কন্যাশিশুর সৌকুমার্য মায়ের সাহচর্য
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৫৫
মা এবং কন্যাসন্তান— দুই প্রজন্ম, দুই নারী। একজনের ছায়ায় অন্যজনের বেড়ে ওঠা। এ সম্পর্ক যুগপত্ ভালবাসা এবং দায়িত্বের। মা যদি সন্তানের বন্ধু হয়ে তাকে এগিয়ে নিয়ে যান, তবে এই সন্তান পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে সাফল্যময় জীবনের দিকে এগোতে পারে। এ বিষয়ে লিখেছেন— অলভী সরকার
১.
সদাব্যস্ত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নাসরিন আরা। তার দুই সন্তান— অলকা ও অন্বেষা। অলকা ষষ্ঠ আর অন্বেষা দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ে। নাসরিন আরা দাপ্তরিক কাজের প্রতি দায়িত্বশীল; তাই তাকে কর্মব্যস্ততায় পার করতে হয় সারাদিন। এজন্য মেয়েদের সঙ্গে খুব বেশি সময় কাটাতে পারেন না। কিন্তু একজন মা হিসেবে তিনি সবসময় অনুভব করেন কন্যাদের প্রতি তার দায়িত্বকে। কন্যা সন্তানের জন্য মায়েদের সঙ্গ বেশি দরকার। তাই তিনি কেবল জননী হয়ে নয়, একজন বন্ধু হয়ে তার কন্যাদের প্রতি দায়িত্বশীল থাকেন। মেধা এবং সচেতনতা দিয়ে তার মেয়েদের প্রতি সঠিক কর্তব্য পালনে মনোযোগী থাকেন। সদ্য কৈশোরে পা দেয়া অলকাকে বিশেষ মনোযোগের সাথে সঙ্গ দেন তিনি। কারণ মেয়েদের এই বয়সটিই পরিণত হয়ে ওঠার সবচেয়ে নাজুক সময়। শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক বেদনার দিকেও সমান দৃষ্টি তার। এ বয়সের একটি মেয়ে যে বহুবিধ সামাজিক সংকটের মুখোমুখি হয়, তার যথার্থ সমাধান একজন মা ছাড়া আর কে করতে পারে? নাসরিন আরা তাই রীতিমতো নিয়মনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সন্তানদের সময় দেন। মেয়েদের সমস্যা বোঝার জন্য তিনি যেন হয়ে ওঠেন মনস্তাত্ত্বিক। এমনকী, প্রয়োজনে তিনি শিশু-মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে পড়াশোনা করেন। ছোট মেয়ে অন্বেষাকে তিনি তার বয়স এবং বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গড়ে তোলার ব্যাপারে সচেতন থাকেন। লেখাপড়ার সাথে সাথে তিনি মেয়েদের গান-নাচ-ছবি আঁঁকায় উত্সাহ দেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, শিশুকে মুক্ত জীবনে গড়ে তুলতে হয়। এতে তারা ভবিষ্যতে নিজেদের সঠিক পথটি বেছে নেয় আত্মপ্রত্যয়ের সাথে।
২.
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আল্পনা মজুমদার, গৃহিণী এবং দুই সন্তানের জননী। বড় মেয়ে তিথি উচ্চ বিদ্যালয়ে পা দিলেও শিশুর সারল্য তার কথা-চলন-কাজে। ফলে তাকে ঘিরে মায়ের ভয় প্রতিনিয়তই। প্রতিকূল এই সমাজে, যেখানে একজন নারীর লড়াই কখনো থেমে যাবে না, সেখানে কী করে উপযুক্ত হয়ে উঠবে তার মেয়ে? কেমন করে নিজের সরল মনটা নিয়ে ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে? লেখাপড়া ও অর্থনৈতিক মুক্তি যেমন অত্যাবশ্যক, তেমনি ব্যক্তিত্বময় মানসিক গঠনও জরুরি। মা তাই শঙ্কিত হন। একজন নারী হয়ে চিন্তিত হন, ভবিষ্যত্ নারীর কল্পনায়। তাই তিনি বন্ধুত্বের আগ্রহ নিয়ে তাকান। গুরুজনসুলভ শাসন বজায় রেখে মেয়ের সাথে মানসিক দূরত্ব ঘোচানোর চেষ্টা করেন। কেননা, আজকের তার কন্যাশিশু আগামীতে পরিপূর্ণ নারী হয়ে উঠবে, তার মানসিক গঠনের প্রতি অবিসংবাদিত দায় বোধ করেন তিনি।
নাসরিন আরা কিংবা আল্পনা মজুমদারের মতো প্রায় প্রতিটি মা-ই তার কন্যাসন্তানকে নিয়ে বিশেষভাবে ভাবেন। তবে এই ভাবনার পথে কেউ সঠিক আলোর দেখা পান, কেউ পান না। কেউ কেউ সন্তানের বন্ধু হয়ে উঠতে পারেন, কেউ আবার গাম্ভীর্যের আড়ালে বন্ধুত্বসুলভ নৈকট্য হারিয়ে ফেলেন। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে হালকা বলে মনে করেন এবং ভাবেন যে, এত হয়তো শাসনের গুরুত্ব হ্রাস পাবে। কিন্তু সন্তান বিশেষ করে কন্যাসন্তানের সাথে মায়ের মানসিক দূরত্ব থাকলে এটি তার পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। মায়ের সাথে বন্ধুত্ব কেবল জননীর সাথে সন্তানের সম্পর্ক নয়; এটি দুই প্রজন্মের এবং দুইজন নারীর সেতুবন্ধন। একজন কন্যাশিশু শৈশব থেকে কৈশোরের দিকে যত এগিয়ে যায় মায়ের সাথে তার মানসিক নিকটবর্তিতা ততই অনিবার্য হয়ে ওঠে। বড় হওয়ার সাথে সাথে একটি মেয়ের জৈবিক এবং সামাজিক দ্বিবিধ সংকটের মুখোমুখি হয়। অস্তিত্ব গঠনের এই ক্রান্তিকালে এমন কাউকে তার প্রয়োজন হয়, যে অকৃত্রিম স্নেহ এবং সঠিক দায়িত্ব নিয়ে তার সহচরী হবে। আর এক্ষেত্রে, একজন মেয়ের উপযুক্ত বন্ধু তার মা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। কারণ, মা কেবল বুদ্ধি দিয়ে নয় বরং হূদয় দিয়ে সন্তানের সমস্যাকে উপলব্ধি করে নিঃস্বার্থভাবে তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। উপরন্তু মায়ের সাথে সন্তানের প্রকৃতিজাত মেলবন্ধন ইতিবাচক পথের দিকে নিয়ে যায় এবং কন্যা ক্রমশ নারী হয়ে ওঠার সঠিক পথের সন্ধান পায়।