কবিতা
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৬
একখণ্ড মাটিকে
সুজাউদ্দিন কায়সার
অন্তরলোকে আমার এ গান বিরহের অদ্ভুত খেয়াল
ফিনফিনে আঁচলে শুধু তুলে নেয় সংবিত্
মগজে উপচিন্তারা সিটকানো জীবনে
সারি বেঁধে পিঁপড়ের মতন গণনাতীত
কৃপা চাই না ও নির্ঝরতম
পাথরের বুক আর রৌদ্র পরস্পর ওরা ঝগড়াঝাটির
ঠিক আমারই মতন বিষণ্নতম সংক্ষোভ
নির্বিকার বুকে নেয় নিঃস্বতা উপায়বিহীন লজ্জা
আর্ত হই না ও বিমর্ষতম
ও বিপুলা করাল ঈর্ষায় বাঁচিয়ে তোলো একখণ্ড মাটিকে
----
খাঁচা
শাহাবুদ্দীন নাগরী
আমি অরণ্য থেকে বেরুতে চাইলাম জনপদের দিকে,
ঘন গাছপালার আচ্ছাদন শরীর থেকে সরাতে
চাইলাম সাপের খোলসের মতো, পায়ের নিচে
পরিত্যক্ত তোশকের মতো মরা পাতার স্তূপ,
গাছের বাকল থেকে টুপটাপ ঝরে পড়া জলফোঁটা
আমি গাভীর দুধের মতো জিহ্বায় তুলে নিয়েছি
আগ্রহে, মানুষ বেঁচে থাকার জন্য কত কিছু খায়!
কিন্তু হায় ক্রিস্টালের মতো ঝকঝকে জোছনা
দেখতে না পেয়ে আমি অন্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম অরণ্যের
বদ্ধ খাঁচায়, আমি তাই অরণ্য থেকে বেরিয়ে হাঁটতে
চাইলাম জনারণ্যে, তুমি দরজা বন্ধ করে দিলে।
অঝোর বৃষ্টিতে আমি ভিজিনি বহুকাল, পৌষের
গতর ছুঁয়ে ঝরে পড়া কুয়াশা আটকে গেছে
বনরাজির দীঘল পাতায়, সূর্যের খরতাপ বনের
অন্ধকারে মিশে গেছে বেদনায়, বাতাসের ঢেউগুলো
জমাট বরফের মতো স্থির ঝুলে আছে শুষ্ক শূন্যতায়,
আমি বহুকাল বাতাসের মৌতাত থেকে চুমুক চুমুক
পান করিনি জলবতী মেঘ, তবু তুমি ফিরতে দিলে না
জনপদে, যেখানে এখনও উদ্বাস্তু নাবিকেরা মাস্তুল
উঁচিয়ে বসে আছে জোয়ারের অপেক্ষায়।
আমি ফিরলেই সাহসী যুবকেরা মিছিল নিয়ে নামবে
রাস্তায়, রক্তশূন্য রাজপথ ফিরে পাবে মানুষের পা।
----
আয়ুরেখা মুছে গেলে
এহসানুল ইয়াসিন
আয়ুরেখা মুছে গেলে খুলে যায় অক্ষমতার দরজা।
তেড়ে আসে অযাচিত উত্পাত। অচেনা মুখ,
কিংবা দৈনিক খবরের রাশিফল।
আমি তখন পাঠ করি নিজের
অভিজ্ঞতা
আস্থা রাখি মানুষের উপর
রাখি পায়ের উপর পা।
আমার মনে পড়ে পিতৃপুরুষের মুখ
তিনি অসীম আকাশের দিকে তাকিয়ে
মাটির উর্বরতার কথা বলতেন।
তিনি বলতেন—
কাঠের সিন্দুকে রক্ষিত ভূর্জপত্রে লেখা
ইতিহাসের পরম্পরার কথা।
কী করে ভুলে যাই?
আমার চোখ পড়ে আয়নার উপর
নিজেকে দেখি পায়ের মাপে।
প্রতিবিম্বিত হয় আয়না ও পা।
ভুলে যাই আয়ুরেখা
জন্ম মৃত্যু কিংবা নিজের নাম। কেননা
আমার জন্য কলঙ্ক মাথায় নিয়ে
দাঁড়িয়ে আছে যে মেয়েটি
তারচেয়ে বড় কোনো সত্য নেই!
---
ঘুমের মাজেজা
মোস্তফা হামেদী
আজ দুপুরে ঘুমের পিঠের পাখাটা কেটে দিয়েছি
ফলে সে বজ্রাহত পাখির মতো তড়পাতে তড়পাতে
উড়ে এসে বসল আমার-ই চোখে
অদ্য অনাহারী চোখ আঙুরের মতো টুপ করে গিলে খেল তাকে
ছড়িয়ে দিল রস শরীরের বন্দরে বন্দরে
শিরার চাষ করা ক্ষেতে বুনে দিল বুনো কর্মবীজ
...পরিশ্রান্ত পাহাড়ে ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠল স্বপ্নবট
প্রত্যয়প্রজাপতির বর্ণচ্ছটায় কর্মচঞ্চল নগরে ধেয়ে এল রঙের প্লাবন
----
ইলশে রঙের নীড়
আজিম হিয়া
মাতাল পৃথিবী আর একটা আকাশ
আয়নাজুড়ে বসে আছে তোমাদের ছায়া—যেন একটা দেয়াল
অথবা নিঃসঙ্গতাগুলো ঢেকে দেয়া পাথর কিংবা পিচ।
চোখের প্রোফাইলে—মস্তিষ্কের রঙ কিংবা মরা বাতাস
লিখে চলেছে ঐতিহ্যাশ্রয়ী প্রচ্ছন্ন ইতিহাস
আর ডাবগুলো সব নারিকেল হবার আগেই চুপসে যাচ্ছে
যুবতীর সুগভীর স্তন—আহা! আকাশ যেন মেঘদের কলোনি
বলাত্কার সহ্য করে তবু বেঁচে আছে তারাগুলো এবং
ইলশে রঙের নীড়—
সোমেশ্বরীর চিকচিকে হাসির মতো আমাদের সবুজ অরণ্যের ভেতর