ন ও গাঁ

গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিঃ ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর নওগাঁয় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। আওয়ামী লীগের নেতা অ্যাডভোকেট বয়তুল্যাহকে (এমএলএ) আহ্বায়ক নির্বাচন করা হয়। পরিষদের অন্যান্য সদস্য ছিলেন মো. আব্দুল জলিল, আনম মোজাহারুল হক, এমএ রকীব, একেএম মোরশেদ প্রমুখ। সে সময় নওগাঁ শহরের বাঙ্গাবাড়িয়া মহল্লায় ইপিআরের ৭ নম্বর উইং কমান্ডারের হেড কোয়ার্টার ছিল। এর অধিনায়ক ছিলেন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের বাসিন্দা মেজর আকরাম বেগ। ২৫ মার্চের কয়েকদিন আগে মেজর আকরামের স্থলে নওগাঁ ইপিআর ক্যাম্পে বদলি হয়ে আসেন বাঙালি কর্মকর্তা মেজর নজমুল হক। কিন্তু সে সময় দেশব্যাপী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে মেজর বেগ বদলি হয়ে আসা মেজর নজমুলের কাছে ক্যাম্পের দায়িত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে মেজর নজমুল কৌশলে ২৪ মার্চ রাতে মেজর আকরাম বেগ ও আর এক পাক অফিসার ক্যাপ্টেন নাভেদ আফজালকে গ্রেফতার করেন। সেই সঙ্গে নওগাঁ মহকুমা প্রশাসক পাঞ্জাবের বাসিন্দা নিসারুল হামিদকে গ্রেফতার করে নওগাঁ মহকুমাকে সদ্য ঘোষিত স্বাধীন বাংলার মুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হয়। এ সময় সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ সদস্যরা নওগাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বভার গ্রহণ করে। নওগাঁ মহকুমা হানাদারদের দখলে যায় ২২ এপ্রিল। এর আগেই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মো. আব্দুল জলিলসহ মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পার হয়ে ভারতে অবস্থান নেয়। সে সময় নওগাঁ মহকুমা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ৭নং সেক্টরের অধীনে। এই সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন মেজর নূরুজ্জামান। মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ পরিকল্পনা তৈরি, তাদের রসদ সরবরাহের বিষয় তদারকিসহ সার্বিক বিষয় সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করতেন আওয়ামী লীগ নেতা মো. আব্দুল জলিল। হরতকীর যুদ্ধ:১৯৭১ সালের ১৯ জুন। সদ্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ধামুরহাটের সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থানকালে খবর পায় হানাদার বাহিনীর একটি দল পাঁচটি ট্রাকযোগে প্রচুর পরিমাণ ভারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পত্নীতলা এলাকায় আসছে। এ অবস্থায় মেজর নজমুল হকের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ধামুরহাট থানার হরতকী নামক স্থানে অবস্থান নেয়। পরে হানাদার বাহিনীর অস্ত্র বোঝাই ট্রাক সেখানে এলে অতর্কিত আক্রমণ চালায় মুক্তিযোদ্ধারা। শুরু হয় হানাদার বাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্মুখ যুদ্ধ। সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ এই যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে চারটি ভারি মেশিনগান, ১২টি এলএমজি, দুইটি এসএমজি, তিনটি মর্টার, ২০টি স্টেনগান ও দেড় শতাধিক রাইফেলসহ প্রচুর পরিমাণ হ্যান্ড গ্রেনেড ও দুইটি অয়্যারলেস সেট হস্তগত করে। যুদ্ধে পাকবাহিনীর বেশ কয়েকজন সৈন্য নিহত হয়। তারানগর-বাউলার যুদ্ধ:১৯ সেপ্টেম্বর দুপুরে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা আত্রাই উপজেলার বান্দায়খারা গ্রামে নৌকাযোগে এসে সাধারণ মানুষজনকে হত্যা করে ও লুটতরাজ চালাতে থাকে। হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে বিকালে মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক, ময়নুল হক মুকুল, নার্গিস, আফজাল হোসেন ও বিশুর নেতৃত্বে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধার চারটি দল আত্রাই নদীর তারানগর-বাউলা নামক স্থানে হানাদার বাহিনীর উপর হামলা চালায়। বেধে যায় দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল যুদ্ধ। যুদ্ধে ৫০ জনের বেশি পাকসেনা ও কয়েকজন রাজাকারের মৃত্যু হয়। শহীদ হন একজন মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামের তিন নারী। এর আগে মুক্তিযোদ্ধারা রানীনগর উপজেলার তিলাভাদুরী গ্রামে ১৬ জুলাই চার জন পাকসেনাকে হত্যা করে। পার বোয়ালিয়া যুদ্ধ:৭ নভেম্বর দুপুরে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা নওগাঁ সদর উপজেলার জয়বাংলা হাট ও পার বোয়ালিয়া গ্রামে হামলা চালিয়ে ১৪/১৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা জালাল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পার বোয়ালিয়া গ্রামে হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে কয়েকজন মোজাহিদ সদস্য ও একজন পাকসেনাকে হত্যা করে। পরে হানাদাররা অস্ত্রশস্ত্র ফেলে পালাতে বাধ্য হয়। পাকবাহিনীর বিমান হামলা:মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে স্থলযুদ্ধে সুবিধা করতে না পেরে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা কৌশল পাল্টে নভেম্বর মাসের প্রথমদিকে বিমান হামলা শুরু করে। সেই সঙ্গে স্থল ও নৌপথে হামলাও অব্যাহত রাখে। তাদের মুহুর্মুহু হামলায় রানীনগর উপজেলার সাকারপুকুর ও সাতবাড়িয়া এলাকায় অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারা বেকায়দায় পড়ে যান। সে সময় ওই এলাকার নিকটবর্তী স্থানে থাকা আব্দুল মালেক, ওহিদুর রহমান, জালাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের দল কভার ফায়ারিংয়ের মাধ্যমে হানাদার বাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়। পত্নীতলা ট্র্যাজেডি:পত্নীতলা উপজেলার সৈয়দপুর, পাইকবান্দা, হলাকান্দরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর লোকদের ওপর হামলা চালায় পাকবাহিনীর দোসর রাজাকার আল-বদর বাহিনী। নিরীহ ঐ সম্প্রদায়ের অপরাধ ছিল তারা বাইরে থেকে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য-সহযোগিতা করতো। এ কারণে এলাকার রাজাকার আল-বদর বাহিনীর সদস্য আ. লতিফ, মনছুর আলী, ইয়াছিন আলী, ইসমাইল হোসেনসহ অনেকেই সংখ্যালঘুদের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিল। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে তারা সৈয়দপুর, পাইকবান্দা হলাকান্দরসহ নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় হামলা চালায় এবং ৪০/৪৫ জনকে হালিমনগর এলাকায় ধরে নিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। যারা গুলিতে মরেনি তাদেরও নরপিশাচরা কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে মেরেছে। অবশেষে মুক্তি:১০ ডিসেম্বরের আগেই নওগাঁ সদরের আশপাশের এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। পরে ১৬ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয়ভাবে হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবরে নওগাঁয় অবস্থানরত হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক মেজর সাঈদ রাতে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার জালাল হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে দূত মারফত যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। সে অনুযায়ী ১৭ ডিসেম্বর সকাল ৭টার দিকে মুক্তিযোদ্ধা জালাল হোসেন চৌধুরীর দল কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে নওগাঁ শহরের দিকে এগুতে থাকলে হানাদার বাহিনীর সদস্যরা চুক্তি ভঙ্গ করে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর অতর্কিত গুলিবর্ষণ করতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলিবর্ষণ করে সামনে এগুতে থাকে। গভীর রাত পর্যন্ত চলে দুই পক্ষের গুলি বিনিময়। ১৮ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিবাহিনী এবং মেজর চন্দ্রশেখর ও পিবি রায়ের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর দল নওগাঁ শহরের চারপাশে অবস্থান নিলে অবস্থা বেগতিক দেখে হানাদার বাহিনী শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করে। এদিন নওগাঁর তত্কালীন মহকুমা প্রশাসক সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীকে স্বাগত জানান। পরে কেডি স্কুল প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে মিত্রবাহিনীর কাছে হানাদার বাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের মধ্য দিয়ে মুক্ত হয় নওগাঁ।