গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ
চাঁ দ পু র
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:১৮
মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি: প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য সমগ্র জাতি যখন ঐক্যবদ্ধ, তখন চাঁদপুরের মানুষও তা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেনি, আসন্ন যুদ্ধের জন্য তারাও তৈরি হতে থাকে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে চাঁদপুর মহকুমা সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা-কর্মীরা স্বাধীনতা আন্দোলনে তত্পর হয়ে ওঠে। তাদের উদ্যোগে চাঁদপুর নতুনবাজার বালির মাঠে কাঠের রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। ১৭ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ শাখার বাঙালী হাবিলদার আ: সাত্তার চাঁদপুরের অলিপুর গ্রামে ৩০ জন ছাত্র, কৃষক, ছুটি ভোগরত সেনা সদস্যদের নিয়ে একটি গেরিলা দল গঠন করেন।
সংগ্রাম পরিষদ গঠন: চাঁদপুর মহকুমার মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে। পাইকপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে গঠিত হয় এই সংগ্রাম পরিষদ বা আঞ্চলিক সরকার। এর সভাপতি বা সরকার প্রধান ছিলেন তত্কালীন মহকুমা আওয়ামী লীগ সভাপতি আ: রব মিঞা।
সংগ্রাম পরিষদে আর যারা ছিলেন: সদস্য- সামাজিক শান্তি শৃঙ্খলা ও বিচার: আ: করিম পাটওয়ারী, সদস্য- প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র- অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম (যিনি পরবর্তী সময়ে সীমান্তের ওপারে চলে যান, দায়িত্ব ন্যস্ত হয়: প্রতিরক্ষা- জহিরুল হক পাঠান এবং স্বরাষ্ট্র: কলিম উল্লাহ ভুঁইয়া)। সদস্য- অর্থ ও ব্যবস্থাপনা: অ্যাডভোকেট আবু জাফর মঈন উদ্দীন, সদস্য- সমন্বয় ও আন্তঃ যোগাযোগ: রাজা মিঞা, সদস্য- কৃষি ও বাণিজ্য: রফিকউদ্দীন আহমেদ আখন্দ, সদস্য- দপ্তর, তথ্য সংগ্রহ ও সঞ্চালন: জীবন কানাই চক্রবর্তী (ন্যাপ-মোজাফফর নেতা), সদস্য- যুদ্ধের আঞ্চলিক সর্বাধিনায়ক: ক্যাপ্টেন জহিরুল হক পাঠান, সহ-সর্বাধিনায়ক: কলিম উল্লা ভুঁইয়া (গণবাহিনী ও ন্যাপ-ভাসানী নেতা)। পাইকপাড়ায় এই আঞ্চলিক সরকার গঠনের পর থেকেই সত্যিকার অর্থেই সেখানে মুক্তি সংগ্রাম প্রকৃত রূপ পেতে শুরু করে।
প্রতিরোধ: ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ কাল রাতে পাক হানাদার বাহিনী রাজধানী ঢাকায় নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করছে- এমন খবর পাবার পর থেকেই চাঁদপুরে চলতে থাকে হানাদারদের প্রতিরোধের প্রস্তুতি। বোমা বানানো হতে থাকে। চাঁদপুর-কুমিল্লা মহাসড়কে সেতুগুলোর দুই পাশের মাটি কেটে বড় বড় বাঙ্কার সৃষ্টি করা হয়, যাতে পাকসেনাদের গাড়ির বহর চাঁদপুর শহরে ঢুকতে না পারে।
চাঁদপুরের প্রথম ৪ শহীদ: ৩ এপ্রিল দুপুরে চাঁদপুর শহরের নতুন বাজারস্থ ট্রাক রোডের পাশে পোদ্দার বাড়ির একটি টিনের ঘরে বসে বোমা তৈরি করছিল স্কুল-কলেজের কয়েকজন ছাত্র-যুবক। হঠাত্ একটি বোমা হাত থেকে পড়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হলে পুরোঘরটি বিধ্বস্ত হয়। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় শহীদ হয় কালাম, খালেক, সুশীল ও সংকর নামে ৪ যুবক। আহত হয় আরো ৩ জন।
হানাদার বাহিনীর আক্রমণ: ৭ এপ্রিল সকাল থেকে পাক বাহিনীর দুইটি জঙ্গি বিমান চাঁদপুর শহরে অবিরাম শেলিং শুরু করে। এতে বড় স্টেশনের নিকট এক নারী নিহত হন এবং নতুন ও পুরান বাজারে প্রায় দেড়শ লোক আহত হয়, বহু ঘরবাড়ি হয় বিধ্বস্ত। লোকজন ভয়ে শহর ছেড়ে পালাতে থাকে। ৮ এপ্রিল বিকালে হানাদার বাহিনীর শ পাঁচেক সৈন্য ভারি অস্ত্রসহ চাঁদপুর শহরে প্রবেশ করে। তাদের মূল ঘাঁটি ছিল শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে ষোলঘর টেকনিক্যাল হাই স্কুলে, পাক অফিসাররা আস্তানা গাড়ে ওয়াপদা রেস্ট হাউজে। পরদিন কার্ফ্যুর মাঝে বের হওয়ার অজুহাতে সাইকেল আরোহী আফাক ও মাখন লাল নামে দুই যুবককে গুলি করে মারে পাক বাহিনী।
৪৮টি যুদ্ধ: চাঁদপুর অঞ্চলে মোট ৪৮টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এর মধ্যে রয়েছে চিতোষী যুদ্ধ, সাহেব বাজার যুদ্ধ, মেঘনাবাদী অপারেশন যুদ্ধ, রূপসা বাজার যুদ্ধ, গাজীপুর লঞ্চ আক্রমণ যুদ্ধ, মিরপুর যুদ্ধ, খাজুরিয়া যুদ্ধ, বদরপুর-গাব্দেরগাঁও যুদ্ধ, শোল্লাযুদ্ধ, চরশোলাদী যুদ্ধ ইত্যাদি।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা: সরকারি হিসেব অনুযায়ী স্বাধীনতা যুদ্ধের ৯ মাসে জেলার ৮টি উপজেলায় ১২০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন।
বধ্যভূমি/গণকবর: চাঁদপুর জেলার বাগাদী, ছোটসুন্দর, বাবুরহাট, ফরিদগঞ্জ, আহম্মদনগর, সাচার, রায়স্ত্রী, গৃদকালিন্দিয়া, চরভাগল, দত্রা, রঘুনাথপুরসহ ১৩টি এলাকায় বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করা হয়েছে।
বন্দী শিবির: চাঁদপুর জেলায় পাকহানাদার বাহিনীর বন্দী শিবির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে চাঁদপুর বড় স্টেশনের মোলহেড ফরিদগঞ্জ ডাকবাংলো ও সাবরেজিস্ট্রি অফিস, হাজীগঞ্জ হামিদিয়া জুট মিল ও জনাব আলী ময়দানের পার্শ্বে রাজাকার কমান্ডার বাচ্চুর অফিস ভবন (বর্তমানে এটি হাজীগঞ্জ সার্কেল এএসপির অফিস ভবন)।
বন্দী শিবির: পাকসেনারা মেঘনা, ডাকাতিয়া ও পদ্মা নদীর মোহনায় চাঁদপুর বড় রেল স্টেশনের মোলহেডে স্থাপন করে একটি টর্চার ক্যাম্প। এই ক্যাম্প বা বন্দি শিবিরে এনে জিজ্ঞাসাবাদের নামে বহু লোককে অকথ্য নির্যাতনের পর নির্মমভাবে হত্যা করেছে পাক বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদররা, ধর্ষণ করেছে বহু নারীকে। হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দিয়েছে। এছাড়া ফরিদগঞ্জ ডাকবাংলো ও সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, হাজীগঞ্জ হামিদিয়া জুট মিল ও জনাব আলী ময়দানের পাশে রাজাকার কমান্ডার বাচ্চুর অফিস ভবনের বন্দি শিবিরেও বহু লোককে নির্যাতনশেষে হত্যা করা হয়।
যেভাবে মুক্ত হলো: ২৩ মাউন্টেন ব্রিগেডের মিত্র বাহিনী ও সংযুক্ত বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলার দক্ষিণাংশসহ চৌদ্দগ্রাম, লাকসাম, শাহরাস্তি, চিতোষী, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর ও কুমিল্লা জেলার সেনানিবাস হানাদার মুক্ত করে।
এ কোম্পানির দায়িত্বে ছিলেন মেজর এস.পি ভট্টাচার্য। কোম্পানিটি ৪টি প্লাটুনে বিভক্ত ছিল। ১ম প্লাটুনের দায়িত্বে ছিলেন সার্জেন (অবঃ) আহম্মদ (ময়মনসিংহ), ২য় প্লাটুনের দায়িত্বে ছিলেন কর্পোরাল (অবঃ) মোকাম্মেল (সন্দ্বীপ) ও ৪র্থ প্লাটুনের দায়িত্বে ছিলেন মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার (অবঃ) মাহমুদ উল্লাহ (সন্দ্বীপ)। সিনিয়র টেক (অবঃ) জয়নাল আবেদীন (চাঁদপুর) ছিলেন কোয়ার্টার মাস্টারের দায়িত্বে। সম্মিলিত বাহিনী ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুরের অদূরে মহামায়া, চাঁদখার পুল ও বাবুরহাট অঞ্চল হতে চাঁদপুর শহরে অবস্থিত পাক হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণ চালায়। সেই আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পাক বাহিনী ও তাদের দোসররা চাঁদপুর শহর ছেড়ে পালিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হয়; কিন্তু মেঘনা নদী বক্ষে সম্মিলিত বাহিনীর আক্রমণে পাক বাহিনীর ২টি জাহাজে আগুন ধরে যায়। এতে বহু পাক সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়। চাঁদপুরের ইচলী ঘাট এলাকায় প্রায় ৫০০ পাকসেনা সম্মিলিত বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পন করে।
চাঁদপুরের কয়েকজন বীর সন্তান: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহযোদ্ধা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুম মিজানুর রহমান চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধের ১নং সেক্টর কমান্ডার মেজর (অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম। এছাড়া আছেন ২ জন বীর উত্তম ও ৩০ জন বীর প্রতীক খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। (এ লেখার বিভিন্ন তথ্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদ থেকে প্রকাশিত গ্রন্থ ও চাঁদপুর জেলা তথ্য বাতায়ন থেকে সংগৃহীত)।