কক্সবাজারের দু’টি বধ্যভূমি নিশ্চিহ্ন, অপরটি অস্তিত্ব সংকটে

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে খুন হওয়া ব্যক্তিদের লাশ শহরের ৩টি গণকবরে পুঁতে ফেলা হত। সংরক্ষণের অভাবে দু’টি বধ্যভূমিই ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে বিভিন্ন স্থাপনার নিচে। বিমানবন্দর সমপ্রসারণ প্রকল্প এলাকার আওতায় পড়ে অপরটিও পড়েছে অস্তিত্ব সংকটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর কক্সবাজারের প্রশাসনও স্বাধীনতার পক্ষে পরিচালিত হচ্ছিল। কিন্তু মে মাসে পাক আর্মি আসার পর থেকে পাল্টে যায় পরিস্থিতি। শুরু হয় গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনসহ মানবতাবিরোধী নৃশংসতা। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিমান হামলায় টিকতে না পেরে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত চলে পাকবাহিনীর এই নৃশংসতা। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড জেলা ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, কক্সবাজারে পাকবাহিনীর প্রধান ক্যাম্প ছিল শহরের পশ্চিম বাহারছড়াস্থ বর্তমান ইসিবি কার্যালয়। বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও সন্দেহভাজন লোকজনকে ধরে এনে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা হত এখানে। আর এর পশ্চিম পাশে সমুদ্র সৈকতের বালুতটে গণকবরে পুঁতে ফেলা হত হতভাগাদের লাশ। পাকবাহিনী কক্সবাজার থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর ওই স্থান থেকে অসংখ্য মৃত মানুষের মাথার খুলি ও হাড়গোড় উদ্ধার হয়। মুক্তিযুদ্ধকালের বিভিন্ন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী, কক্সবাজার শহরের নুনিয়াচড়ার বাসিন্দা ও বনবিভাগের সাবেক প্রধান সহকারী আলহাজ্ব নুরুল হক (৭৫) জানান, একাত্তরের মে মাসে পাকিস্তানী বাহিনী কক্সবাজারে বিভিন্ন ক্যাম্প গড়ে তুলে গণহত্যা, লুটপাট ও নির্যাতন শুরু করে। এসব ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের লাশ দাফন-কাফন ছাড়াই গণকবরে পুঁতে ফেলা হত। শহরে ছিল ৩টি প্রধান গণকবর বা বধ্যভূমি। এরমধ্যে একটি ছিল বর্তমান ইসিবি কার্যালয়ের পাশে, আরেকটি ফদনার ডেইলে এবং অপরটি এয়ারপোর্টের উত্তরপাশে, উত্তর নুনিয়াচড়াস্থ ঠুইট্টাচর নামক স্থানে অবস্থিত। এসব বধ্যভূমিতে বনবিভাগের বিভিন্ন স্টাফের মধ্যে বনপ্রহরী বরিশালের আবদুস ছত্তারের লাশও রয়েছে। যাদেরকে পাকবাহিনী মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার জন্য হত্যা করে। তিনি জানান, তখনকার মহকুমা প্রশাসক বা এসডিও গণহত্যায় জড়িত ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তার কোন বিচার হয়নি। সূত্র জানায়, কক্সবাজার শহরে কামাল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে জয়বাংলা বাহিনী এবং টেকনাফ থেকে বান্দরবান পর্যন্ত ক্যাপ্টেন আবদুস সোবহানের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এসময় মেজর জিয়া (পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি) এবং মেজর মীর শওকত আলীও কক্সবাজারে যুদ্ধ করতে এসেছিলেন। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংও দিয়েছিলেন। কক্সবাজারের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মনছুর আলী জানান, পাকসেনাদের গণহত্যা ও নির্যাতন চলার একপর্যায়ে মীর শওকত আলীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা পানেরছড়া নামক স্থানে ১৩ জন পাকসেনাকে হত্যা করে নিরীহ লোকজন ও মুক্তিযোদ্ধা হত্যার প্রতিশোধ নেয়। জয়বাংলা বাহিনী প্রধান কামাল হোসেন চৌধুরী জানান, নিরীহ বাঙালীদের হত্যা করে পাকিস্তানীরা যেসব গণকবরে পুঁতে ফেলত, তার মধ্যে শহরে প্রধানত ৩টি এবং টেকনাফ ও চকরিয়াতে একটি করে গণকবর রয়েছে। তবে এর বাইরেও আরো গণকবর থাকতে পারে বলে জানান তিনি। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধকালের সাক্ষী কক্সবাজার শহরের ৩টি বধ্যভূমির দু’টিই হারিয়ে গেছে বিভিন্ন স্থাপনার নিচে। পাকবাহিনীর প্রধান আর্মি ক্যাম্পসংলগ্ন বধ্যভূমি এবং ফদনার ডেইল বধ্যভূমির অস্তিত্ব এখন আর নেই। সেখানে বসতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এখন আছে কেবল এয়ারপোর্টের উত্তরপাশে, উত্তর নুনিয়াচড়াস্থ ঠুইট্টাচর বধ্যভূমিটি। প্রচারের অভাবে কেউ সংরক্ষণে এগিয়ে আসেনি এই বধ্যভূমিটি। তবে কালের সাক্ষী এই বধ্যভূমিটি স্থানীয়রা কবরস্থান হিসাবে ব্যবহার করায় অযত্ন-অবহেলায়, বেড়াঘেরা ছাড়াই কোনমতে অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে। তবে ভবিষ্যতে কক্সবাজার বিমানবন্দর সমপ্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এই বধ্যভূমিটিও হারিয়ে যাবে। মুক্তিযোদ্ধারা এসব বধ্যভূমি সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে বলেন, আমাদের গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী বধ্যভূমিসমূহকে পর্যটন শিল্পের স্বার্থেই সংরক্ষণ করতে হবে। এসব স্থানে যাদুঘর গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে।