আজও কেন বীরাঙ্গনাদের হাহাকার

‘আজ নেই বর্গী, নেই ইংরেজ, নেই পাকিস্তানী হানাদার, আজও তবু আমার বুকে কেন শূন্যতা আর হাহাকার।’ ‘হায়দার হোসেনের’ গানের এই কথাগুলোর মতো আজও শুধুই হাহাকার আর আতঙ্ক নিয়ে জীবনযাপন করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের বীরাঙ্গনারা। স্বাধীনতার একচল্লিশ বছর পরও জেলার বীরাঙ্গনারা স্থানীয় প্রভাবশালী আর মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের রোষের শিকার হচ্ছেন। সরকারি কোনো প্রকার সাহায্য বা নিরাপত্তা ছাড়াই স্বাধীনতা পরবর্তী ৪১ বছর ধরে চলছে তাদের অভাব-অনটনের সংসার। ভিক্ষা করে জীবন চালাচ্ছেন অনেকে। সেই সঙ্গে রয়েছে অপমান আর লাঞ্ছনা। জেলার রানীশংকৈল উপজেলার দূর গ্রামে পড়ে থাকা এই বীর নারীদের সহযোগিতায় আজও যেমন এগিয়ে আসেনি কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান তেমনি এগিয়ে আসেনি বেসরকারি কোনো সংগঠনও। একাত্তরের মার্চে সেনারা ঢুকে পড়ে রানীশংকৈল উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে। নির্বিচারে করেছে হত্যা লুট আর ধর্ষণ। একচল্লিশ বছর আগে রানীশংকৈলে পাকবাহিনীর এ বর্বরতার ঘটনা স্থান করে নিয়েছিল বিশ্ব গণমাধ্যমেও। সে সময় রাজাকাররা উপজেলার দোশিয়া নয়াবস্তি গ্রামের ৪ বোন বুধি, মোখলেছা, মালেকা ও আমেনাকে তুলে দিয়েছিল পাক হানাদারদের হাতে। একটানা ৯ মাস তাদের ওপর পাশবিক নির্যাতন করেছে পাকবাহিনী। পাকবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে কৌশলে অনেক বাঙালির জীবন এবং নারীর সম্ভ্রম বাঁচিয়েছেন তারা। চার বোনের একজন মোখলেছা। ভিক্ষে করে চলছে তার সংসার। নিজের কোনো থাকার জায়গা না থাকায় থাকছেন উপজেলার তত্কালীন জমিদার টংকনাথের পুরাতন ভাঙ্গাচোরা ভবনের এক কোণে। ৭১‘ এ যুদ্ধ চলাকালীন পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন পাকবাহিনীর হাতে আর আজ ৪১ বছর পরও নির্যাতিত হচ্ছেন সমাজের কাছে। জীবনের শেষ বেলায় তার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। চান শুধু সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মান। মোখলেছা ও তার বোনদের জীবনের আনন্দ কেড়ে নিয়েছে যারা, সেই রাজাকাররা আজও সমাজে দাবিয়ে বেড়াচ্ছে। বীরাঙ্গনা মোখলেছা ভয়াল সেই দিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেন, ‘দেশের জন্য ইজ্জত দিয়েছি, অনেকের জীবন বাঁচিয়েছি। কিন্তু তার বিনিময়ে সমাজ আজও দিয়ে যাচ্ছে কলঙ্কের গ্লানি।’ পাকসেনাদের হাতে বেঁচে যাওয়া সুনীল বর্মন ওরফে টেপসু বর্মন মোখলেছা ও বুধীর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেন, ‘তাদের দু‘বোনের কৌশলের কারণে আমি প্রাণে রক্ষা পেয়েছি।’ পাশের গ্রাম নিয়নপুর। বীরাঙ্গনা মোখলেছার বোন মালেকা। তার অবস্থা আরও করুণ। উপজেলার গোগর গ্রামে রমেসার যুদ্ধের ডামাডোলের সময় বিয়ে হয়েছিল। বাপের বাড়িতে নাইওর খেতে এসে পাকসেনাদের লালসার শিকার হন তিনি। স্বামী-সংসার হারিয়ে নীড়হারা পাখির মতো আজও ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। তাদের মতো ফাড়াবাড়ি গ্রামের হাসিনা, পকুম্বা গ্রামের নূরজাহান, নিয়নপুরের হাসিনা, উত্তগাঁও গ্রামের হুলফুলি, রাউথনগর গ্রামের রেবেকা, বলবানু, নিহার রানী দাস, জবেদা, আশ্বির্না বেগম ও রায়পুর গ্রামের রাবেয়া বেগমসহ এই উপজেলার বহু নারী আজও জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। রানীশংকৈল মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইউনিট কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম জানান, ‘এই এলাকায় অনেক বীরাঙ্গনা রয়েছে। এ পর্যন্ত ৩৫ বীরাঙ্গনার তালিকা করা হয়েছে। এরা সমাজে অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার।’ ‘এদের মধ্যে ১১ নারীকে গেল বছর বিজয় ও স্বাধীনতা দিবসে সম্মাননা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।’ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এনামুল হক বলেন, ‘তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের জন্য যাচাই বাছাই করে তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’