গোলটেবিলে বক্তারা

‘নারী নির্যাতনকে না বলুন, স্লোগানটি হূদয়ে ধারণ করতে হবে’

আমরা মুখে যত আধুনিকতার কথা বলি, সংস্কৃতির কথা বলি কিংবা প্রগতিশীল সমাজের দাবি করি, তা কোন মূল্য রাখে না যদি প্রতিদিন খবরের কাগজে নারী নির্যাতনের খবর প্রকাশ পায়। একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে যে কোন মূল্যে নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। সেই উদ্দেশ্যে ব্যান্ড সঙ্গীতের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়েছে ইউএনএফপিএ। ২০১০ সাল হতে ‘ইউএনএফপিএ-বামবা ইয়ুথ কনসার্ট আয়োজন করছে। গত ৭ ডিসেম্বর খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে এই মেগা কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘নারীর প্রতি সহিংসতাকে না বলুন’ এই ক্যাম্পেইনের মিডিয়া পার্টনার দৈনিক ইত্তেফাকের পরিচালক তারিন হোসেনের সভাপতিত্বে ইত্তেফাক কার্যালয়ে কনসার্ট পরবর্তী এক গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয় ১৯ ডিসেম্বর। গোলটেবিল আলোচনার মূল অংশ নিয়ে আমাদের এই আয়োজন। অ ং শ গ্র হ ণ ক রে ন তারিন হোসেন, পরিচালক, দৈনিক ইত্তেফাক; আর্থার আরকেন, বাংলাদেশে ইউএনএফপিএ প্রতিনিধি; আসমা আক্তার, ইউএনএফপিএ’র জাতীয় প্রোগ্রাম অফিসার; আফসানা তাহের, ইউএনএফপিএ’র হেড অফ কমিউনিকেশন; তানভীর খান, ইউএনএফপিএ’র ইভেন্ট প্রধান; হামিন আহমেদ, বামবার সভাপতি; ফোয়াদ নাসের বাবু, সহ-সভাপতি; মাকসুদুল হক, সহ-সভাপতি; শেখ মনিরুল আলম টিপু, সাধারণ সম্পাদক; টিভি মিডিয়া পার্টনার চ্যানেল নাইনের পক্ষে কাজী শহীদুর রহমান ও রেডিও পার্টনার রেডিও ফূর্তির রিলেসন ম্যানেজার নাবিলা মাহবুব এবং দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিষ সৈকতসহ বামবার সদস্যরা। সঞ্চালন করেন দৈনিক ইত্তেফাকের বিনোদন প্রতিদিনের বিভাগীয় সম্পাদক তানভীর তারেক। এবার ১২টি ব্যান্ড নিয়ে হয়েছে এ কনসার্ট। এর মধ্যে রয়েছে নগরবাউল, ওয়ারফেজ, মাকসুদ ও ঢাকা, ফিডব্যাক, প্রমিথিউস, দলছুট, লালন, শিরোনামহীন, নেমেসিস, মেকানিং, বেদুইন এবং দৃক। তারিন হোসেন একজন নারী হয়ে দেশের নারীদের প্রতি প্রতিনিয়ত সহিংস আচরণ আমাকে কষ্ট দেয়। দৈনিক ইত্তেফাক সামাজিক কার্যক্রমের সাথে বরাবরই জড়িত। নারীর প্রতি সহিংস আচরণ রোধ এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় ইত্তেফাক সংবাদ, মহিলা অঙ্গন এবং পাক্ষিক অনন্যার মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। আমি মনে করি নারীর প্রতি সদয় হওয়ার বার্তা তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে ব্যান্ড সঙ্গীত সময়োপযোগী উদ্যোগ। এই উদ্যোগের সাথে সম্পৃক্ত হতে পেরে ইত্তেফাক এবং আমি নিজেও গর্বিত। --- আর্থার আরকেন প্রতিদিন আমরা খবরের কাগজে অসংখ্য নারীর সহিংসতার খবর পাই। কোথাও নারীদের শরীরে এসিড নিক্ষেপ হচ্ছে, কোথাও নারীরা আত্মহত্যা করছেন, কোথাও আবার শারীরিকভাবে নির্যাতন হচ্ছেন। অথচ আমরা এটাও জানি কোন সত্যিকারের পুরুষ কোন নারীর ওপর এমন সহিংস আচরণ করতে পারে না। এটা কোন দেশের সংস্কৃতিও নয়। আমরা ‘নারীর প্রতি সহিংসতাকে না বলুন’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে খুলনায় ৩য় বারের কনসার্টের সফল আয়োজন করেছি। আমরা যুব সমাজে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। ---- আফসানা তাহের তরুণদের সচেতন করতে পারলে ভবিষ্যতে নারীর প্রতি সহিংস আচরণ অনেক কমে যাবে, কারণ তারা নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারে, শিখতে পারে। একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময় পর আর পরিবর্তন হয় না। কিন্তু তরুণরা নতুনকে গ্রহণ করে। সেই উদ্দেশ্যেই বামবাকে এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে। কারণ তরুণদের কাছে ব্যান্ড সঙ্গীত যেমন জনপ্রিয় তেমনি এই শিল্পীরা তাদের রোল মডেল। তাই তাদের কথাকে তরুণরা বিশ্বাস করবে এবং মেনে নিবে। ---- হামিন আহমেদ বামবা সব সময় সামাজিক অপরাধরোধে ভূমিকা রাখে। যেহেতু গান তরুণ প্রজন্মের ক্রেইজ তাই গান নিয়েই নারীর পাশে বামবা সবসময় থাকবে। আমরা যখন সামাজিক দায় থেকে অনুষ্ঠান করি তখন এর জন্য অন্যরকম একটা উপলব্ধি থাকে আর নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করার বিষয়টি আমাদের সবাই মন থেকে চাওয়া তাই এ ক্ষেত্রে আমাদের উপস্থাপনেও আন্তরিকতা থাকে। আমরা অন্তর থেকে চাই নারীর প্রতি সকল সহিংসতা দূর হবে। ---- মাকসুদুল হক আমরা গানের কথায় বেশির ভাগ সময় নারীকে দোষী করি। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে গান লেখা বন্ধ করে নারীর প্রতি সহায়ক গান লিখতে হবে। এমন প্রোগ্রামের তেমন গান প্রচার করা হলে আরও বেশি তারা অনুপ্রাণিত হবে। তারা অনুভব করবে এটা অন্যায় আমরা তা করবো না। গানের কথায় সুরে যেমন যত্নশীল হতে হবে তেমন তাদের সাথে কনসার্টে যোগসূত্রটাও এমন হবে যেন তারা হূদয়ে ধারন করে এবং বাড়িতে গিয়ে অনুভব করে মা-বোনসহ সকলকেই সম্মান করতে হবে। ---- শেখ মনিরুল আলম টিপু এই কনসার্টের মাধ্যমে প্রান্তিক তরুণদেরও উত্সাহিত করা যাবে। কারণ যখন কোন বিভাগীয় শহরে এমন কনসার্ট হয় তখন গ্রামের পড়াশুনা জানা আদর্শ ছেলেরা তা দেখতে আসে। সে গ্রামে ফিরে অন্যদের মাঝেও এই স্লোগান ছড়িয়ে দিবে। কারন সেও গ্রামের অন্যান্য তরুণদের কাছে মডেল। এ ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়ে স্লোগানটি সর্বোস্তরে পৌছে যাবে। স্লোগানটি খুবই শক্তিশালী, আমাদের এমন আরও স্লোগান নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। --- ফোয়াদ নাসের বাবু আমি আরও একটু যোগ করতে চাই ইউএনএফপিএ’র সঙ্গে থেকে আমরা চেষ্টা করছি মিউজিকের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করতে। আমাদের এ চেষ্টা অব্যাহত থাকবে আগামীতেও। ---- আশিষ সৈকত গণমাধ্যম এখন অনেক বেশি প্রসারিত এবং তা আজ শক্তিশালী অবস্থান থেকে নানা আঙ্গিকে নারীর পাশে দাঁড়ায়। আমরা এখন ধর্ষিতার নাম, ছবি প্রকাশ করি না। যৌন হয়রানি বিষয়টি মিডিয়াতে খুব ভালোভাবে আলোচিত হয়েছে। ----- নাবিলা মাহবুব আমি নিজে কনসার্টে উপস্থিত ছিলাম এমন আগ্রহ ছিল তরুণদের মধ্যে, যা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। গান শোনার সাথে সাথে তারা যদি ম্যাসেজটা সাথে নিয়ে যায়, একজনকেও যদি সে সচেতন করে তাহলেই আমরা সার্থক। ---- আসমা আক্তার পরিবারিক সহিংসতা আজ গ্রামের পাশাপাশি শহরেও দেখা যায়। তাই আমরা আশা করি এই কনসার্টের মাধ্যমে তরুণদের সচেতন করতে পারবো, তারা বাসায় গিয়ে মা-বোন কারো সাথে রূঢ় আচরণ করবে না। ---- তারিন হোসেন এমন ব্যান্ড তারকাদের সাথে কথা বলে আমারই অনেক ভালো লাগছে। আমি আশা করি আমাদের তরুণরাও এই ম্যাসেজের সাথে একাত্ম হবেন। ফতোয়া, যৌন হয়রানি, যৌতুক প্রভৃতি সামাজিক অপরাধগুলো নারী সমাজ থেকে তুলে ফেলার জন্য এমন আয়োজন প্রয়োজন, যা তরুণদের প্রভাবিত করতে পারবে এবং সমাজে এর ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এখন অনেক রকম অপরাধ যেমন কমেছে তেমনি আবার অন্য রকম অনেক অপরাধ বেড়েছে। অনেক ঘরেই নারী সম্মান নিয়ে বসবাস করে পারছে না। ঘরে বাইরে সব ক্ষেত্রে নারীর প্রতি অসম্মানজনক আচরন হতে সমাজকে মুক্ত করতে তরুণরা এগিয়ে আসবে। আর ঘর থেকেই তরুণদের এই চর্চা করতে হবে। আমরা নারীর পারিবারিক সহিংসতাসহ সব রকমের বৈষম্য ও সহিংস আচরণ রোধে আগামীতে আবারও এক সাথে বসবো। সবাইকে এমন একটি প্রাণবন্ত আলোচনায় অংশ নেয়ার জন্য ধন্যবাদ। ছবি: সাইফুল ইসলাম ও দিপঙ্কর দীপু