অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার
সাহিত্যে নারীর জন্য অনন্য অনুপ্রেরণা
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৫৫
যারা এ পুরস্কার পেলেন
পাক্ষিক অনন্যা পত্রিকা বাংলা ১৪০১ সাল থেকে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রতিবছর একজন কৃতী সাহিত্যিক বা সাহিত্যগবেষককে এই পুরস্কার প্রদান করে আসছে। এর আগে এই পুরস্কার পেয়েছেন-সেলিনা হোসেন, রিজিয়া রহমান, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, দিলারা হাশেম, রাবেয়া খাতুন, ড. সন্জীদা খাতুন, জাহানারা ইমাম, নূরজাহান বেগম, রাজিয়া খান, রুবী রহমান, পূরবী বসু, আনোয়ারা সৈয়দ হক, মকবুলা মনজুর, ঝর্ণাদাস পুরকায়স্থ, সালেহা চৌধুরী, নূরজাহান বোস ও মালেকা বেগম।
বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য পাক্ষিক অনন্যা কবি কাজী রোজীকে এবছর ‘অনন্যা সাতিহ্য পুরস্কার-১৪১৯’ প্রদান করে। গত ১৯ ডিসেম্বর বুধবার বিকেলে শাহবাগের জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে এই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠিত হয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নারীর অবদান বিস্মিত হওয়ার মতো। পাশাপাশি বিশেষ করে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর নারী লেখকদের পরিচয় ও অবদান আছে। বাংলা সাহিত্যে নারীর ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। অনেক নারী লেখকের লেখা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাদের অনেকের উপস্থিতি উপেক্ষিত। বর্তমানকালে নারী সমাজের সম্মান, অধিকার ও লেখক হিসেবে প্রতিভার বিষয়টি সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করা হয়। রোকেয়া সাখাওয়াত্ হোসেন, এম ফাতেমা খানম, নুরন্নেচ্ছা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনী, সুফিয়া কামাল, জোবেদা খানম, নীলিমা ইব্রাহিম, দৌলতননেছা খাতুন, রাবেয়া খাতুন প্রমুখ মুসলিম নারী কথা সাহিত্যিকের সাহিত্যে বিশেষ ভূমিকা আছে। তাদের লেখালেখিকে উত্সাহিত করার জন্য একটা সময় পত্রিকায় সাপ্তাহিক একটি নারী পাতা বের করতে শুরু করে। সেই পাতার গন্ডি পেরিয়ে নারীরা নারী লেখক নয় শুধুই লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার স্বপ্ন দেখেতে শুরু করে। লেখার চর্চায় নারী সাহিত্য বলে আলাদা করার রেওয়াজ ভেঙ্গে আজ আমরা সেলিনা হোসেনের মতো শক্তিশালী সাহিত্যিক পেয়েছি।
সৈয়দ শামসুল হকঃ অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার এদেশের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য পুরস্কারগুলোর একটি। দীর্ঘদিন ধরে এ পুরস্কারটি তার মর্যাদা ধরে রাখতে পেরেছে।
কবি বেলাল চৌধুরীঃ কবি-সাহিত্যিককে সম্মাননা দেয়া পাক্ষিক অনন্যার একটি বড় উদ্যোগ। নারীর সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতির জন্য এ পুরস্কার একটি বড় পৃষ্ঠপোষকতা। আমাদের সমাজে নারীর কাজকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়। সেই তাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে যে নারী এগিয়ে এসে নিজের কাজকে তুলে ধরেন তাকে সম্মান জানানো উচিত। সমাজের সামনে কৃতী নারী ব্যক্তিত্বদের তুলে ধরে, সম্মানিত করে পাক্ষিক অনন্যা সেই কাজটিই করছে। অনন্যার এই উদ্যোগ সমাজে নারীর অগ্রযাত্রায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। আশা করি অনন্যা এ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে।
কবি রুবী রহমানঃ অনন্যার এই পুরস্কার দেশের নারীদের মাঝে ভালো কাজের উদ্দীপনা জোগায়। নারীর বিষয় এগিয়ে আসা আরও বেশি করে প্রয়োজন।
কাজী রোজীঃ এই পুরস্কার পেয়ে আমি আপ্লুত। এই আনন্দঘন পরিবেশ আমাকে নিয়ে, আমাকে ঘিরে— আমার এই আনন্দের রঙ সবার মাঝে ছড়িয়ে দিলাম। মনে হচ্ছে এই পুরস্কার আমাকে নগণ্য থেকে অসাধারণ, অনন্য করে তুলেছে। সাহিত্যে নারীর জন্য অনন্য অনুপ্রেরণা।
অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন
শুধুমাত্র ঘর-সংসারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, নিজে কিছু করার উদ্দেশ্যেই যিনি ‘অনন্যা’ প্রকাশ করেছেন তিনি অনন্যা সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। শুরু থেকে ‘অনন্যা’র চিন্তা ছিল নারীর পাশে দাঁড়ানো, নারীর কথা বলা, নারীর একটি প্ল্যাটফর্ম হওয়া। ‘অনন্যা’ ২৬ বছরের পথপরিক্রমায় নারীর জন্য স্বতন্ত্র একটি অবস্থান তৈরি করেছে। আর এই দীর্ঘ পথচলায় ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে স্বনামেই অনন্যা সম্পাদকও সমাজকর্মী হিসেবে নিজের অবস্থান করে নিয়েছেন দৃঢ়ভাবে। নারী আন্দোলনসহ সামাজিক নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা ও আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন। ‘অনন্যা’ সাহিত্য পুরস্কার নিয়ে তিনি বলেন, সাহিত্যে নারীর বিচরণ বড় ধীরলয়ে। একজন সেলিনা হোসেনের সমকক্ষ আরও একজনকে খুঁজে পাওয়া দায়। অথচ নানা পথ, মত আর ধরন নিয়ে পুরুষ সাহিত্যিকরা নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন প্রতিনিয়তই। সাহিত্যে নারীর এই শূন্যতাকে পূরণ করার লক্ষ্যে এবং লেখালেখিতে নারীকে উত্সাহ দেয়ার জন্যই ১৪০১ সাল থেকে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার দেয়া শুরু হয়। আমরা চেয়েছিলাম নতুনদের অনুপ্রাণিত করতে। কিন্তু লেখালেখিতে তাদের ভূমিকা তেমন করে প্রকাশ না পাওয়ায় আমরা প্রতিশ্রুতিশীল সাহিত্যিক খুঁজতে শুরু করলাম। ১৪০১ সালে অনন্যার প্রথম পুরস্কার পেলেন সেলিনা হোসেন। যার সাহিত্যকর্ম দেশের গন্ডি পেরিয়েছে। রিজিয়া রহমান, রাজিয়া খান আমিন, নীলিমা ইব্রাহীম প্রমুখকে আমরা সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নির্বাচিত করেছি। এদের মধ্যে কাউকে মানুষ ভুলে গিয়েছিলেন। অনন্যা তাদের মনে করিয়ে দিয়েছে। তারা আবার লেখা নিয়ে পাঠকের সামনে এসেছে। এদিক বিবেচনা করলে একটা ভূমিকাতো রাখছে অনন্যা। আবার নিজের জীবনী অসীম সাহসিকতার মাধ্যমে তুলে ধরার জন্য একটা বই-এর লেখক (আগুন মুখোর: মেয়ের জন্য) নূরজাহান বোসকে নির্বাচিত করেছি। তারপর ছায়ানট আন্দোলন ও রবীন্দ্র গবেষণার জন্য সন্জীদা খাতুন এবং নারী আন্দোলনের ইতিহাস ও নারী নির্যাতন নিয়ে গবেষণার জন্য মালেকা বেগম, কবিতার জন্য রুবি রহমান এবং এ বছর কাজী রোজীকে নির্বাচিত করেছি। পুরোনদের মধ্যে রাবেয়া খাতুন, মকবুলা মঞ্জুর, ঝর্ণা দাস পুরকায়স্থর ন্যায় লেখক আমাদের সে দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচিত। আমরা তাদের সাথেই জড়াতে চাই, যারা সত্যিকার অর্থে কাজটা করেন। আমাদের মনোনীতদের কাজ নিয়ে দেশের খ্যাতনামা সাহিত্যিকদের সাথে আলোচনা করি। সব মিলিয়ে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার একটা স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধতার জায়গায় থেকে নারী লেখককে সামনে এনে, তাদের ভূমিকা দিয়ে আমাদের সাহিত্য সমৃদ্ধ করতে চাই। আমাদের দেয়া ক্রেস্ট ও বর্তমান বাজার অবস্থায় ৫০ হাজার টাকা সামান্যই। কিন্তু স্বপ্নটা অনেক বড় জায়গা থেকে, প্রতিশ্রুতিশীল নারীর লেখনীতে সমৃদ্ধ হবে সাহিত্য।