অটিস্টিক মডেল স্কুলের প্রত্যাশা

বাংলাদেশে এখন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অটিস্টিক শিশুদের জন্য। কিন্তু অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকাকেন্দ্রিক। তাও আবার সবার জন্য সহজলভ্য নয়। সরকারি কার্যক্রমগুলো এখন আমাদের কাছে সুস্পষ্ট নয়। এখনও পর্যন্ত ‘অটিজম’ শব্দটি প্রতিটি জেলা বা থানা শহরে একটি নতুন শব্দ হিসেবেই পরিগণিত হচ্ছে। এমনকি বেশিরভাগ এমবিবিএস ডাক্তারও এ সম্পর্কে খুব একটা ধারণা রাখেন না। তাহলে তাঁরা কীভাবে শিশুদের কার্যকরী জায়গায় রেফার করবেন। থানা লেভেলের সরকারি ডাক্তারদের নিয়ে যদি অটিজম বিষয়ক একটি সেমিনার বা ওয়ার্কশপ করা হতো তাহলেও একটা প্রাথমিক সেবা সকল শ্রেণির মানুষ তাঁদের সামর্থ্যের মধ্যে পেতে পারতেন। এই প্রাথমিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শিশুরা অনেক ছোটবেলা থেকেই একটা গঠনমূলক ধারাবাহিকতার মধ্যে থাকার কারণে তাদের সমস্যাগুলোও কমে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারতো। বর্তমানে ৩০টিরও বেশি অটিস্টিক স্কুল আছে শুধু ঢাকা শহরেই। ঢাকার বাইরে প্রায় নেই বললেই চলে। কিন্তু এসব স্কুলের শিক্ষার মানদণ্ড কি কেউ পরিমাপ করছেন? একটি অটিস্টিক স্কুল দেয়া যেন অনেক সহজ ব্যাপার হয়ে উঠেছে। কারা দিচ্ছেন এসব স্কুল? এরকম দেখা যাচ্ছে যে শুধুমাত্র কিছুদিন কোনো অটিস্টিক স্কুলে কাজ করেছেন তারপর নিজেই একটি স্কুল খুলেছেন। শুধুমাত্র কাজের অভিজ্ঞতা কি একটি অটিস্টিক স্কুল খোলার জন্য বা পরিচালনা করার জন্য যথেষ্ট হতে পারে? অটিস্টিক শিশুদের যেহেতু থেরাপির প্রয়োজন আছে, বিশেষ গঠনমূলক শিক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করে শিক্ষা দিতে হয় এজন্য বহু পেশাজীবী বহু মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে হয় তাই একটি মানদণ্ড এইসব স্কুলের জন্য থাকলে ভালো হয়। একটি ভালো গঠনমূলক অটিস্টিক স্কুলের জন্য পাঁচটি প্রফেশনাল অত্যাবশ্যকীয়— অকুপেশনাল থেরাপিস্ট স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট, সাইকোলজিস্ট, প্রাতঃশিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক। এছাড়াও অন্য কিছু বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন মিউজিক শিক্ষক, আর্ট শিক্ষক, অভিজ্ঞ সহায়ক উপকরণ প্রণেতা এবং কিছু মেডিকেশনের জন্য শিশু বিশেষজ্ঞ। কয়টি স্কুলে আমরা এই প্রফেশনালদের পাবো? কে এই মানদণ্ডগুলো নিশ্চিত করবেন? পুরো ঢাকা শহরে একটিও স্কুল পাওয়া যাবে না যে সকল প্রয়োজন নিশ্চিত করতে পারে। এমন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান কি আমরা আশা করতে পারি না যেখানে সকল প্রফেশনাল পাওয়া যাবে। যে প্রতিষ্ঠানকে মডেল প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার করা যাবে। সকল প্রফেশনাল না থাকার একটি বড় কারণ হলো অপ্রতুলতা। এমন কিছু পেশা আছে প্রতি বছর মাত্র কয়েকজন করে প্রফেশনাল বের হচ্ছেন। এর কারণ হলো মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান এই পেশার কোর্স পরিচালনা করছে। যেমন বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনাল ইন্সটিটিউট শুধুমাত্র অকুপেশনাল থেরাপি ও স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি কোর্স দুটি পরিচালনা করছে। কিন্তু একটু উদ্যোগ নিলেই বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঐ কোর্সগুলোও অনেক সফলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে। অনেক অপ্রতুলতার মধ্যেও বাংলাদেশে কিছু পুরোনো অটিস্টিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো একটু উদ্যোগ নিলে একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ অটিস্টিক সেন্টার হিসেবে নিজেদের পরিচিত করতে পারে। এ ব্যাপারে নিজ নিজ প্রফেশনালদেরও রয়েছে একটি গুরু দায়িত্ব। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রকে প্রসারিত করার জন্য স্কুলে একটি করে প্রেজেন্টেশন বা ইন সার্ভিস বা ওয়ার্কশপ করা গেলে প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা তা জানতে পারেন ও নিজ প্রতিষ্ঠানে অটিস্টিক শিশুদের অধিক উন্নতির জন্য সচেষ্ট হন। অভিভাবকেরাও পালন করতে পারেন কিছু দায়িত্ব। তাঁরা নিজেরা জানুন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষকে তা অবহিত করুন। নিজ শিশুকে ভর্তির জন্য এমন স্কুল নির্বাচন করুন যেখানে সকল প্রফেশনাল আছেন। দেশের সকল অটিস্টিক শিশু বেড়ে উঠুক সমভাবে সকল সুবিধে গ্রহণ করে। তারাও আমাদের সমাজেরই একজন হয়ে গড়ে উঠুক— এই হোক সকলের কাম্য। ঢাকা