শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দিন হোসেনের স্ত্রী নূরজাহান সিরাজী আর নেই

শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সহধর্মিণী নূরজাহান সিরাজী আর নেই। গত শুক্রবার রাত ৩টা ৩০ মিনিটে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজেউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। গতকাল বাদ জুম্মা মোহাম্মদপুর পোস্ট অফিস সংলগ্ন বায়তুস সালাম মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। শহীদ-জায়া নূরজাহান সিরাজীর আমৃত্যু প্রত্যাশা ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যাবার। তার জীবদ্দশায় তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো দেখে গেলেও রায় দেখে যেতে পারলেন না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দীন হোসেনের স্ত্রী নূরজাহান সিরাজীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান ও তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন। এছাড়াও শোক প্রকাশ করে বাণী দিয়েছেন দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক ও জাতীয় পার্টি- জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। গত ২০ দিন শহীদ-জায়া প্রথমে ল্যাব এইড ও পরে অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিত্সকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হলে চিকিত্সকরা লাইফ সাপোর্ট দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে রাত সাড়ে তিনটার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। নূরজাহান সিরাজী দীর্ঘদিন ধরে কিডনি, ফুসফুস ও হূদপিণ্ডের জটিলতায় ভুগছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন দৈনিক ইত্তেফাকের তত্কালীন নির্বাহী সম্পাদক শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন অন্যতম সাহসী সাংবাদিক, যিনি সুকৌশলে, নির্ভীকভাবে ইয়াহিয়া সরকারের নানা অপকর্মের দিক উন্মোচন করেছেন। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে তিনি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সরকারি প্রচারণার জবাব দিয়েছিলেন সাংবাদিকের ভাষায়। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর রাত সাড়ে তিনটার দিকে আল বদর বাহিনীর সদস্যরা সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তার লাশও পাওয়া যায়নি। পাক বাহিনীর দোসর আল বদর বাহিনীর সদস্যরা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে ধরে নিয়ে যাবার মধ্য দিয়েই শুরু করে ঘৃণ্য এই পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। স্বামীর মৃত্যুর পর অনাথ আট সন্তানকে মানুষ করার এক কঠিন জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি হন এই সংগ্রামী নারী। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেও কখনও হাল ছেড়ে দেননি। অসম ধৈর্য নিয়ে তিনি তার প্রতিটি ছেলেকে বড় করেছেন। কিন্তু তার জীবন সংগ্রামে অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যাওয়া। বিভিন্ন সাক্ষাত্কারে, আলোচনায় তিনি সবসময় তার এই প্রত্যাশার কথা বলেছেন। নূরজাহান সিরাজীর জন্ম ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার চুমুরদি গ্রামে। তার পিতা মৌলভি নুরুদ্দিন আহমেদ আর মা মাজেদুন্নেসা। বেগম নূরজাহান সিরাজী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহপাঠী ও তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা প্রয়াত শামসুদ্দিন মোল্লার একমাত্র বোন। ১৯৪৮ সালের ১১ এপ্রিল সাহিত্যিক ও সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। আট পুত্রের মধ্যে তার দ্বিতীয় পুত্র শাহীন রেজা নূর বর্তমানে দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক ও প্রজন্ম-৭১-এর সভাপতি, আরেক পুত্র জাহিদ রেজা নূর দৈনিক প্রথম আলোর উপ ফিচার সম্পাদক, নিউইয়র্ক প্রবাসী সেলিম রেজা নূর মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও কলাম লেখক, ফাহিম রেজা নূর নিউইয়র্কের ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সাবেক বার্তা সম্পাদক। এছাড়া তার বড় ছেলে শামীম রেজা নূর, তৃতীয় পুত্র ফাহিম রেজা নূর ও তৌহিদ রেজা নূর অন্তিম শয্যা পাশে উপস্থিত ছিলেন। তার মৃত্যুর খবর শুনে আত্মীয়-স্বজন শুভানুধ্যায়ীরা ছুটে আসেন মোহাম্মদপুরের বাসায়। শুক্রবার শহীদ-জায়ার আসাদ এভিনিউ-এর বাড়িতে মরহুমার প্রতি ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে এপিএস সাইফুজ্জামান শেখর। তাঁকে শেষবারের মত শ্রদ্ধা জানাতে আসেন স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, প্রফেসর ইমিরেটাস আনিসুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, শহীদ জায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, পাক্ষিক অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কার্যকরী সভাপতি শাহরিয়ার কবির, প্রাক্তন ছাত্রলীগ ফাউন্ডেশনের আহ্বায়ক নূরে আলম সিদ্দিকী, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, মনজুরুল হক, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, জাসদ নেত্রী শিরীন আখতার, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ, বিশিষ্ট আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন প্রমুখ। তাঁর মরদেহে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি, প্রজন্ম’৭১, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। কুলখানি ও দোয়া মাহফিল মরহুমার কুলখানি আগামী ২৪ ডিসেম্বর সোমবার বাদ মাগরিব তার মোহাম্মদপুরের ৩/১১ আসাদ এভিনিউয়ের বাসায় অনুষ্ঠিত হবে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে সকল আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীকে কুলখানিতে অংশ নেয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। জেপির শোক শহীদ বুদ্ধিজীবী সিরাজুদ্দিন হোসেনের স্ত্রী নূরজাহান সিরাজীর ইন্তেকালে জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে জেপি নেতৃদ্বয় মরহুমার রুহের মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।