পথচারী বিশ্বজিত্ হত্যাকারী ‘দানবদের’ শক্তির নেপথ্যে

দর্জি দোকানী পথচারী বিশ্বজিত্ দাস খুনে অংশগ্রহণকারীরা একদিনে দানবে পরিণত হয়নি। পুরনো ঢাকার বাসিন্দা বিশেষ করে ব্যবসায়ীদের কাছে এরা গত চার বছর ধরে ক্যাডার ও চাঁদাবাজ হিসেবে পরিচিত। এ চক্রের রফিকুল ইসলাম শাকিল, জিএম রাশেদুজ্জামান শাওন, মাহফুজুর রহমান নাহিদ, সাইফুল ইসলাম, কামরুল ইসলাম কিবরিয়া, নুরে আলম লিমন, ইমদাদুল হক, সুমন, রাজন, ওবায়দুল কাদেরসহ অন্যরা ছাত্রলীগের এক প্রভাবশালী নেতার আশীর্বাদেই শক্তিধরে পরিণত হয়। আর এ কারণেই ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার হলেও এ নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা ছিল না। কথাগুলো পুরনো ঢাকার ইসলামপুরের এক ব্যবসায়ীর। যিনি কয়েক দফায় এসব ছাত্রলীগ ক্যাডারদের মোটা অংকের চাঁদা দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক ঐ ছাত্রলীগ নেতা নবাবপুর এলাকার বাসিন্দা। তার নামের আদ্যক্ষর ‘ম’। এক সময় তিনি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। এখনও কোন পথে না থাকলেও তিনি তার ভিজিটিং কার্ডে ব্যবহার করেন ছাত্রলীগ নেতা ( ভাইস প্রেসিডেন্ট) । তার বাবা নবাবপুর এলাকার একটি মার্কেটের সভাপতি। চাঁদাবাজিসহ তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। তার ছোট ভাই একটি হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি। বর্তমানে কারাগারে । ২০০৪ সালে র্যাবের ক্রসফায়ার শুরু করলে তিনি ( ঐ ছাত্রলীগ নেতা) দেশত্যাগ করে ভারতে যান। দেশে ফেরেন মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই। এলাকার আধিপত্য ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ সন্ধানী ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী। আর তার ঐ ছাত্রলীগ নেতাদের শেল্টার দেন সরকার দলীয় এক প্রভাবশালী নেতা। তিনিও এক সময় ছাত্রলীগের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। নবাবপুরের অপর একজন ব্যবসায়ী বলেন, গত চার বছর ধরে ছাত্রলীগের শেল্টারে সন্ত্রাসীরা পুরনো ঢাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তারা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে যেমন চাঁদা আদায় করতো তেমনি মালভর্তি ট্রাক আটক করেও আদায় করতো মোটা অংকের টাকা। এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় থানা পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের কাছে বিচার চেয়েও প্রতিকার পায়নি। এদের সঙ্গে সুত্রাপুর, কোতয়ালী থানা পুলিশের সঙ্গে রয়েছে গভীর সম্পর্ক। বিরোধী দলের ডাকা হরতালের দিন এসব ক্যাডারই নিজেদের ক্ষমতা দেখানোর জন্য এরা আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি, লোহাররড, রামদা হাতে নিয়ে মিছিল করে। পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে এ দৃশ্য রিতিমত উপভোগই করেছে। আর শেষ পরিণতি বিশ্বজিত্ দাসকে হত্যা। তিনি আরও বলেন, বিশ্বজিত্ হত্যাকারীদের কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে। কিন্তু এই হত্যাকারীদের দানবে পরিণতকারী ছাত্রলীগ নেতা এখনও এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনি চেষ্টা করছে মামলা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার। এমনকি সুত্রাপুর থানায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারে কোন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়নি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী জানান, চাপাতি নিয়ে বিভিন্ন সময় সংবাদের শিরোনাম হয়েছে চাপাতি শাকিল। তখনও কেউ বলেনি শাকিল ছাত্রলীগের নয়। অথবা তাকে পুলিশের ধরিয়ে দেবার তাগিদও কেউ অনুভব করেনি। গত ৯ ডিসেম্বর রবিবার সকাল নয়টার দিকে ১৮ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধের সময় ঢাকা জজকোর্ট এলাকা থেকে বিএনপি-জামায়াত-সমর্থিত আইনজীবীরা একটি মিছিল বের করে। তাদের ধাওয়া করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এর কয়েকমিনিট পরই ভিক্টোরিয়া পার্ক সংলগ্ন একটি তেলের পাম্পের কাছে দু’টি ও শাঁখারীবাজারের দিকে একটি ককটেলের বিস্ফোরণ বিস্ফোরিত হয় । এ সময় বিশ্বজিত্ দাস হূষীকেশ দাস লেনের বাসা থেকে শাঁখারীবাজারে নিজের দর্জি দোকানে যাচ্ছিলেন। ককটেল বিস্ফোরণের সময় আরও অনেকের সঙ্গে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পেট্রোলপাম্প সংলগ্ন একটি মার্কেটের দোতলায় অবস্থিত ইনটেনসিভ ডেন্টাল কেয়ার নামের বেসরকারি ক্লিনিকে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করেন বিশ্বজিত্ । এসময় সেখানেই কয়েক দফায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা চাপাতি ও লোহার রড দিয়ে তার উপর হামলা চালায়। পরে মিডফোর্ট হাসপাতালে ভর্তির পর বিশ্বজিত্ মারা যান। এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে সাবেক ও বর্তমান নয় ছাত্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সাবেক শিক্ষার্থী মো. মাহফুজুর রহমান নাহিদ ও মো. ইমদাদুল হকের সনদ বাতিলের পাশাপাশি মো. রফিকুল ইসলাম শাকিল, মীর মো. নূরে আলম, মো. ওবাইদুল কাদের, কাইয়ুম মিয়া টিপু, রাজন তালুকদার, সাইফুল ইসলাম ও জিএম রাশেদুজ্জামান শাওনকে বহিষ্কার করে।