অ্যাক্রেলিক মাধ্যমে আঁকা এই ছবিটিতে ঘন অন্ধকারের ভেতর লাল রঙের ব্যবহার, নিষ্পলক দৃষ্টি সৃষ্টি করেছে একটি চরম মিস্টিরিয়াস অ্যটমোসফিয়ার। ‘ডল’ বা পুতুল স্বাভাবিকভাবেই ত্রিমাত্রিক। কিন্তু এখানে ত্রিমাত্রিকতাকে পরিহার করে দ্বিমাত্রিক ঢংয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। ডলের প্লাস্টিসিটিতে এসেছে উজ্জ্বল রং, চোখের কাজ সরাসরি দর্শকমুখী। ত্রিকোণাকৃতির এই বিন্যাস বেশিক্ষণ ধরে রাখে না। দৃষ্টিটা বেশ ডিঙিয়ে চলে যায় বাম কোণবরাবর; নীলাভ অন্ধকারে। নিরঞ্জন দেবনাথের কাজ সাইকোডালিক ভঙ্গিতে নারীর অবস্থানকে তুলে ধরে। প্রতিবন্ধী ফিগার শায়িত ও দণ্ডায়মান । ডানদিকে উলম্ব সার্কেল, অসমাপ্ত ফিগার, সার্কেল ঘিরে মানুষের আদল অসহায়ত্বের সূচক। বলে রাখা যায়, এই সার্কেল ও টেক্সচার সরাসরি ব্লেড পেস্টিং করে নেওয়া। ব্লেন্ডের ভেতর লাল রঙে আবৃত। নীল বা কোথাও হলুদ-সবুজাভাস রয়েছে। এ জাতীয় কাজ (অর্থাত্, অসামাঞ্জস্য ম্যাটারিয়েলের সংযুক্তি) আপাত অর্থপূর্ণতা সৃষ্টি করলেও এ কাজ টিকেয়ে রাখা দুষ্কর। সুকান্ত সরকারের কাজ প্যান্টোমাইম-ধর্মী। তিনটি ফিগারের বিন্যাস রয়েছে কাজটিতে। হাতে ভিন্ন ভিন্ন (তিনটি গ্রেড এবং হিউ-সমেত) জাপানিজ পাখা। সারা শরীর সাদা কাপড় দিয়ে মোড়ানো এবং মাথায় মুখোশ। মুখোশ অনেকটাই সঙ-জাতীয়; অনেকটা মিশরীয় অভিব্যাক্তিবাদী (মুখাবয়বের) ধাঁচ। ক্যারিকেচারের মতো শিল্পী সারফেসে ক্যাপশন জুড়ে দিয়েছেন ‘সো হট’। অথচ আমরা জানি, সাদা কাপড় তাপদহ থেকে মানুষকে রক্ষা করে। আসলে এসব চিত্রিত করে সামাজিক জীবন ধারণের অসংগতিগুলো; যা অত্যন্ত মেকি বা কৃত্রিম আটপৌরে ব্যাপার। শিল্প তো আসলে বরাবরই সঙ্গতি এবং অসঙ্গতিকেই নানান মাত্রায় চিত্রিত করে। সন্দীপন ভট্টাচার্য, জয়দীপ ভট্টাচার্য্য এবং মানস ভট্টাচার্য্যের কাজ কিউবিক, বলা ভালো, নকশাধর্মী। যদিও সবার পটভূমিতেই রয়েছে নিসর্গ এবং তার রং। সন্দীপন এবং মানসের কাজে অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে নৌকা, খালের প্রাকৃতিকতায় মাছ ধরার জাল এবং বনভূমির বিমূর্তায়ন। পল্টু বর্মণের কাজ ‘মাই ভিলেজ’ অন্তমুদ্রাবাদী ধারার কাজ। জল রংয়ে আঁকা। মৃত খালবত্ এসে ঠেকেছে প্রবেশকোল জুড়ে। ছড়ানো-ছিটানো গ্রামীণ অনুষঙ্গ। এই কাজে প্রান্তরেখা নেই। কুয়াশার চাদরে আবৃত পাখির কলতান। এই কাজের নিঃসঙ্গতা আরও বেশি ঘনীভূত হয়ে ওঠে মানুষের অনুপস্থিতিতে। কিশোর দে, বিনয় পল, রুমি বর্মণ, জয়শ্রী মোদক এবং আশা দেববর্মার কাজ ত্রিমাত্রিক অর্থাত্, ভাষ্কর্য। বিনয় পলের কাজে ব্যবহূত হয়েছে বেশ কিছু বক্স, যার ওপর মানুষের মাথার বিভিন্ন ফর্ম, যা কতগুলো ইমোশন এবং অ্যাকশন প্রকাশ করে। রুমি বর্মণের কাজের মূল বিষয়বস্তু চেয়ার। আমরা জানি, চেয়ার নানা অর্থবোধক বস্তু। চেয়ার দ্বারা ক্ষমতা এবং পদমর্যাদার মতো অনেক বিষয়বস্তু বোঝালেও রুমির এই কাজে চেয়ারের সাথে যে অনুষঙ্গ যেমন শার্ট ও শার্টের পকেটে কলম ও কাগজ স্বাভাবিকভাবেই মানুষের বিশ্রামরত অবস্থাকে বোঝায়। জয়শ্রী মোদকের কাজ ‘হোপ’ ঊর্দ্ধমুখী দৈহিক সুষমায় সটান। আদি-অন্তব্যাপী সূর্যপ্রণাম। আশা দেববর্মার ‘আনটাইটেল-৪’ ধর্মীয় অনুষ্ঠানিকতাসম্পন্ন হলেও লাইফ সাইজ থেকে কয়েক-শ গুন বড় পিঁপড়ার পিঠে মানুষের সওয়ার হওয়ার ঘটনা আমাদের এমন একটা প্রিমিটিভ সময়ে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল অভ্যাসগত সত্যতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বাহনসভ্যতার যুগ। কিশোর দের ভাস্কর্য ‘ইউনিটি’ একটি পেঁয়াজের আদলে গড়ে উঠলেও রূপকার্থে এই কাজ বীজের সুপ্ত এবং মিমাংসিত প্রাকৃতিক ঐক্যকে শনাক্ত করে। প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী অপর দুজন শিল্পীরা হলেন, শান্তনু আচার্য এবং পিণাকপাণি নাথ। পিণাকপাণির বর্ণময়তা এবং শান্তনুর টোনাল ইউনিটি মনোক্রমিক হলেও মায়াবি। ১৫ তারিখে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ১৯ ডিসেম্বর, ২০১২ তারিখে।