সওজের পাঁচ হাজার কোটি টাকার জমি বেহাত!

জমি অধিগ্রহণ করা হলেও যথাসময়ে নামজারি করা হয় না। এ কারণে দিনে দিনে বেদখল হয়ে গেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের অনেক জমি। অধিদপ্তরের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ইতিমধ্যেই দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে তাদের কয়েক হাজার একর জমি বেহাত হয়ে গেছে। কেবলমাত্র রাজধানীতেই বেহাত হওয়া সওজ সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য কমপক্ষে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া একই কারণে সারাদেশে বর্তমানে সড়কের প্রায় সত্তর হাজার একর ভূ-সম্পত্তি বেদখল হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে অধিগ্রহণকৃত এসব জমির নামজারি ও জমাভাগ যথাসময়ে না হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টরা ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন। বিদ্যমান আইন ও বিধি অনুযায়ী, সরকারি উদ্যোগে কোনো জমি অধিগ্রহণ করা হলে এ সম্পর্কিত গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলার ডিসি নিজ উদ্যোগে প্রত্যাশী সংস্থা বা ব্যক্তির অনুকূলে সেই জমির নামজারি ও জমাভাগের কাজটি সম্পন্ন করেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাত্র ৯০ দিনের সেই কাজটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ বছরেও নিষ্পন্ন হয়নি। এ ব্যাপারে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে অসংখ্যবার তাগিদ দেয়া হলেও ভূমি বিভাগের কর্মকর্তারা কোন উদ্যোগ নেননি। এ বিষয়ে জানতে ভূমি সচিব মোখলেসুর রহমানের দফতরে গেলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং সওজ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং রাস্তা সমপ্রসারণের প্রয়োজনে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী অতীতে বিভিন্ন সময় কমবেশি প্রায় ৮০ হাজার একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এরমধ্যে প্রায় ৭০ হাজার একর জমির নামজারি এবং জমাভাগ এখনো পর্যন্ত হয়নি। মূলত সে কারণেই এই বিপুল পরিমাণ সরকারি সম্পত্তি বেহাত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় বেশিরভাগ জমিই অধিগ্রহণ করা হয়েছে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে। এরপর বিগত অর্ধশতাব্দিতেও এসব জমির নামজারি জমাভাগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। এ অবস্থায় এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী জালিয়াতচক্র ও ভূমিদস্যু দলিল জালিয়াতির মাধ্যমে সড়কের সম্পত্তি নিজেদের নামে করে নিচ্ছেন। তিনি বলেন, কেবলমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই অন্তত পাঁচ হাজার কোটি টাকা মূল্যের সড়ক সম্পত্তি বেহাত হয়েছে। এর মধ্যে নগরীর জিগাতলা, কল্যাণপুর, দারুসসালাম ও গাবতলী এলাকায় সড়কের অনেক সম্পত্তি ব্যক্তি বিশেষের নামে নামজারি হয়েছে। এছাড়া মহাখালী, উত্তরা, টঙ্গি, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন, ডেমরা ও ফতুল্লায় বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি বেহাত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ইত্তেফাক প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের এমআইএস অ্যান্ড এস্টেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ফরিদুল আলম বলেন, বেহাত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা সম্পত্তির সুরক্ষার জন্য অবিলম্বে এগুলোর নামজারি জমাভাগ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসকে বারবার তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। এমনকি সড়কের বিভিন্ন সার্কেল ও ডিভিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীগণ ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেও এই ক্ষেত্রে কোনো সুফল পাননি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, এ ব্যাপারে অনুরোধ জানিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়কে চিঠিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় কোনো সাড়া দেয়নি। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে ‘বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে আনা হয়নি বলে’ মন্তব্য করেছেন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুয়াজ্জেম হোসাইন। ইত্তেফাককে তিনি বলেন, যে কাজ ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা, তা এতদিনেও শেষ না হওয়াটা অস্বাভাবিক। তবে যেহেতু এসব জমির মালিক এখন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সুতরাং তাদেরই দায়িত্ব ছিল প্রয়োজনীয় যোগাযোগের মাধ্যমে নামজারির কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করিয়ে নেয়া।