আমানত সংগ্রহে মরিয়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:৩৩
জহিরুল ইসলাম রাজধানীতে একটি ছোটখাটো নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মালিক। কয়েকটি ব্যাংকে তার চলতি হিসাব (কারেন্ট একাউন্ট) রয়েছে। লেনদেনও বেশ ভালো। রবিবার সকালে তার ঘুম ভাঙ্গল এক বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তার ফোনে। অপর প্রান্ত থেকে নিজের পরিচয় দিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা বললেন, স্যার আমাদের শাখায় কিছু আমানত রাখেন। ভালো মুনাফা দেবো। জহিরুল ইসলাম জানতে চাইলেন, আপনাদের এফডিআর-এর সুদের হার কত? অপর প্রান্ত থেকে ব্যাংক কর্মকর্তা বললেন, এটা টাকার অংকের ওপর নির্ভর করবে। কথায় কথায় ওই ব্যাংক কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামকে এফডিআর এর জন্য ১৩ শতাংশ মুনাফা অফার করলেন। শুধু রবিবার নয়, জহিরুল ইসলাম জানালেন, প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিনটি ফোন তার কাছে আসছে, শুধু আমানত রাখার জন্য।
রাজধানীর একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখায় উচ্চপদে কাজ করেন উম্মে সালমা। তার সাথে আলাপকালে তিনি জানান, বছর সমাপনী উপলক্ষে তাকে একটি টার্গেট ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। ৩০ ডিসেম্বরের আগে অন্তত: পাঁচ কোটি টাকা ডিপোজিট আনতে পারলে পদোন্নতি নিশ্চিত। এভাবেই আমানত সংগ্রহে নেমেছে বেসকারি ব্যাংকগুলো। আমানত সংগ্রহের জন্য তারা কোন নিয়ম-কানুন মানছে না। ব্যাংকিং খাতে যাতে বিশৃংখলা না হয় সে জন্য ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ শতাংশের ওপর সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ না করার বিষয়ে একমত হয়েছিল। কিন্তু কিছু কিছু ব্যাংক এ নিয়ম না মেনে রীতিমতো প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা বলেছেন, আমানতের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো সুদের হার বেশি দেয়ায় ঋণের সুদের হারও বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্পখাতে। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে অনেকেই শিল্প চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা জানান, কি হারে ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহ করতে পারবে সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোন নীতিমালা নেই। আর এর সুযোগ নিচ্ছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো। তবে উচ্চহারে সুদ নিলেও ব্যাংকগুলো প্রতিমাসে যে প্রতিবেদন তৈরি করে, তাতে সুদের আসল হার উল্লেখ করা হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহে সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ শতাংশ সুদের কথা উল্লেখ করেছে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ বিষয়ে ইত্তেফাককে বলেন, আমানতের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সুদের হার বেশি দেয়ার প্রবণতা অনেক আগেই শুরু হয়েছিলো। মাঝে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোরাল পারসুয়েশনের কারণে সুদের হার নেমে আসে। তবে কোন ব্যাংক যদি আমানতে বেশি সুদ দেয়, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের করার কিছু নেই। কারণ বাজার অর্থনীতিতে সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এখন অধিকাংশ ব্যাংকে তারল্য সংকট নেই। যে কয়েকটিতে তারল্য সংকট আছে তারা বেশি সুদে আমানত নিয়ে থাকতে পারে।
এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে দেখা যায়, দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই সাড়ে ১২ শতাংশ হার সুদে আমানত সংগ্রহ করছে। সুদের হার বেশি দেয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। বিদেশি ব্যাংকের শাখাগুলোও এ কাজে পিছিয়ে নেই।
ব্যাংকিং খাতের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত মেয়াদি আমানতের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত সুদ দিচ্ছে। তিনবছর বা তার বেশি সময়ের জন্য যারা আমানত রাখবেন তাদেরকে টাকার অংক অনুযায়ী ১৩ শতাংশেরও বেশি সুদ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর চারটির মধ্যে তিনটি ব্যাংকই দুই বছরের বেশি কিন্তু তিনবছরের কম মেয়াদের আমানতের জন্য সাড়ে ১২ শতাংশ সুদ অফার করছে।
এদিকে, ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত সুদে আমানত নেয়ার প্রভাব পড়ছে ঋণের বাজারে। একমাত্র কৃষিঋণ ছাড়া বাকিগুলো যেমন-মেয়াদি ঋণ, চলতি মূলধন ঋণ, এক্সপোর্ট ক্রেডিট, হাউজিং ঋণ, কনজ্যুমার ঋণ, ক্রেডিট কার্ড প্রভৃতি খাতে ব্যাংকগুলোর সুদের হার চড়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা যায়, বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংক মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুদের হার ধরেছে সাড়ে ১৯ শতাংশ। এছাড়া এ খাতে অধিকাংশ ব্যাংকের সুদের হার ১৬ শতাংশের ওপরে। কারখানার উত্পাদন সচল রাখতে ব্যাংকগুলো যে চলতি মূলধন সরবরাহ করছে তার সুদও অনেক চড়া। কেন্দ ীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী একটি বেসরকারি বাণিজ্যক ব্যাংক চলতি মূলধন সরবরাহের ক্ষেত্রে সাড়ে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিয়েছে। গৃহঋণের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এ খাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সর্বোচ্চ সুদের হার সাড়ে ১৮ শতাংশ। ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে অবস্থা আরো ভয়াবহ। এ খাতে কোন কোন ব্যাংক সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নেয়।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ঋণের সুদের হারের বিষয়ে বলেন, ব্যাংক মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা লাভের প্রবণতার কারণে সুদের হারে লাগাম দেয়া যাচ্ছে না। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে অনেকে শিল্প-কারখানাসহ ব্যবসা-বাণিজ্য চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।