সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলা কথাসাহিত্যের ভিন্নমাত্রিক রূপকার
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৪০
“... জোড় কড়া নাড়লাম, পার্ক সার্কাসের একটি বাড়ির দরোজায়। বেড়িয়ে এলেন সৌম্যমূর্তি সুদর্শন দীর্ঘাঙ্গ এক যুবক ; গৌরবর্ণের সঙ্গে চোখের বুদ্ধিদীপ্ত শাণিত দৃষ্টি চোখে পড়ার মত। মনে পড়ে তাঁর হলদে ফ্রেমের চশমা, হাতে ধূমায়িত চায়ের কাপ, পরনে কলিক বা পেইসিল নকশা আঁকা বিদেশী রাত্রিবাসের ওপর বার্গান্ডি সুরার ঘন লাল রং এর ড্রেসিং গাউন” - [সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাসেম-এর স্মৃতিচারণ] - হ্যাঁ, এই তিনি , যিনি পুরোদস্তুর সাহেবিয়ানায় চলতেন কিন্তু তাঁর ভেতরটা ছিল পুরোমাত্রায় বাঙ্গালি। প্রবাসেও তাঁর কাছে শাক — শুক্তো চচ্চরি, আলু-বেগুন ভর্তার স্বাদ ছিল অমৃততূল্য। দেশীয় ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে লালন করেছেন যেমন; তেমনি বিশ্বের বহু দেশ ভ্রমণে বিচিত্র জীবনাভিজ্ঞতা অর্জন করে নিজেকে করেছেন ঋদ্ধ। ইনি হলেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। উদার নৈতিক চেতনা, বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাই তাঁকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন শুধু তাই নয় তাঁর জীবন হয়েছে সুন্দর, সার্থক ও কলুষমুক্ত।
তিনি ধার্মিক ছিলেন কিন্তু ধর্মান্ধ ছিলেন না। ধর্মান্ধতা এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। তাঁর ‘লালসালু’ এবং ‘একটি তুলসী গাছের কাহিনী’ - উত্কৃষ্ট প্রমাণ। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য, রাজনীতি, ধর্মতত্ত্ব, শিল্পতত্ত্ব, দর্শন, মনোবিজ্ঞান সহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্রেই বিচরণ করতে আনন্দ পেতেন। স্বল্পভাষী, অসামান্য মেধাবী এবং শাণিত বুদ্ধিসম্পন্ন এই ব্যক্তিত্বের খুব কাছাকাছি যাঁরা এসেছিলেন তাঁরা প্রায় সবাই একবাক্যে উচ্চারণ করেছেন : “তিনি ছিলেন এমন এক উন্নত মানসিকতার প্রতিনিধি যিনি হাল ঠিকানায় দুরন্ত প্রবাসী, স্থায়িত্বে স্বভূগোলী নিশ্চয়তা।” অর্থাত্ প্রবাসে থেকেও স্বদেশের নিকটতম স্বজন ছিলেন তিনি। স্বদেশের প্রতি আত্মিক টানেই মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো তাঁকে প্রবাসেও অস্থির করে তুলেছিল। তিনি প্রকাশ্যে এবং গোপনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে। চাকুরিসূত্রে বিশ্বের বহু দেশে ভ্রমণ করেছেন। এছাড়াও ভ্রমণ পিপাসু সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ যখন যেখানে ইচ্ছে বেড়াতে যেতেন। বিশেষত প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন সমূহ তাঁকে আকৃষ্ট করত। বিভিন্ন জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, তাদের নিয়তি, তাদের রাজনৈতিক-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে জানবার আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে পৃথিবীর পথে চলতে ব্যাকুল করে তোলে।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ ১৯২২ এর ১৫ আগস্ট চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকার এক উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। অসামান্য মেধাবী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ কুড়িগ্রাম হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক (১৯৩৯), ঢাকা কলেজ থেকে আই.এ (১৯৪১), ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। অর্থনীতিতে এম.এ পড়ার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর তাঁর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা এবং বেতারের বার্তা-সম্পাদনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু।
নয়াদিল্লি, সিডনি, জাকার্তা এবং লন্ডনে পাকিস্থান দূতাবাসের প্রেস অ্যাটাশে (১৯৫১ - ১৯৭১), ফার্স্ট সেক্রেটারি (১৯৬০- ১৯৬৭) এবং ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (১৯৬৭-১৯৭১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বাংলা কথাসাহিত্যের ভিন্নমাত্রিক রূপকার তিনি। গভীর জীবনবোধ, অন্তর্লোকের রহস্য উন্মোচনের স্পৃহা, সংস্কারমুক্ত এবং স্পষ্টভাষী উচ্চারণে তাঁর রচনাসমগ্র ঋদ্ধ। তাঁর ‘লালসালু’ ,‘চাঁদের অমাবস্যা’,‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাসগুলো বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যাঙ্গনে বিশেষ খ্যাতি এনে দিয়েছে। এছাড়া ছোটগল্প - নয়নচারা, দুইতীর। নাটক - বহিপীর, তরঙ্গভঙ্গ, সুড়ঙ্গ। তাঁর গল্পগুলো শব্দে আঁঁকা অনবদ্য ছবি। তাঁর সাহিত্যকর্ম বৈশ্বিক জীবনমথিত অভিজ্ঞান। অস্তিত্ববাদীদর্শন, অভিব্যক্তিবাদ, মনোবিকলন তত্ত্ব প্রভৃতি তাঁর চেতনায় এসেছে প্রাচ্য এবং প্রতিচ্যের বহুমাত্রিক জীবনাচরণের অভিজ্ঞতা থেকে। আজীবন নিরোগ মানুষটি ভেতরে ভেতরে নিজের এবং স্বদেশের বিপর্যয়ের কথা ভেবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। হঠাত্ করেই রক্তচাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ১৯৭১ এর ১০ অক্টোবর প্যারিসের বাসভবনে আনুমানিক রাত দশটায় তাঁর স্ট্রোক হয় এবং চিকিত্সার সুযোগ না দিয়েই তিনি সে রাতেই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে মুক্তিযুদ্ধের শহীদ সহযোদ্ধা বললে এতটুকুও অত্যুক্তি হবেনা।
তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য তাঁকে পি.ই.এন পুরস্কার (১৯৫৫), উপন্যাসে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬১), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৫), একুশে পদক (১৯৮৩ - মরণোত্তর) প্রভৃতি সম্মাননা প্রদান করা হয়।