সহযোগিতা বাড়াতে দুটি সমঝোতা চুক্তি
নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ করতে থাইল্যাণ্ডের আগ্রহ
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৪
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা বাংলাদেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসোসিয়েশন অব সাউথ এশিয়ান নেশন্স (আসিয়ান) সংলাপ ও মেকং গঙ্গা কো অপারেশন ইনিশিয়েটিভ (এমজিসিআই)-এ বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে থাইল্যান্ডের সহযোগিতা চেয়েছেন। গতকাল শনিবার সফররত থাই প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তারা এই আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সব সময়ই আসিয়ানের সফলতার প্রশংসা করে আসছে। আসিয়ান বৃহত্তর আঞ্চলিক সংহতিকে বাড়িয়ে তুলছে বলেও তিনি উল্লে¬খ করেন। বঙ্গোপসাগরে মিলিত হওয়ার পথে গঙ্গা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তাই বাংলাদেশকে এমজিসিআইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ সফরের জন্য প্রধানমন্ত্রী থাই প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এ সফর দু’দেশের গতিশীল সম্পর্ককে আরো বেগবান করবে। থাই প্রধানমন্ত্রী দু’দিনের সরকারি সফরে শুক্রবার ঢাকা এসে পৌঁছান। শনিবার বিকালে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন।
এ সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, শিল্পমন্ত্রী দিলিপ বড়ুয়া, বাণিজ্যমন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের, অ্যাম্বাসেডার এট লার্জ এম জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এম ওয়াহিদুজ্জামান, সংশ্লি¬ষ্ট সচিব ও সিনিয়র কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া থাইল্যান্ডের পক্ষে অন্যান্যের মধ্যে সেদেশের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুরাপঙ তোভিচাকচাইকুল, বাণিজ্যমন্ত্রী বুনসঙ তেরিয়াপিরম এবং বাণিজ্যমন্ত্রী প্রাসেরাত বুনসিচুক উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে অভিন্ন মূল্যবোধের ভিত্তিতে চমত্কার সম্পর্ক বিরাজ করছে। এছাড়া দু’দেশ গণতন্ত্র, উন্নয়ন, শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়েও অঙ্গীকারবদ্ধ। থাইল্যান্ড বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। দু’দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক এবং সব বিষয়ে আলাপ-আলোচনা দিন দিনই বেড়ে যাওয়ার মধ্যদিয়ে এর প্রতিফলন ঘটছে।
থাই প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেন। তিনি দু’দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব তৈরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ইংলাক দু’দেশের বিনিয়োগ বিশেষ করে কৃষিখাতে সহযোগিতার প্রস্তাব করেন। এছাড়া তিনি অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে তার দেশের বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর বিষয়ে সেদেশের সরকারের আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন।
তিনি দু’দেশের যোগাযোগ আরো বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং আশা করেন থাই কোম্পানির দ্বারা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণ কাজ খুব শিগগিরই শুরু হবে। এর আগে উভয় প্রধানমন্ত্রী একান্ত বৈঠকে মিলিত হন। এ বৈঠকে দু’জনে উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে দু’দেশের মধ্যে ৪০টি বৃত্তি প্রদানের বিষয়ে একমত হন।
বাণিজ্য ব্যবধান হ্রাসের আহ্বান জানালেন শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পারস্পরিক স্বার্থে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্য ব্যবধান হ্রাসের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, পরস্পরের পণ্য ও সেবা খাতে অধিকতর বাজার প্রবেশাধিকার সুবিধা প্রদান করা হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য আরো বৃদ্ধি পাবে।
সফররত থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার সম্মানে শনিবার সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক মধ্যাহ্ন ভোজসভায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘পারস্পরিক স্বার্থে আমাদের বাণিজ্য সম্পর্কের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আমাদের বেসরকারি খাতগুলোর একযোগে কাজ করা প্রয়োজন।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে বাণিজ্য ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ এ সময় থাইল্যান্ড থেকে প্রায় ৮৮০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য কিনেছে এবং রফতানি করেছে ৫১.৪ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য।
বাংলাদেশকে বিনিয়োগের অন্যতম আদর্শ স্থান হিসেবে উল্লে¬খ করে শেখ হাসিনা এখানে বিশেষ করে অবকাঠামো উন্নয়ন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বিদ্যুত্ উত্পাদন এবং তেল ও গ্যাস উত্তোলন ক্ষেত্রে আরো অধিক থাই বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘১৫ কোটিরও বেশি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ও ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার অর্জনকারী বাংলাদেশে রয়েছে বিপুল- সংখ্যক উদ্যমী কর্মজীবী মানুষ। খুবই বিনিয়োগ অনুকূল বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বিদ্যুত্ উত্পাদন এবং তেল ও গ্যাস উত্তোলন সেক্টরে থাই বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে অব্যাহত প্রবৃদ্ধি, শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একাধিকবার মতবিনিময় এবং জনগণের মধ্যে অধিকতর যোগাযোগ দু’দেশের মধ্যে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ দৃঢ় সম্পর্কের প্রমাণ বহন করে, যা বর্তমানে আরও জোরদার হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডে বিদ্যমান পরিস্থিতি দেশ দু’টিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রবেশদ্বারে পরিণত করেছে এবং দু’টি অঞ্চলের মধ্যে প্রাকৃতিক সেতুবন্ধ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে সড়ক ও সমুদ্রপথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে শুধুমাত্র দু’টি দেশ ও তাদের জনগণই নয় বরং পুরো এ অঞ্চলও লাভবান হবে।
দু’টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সমপ্রসারণসহ দু’দেশের মধ্যে কৃষি এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে দু’টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সফররত থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার মধ্যে শনিবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
কর্মকর্তারা জানান, দু’দেশের উন্নয়ন এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারসহ কোন ভুল বুঝাবুঝি কিংবা প্রতিবন্ধকতা দেখা দিলে তা নিরসনের উদ্দেশ্যে ‘দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালু’ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া কৃষি বিষয়ে সহযোগিতার জন্য যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় তার উদ্দেশ্য এ বিষয়ে সম্ভাবনাগুলোকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোসহ যৌথ কর্মসূচির উদ্যোগ নেয়া।
বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এবং থাইল্যান্ডের পক্ষে সেদেশের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুরাপং তোভিচাকচাইকুল ‘দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালু’ বিষয়ক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। বাংলাদেশের কৃষি সচিব মঞ্জুর হোসেইন এবং থাইল্যান্ডের কৃিষ বিষয়ক পার্মানেন্ট সেক্রেটারি শাভালিত ছুকাজর্ন কৃষি বিষয়ক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। এ সময়ে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।