ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভাস্কর্য

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাজেয় বাংলা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে বন্দুক কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকা তিন নারী-পুরুষের ভাস্কর্য। সর্বস্তরের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণের প্রতীকী চিহ্নই ‘অপরাজেয় বাংলা’। ১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার কাজে হাত দেয়া হয়। এর তিনটি মূর্তির একটির ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। এর মডেল ছিলেন আর্ট কলেজের ছাত্র মুক্তযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে সাবলীল ভঙ্গিতে দাঁড়ানো অপর মূর্তির মডেল ছিলেন সৈয়দ হামিদ মকসুদ ফজলে। আর নারী মূর্তির মডেল ছিলেন হাসিনা আহমেদ। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৯টায় এ ভাস্কর্যের উদ্বোধন করা হয়। স্বাধীনতার এ প্রতীক তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন গুণী শিল্পী ভাস্কর সৈয়দ আব্দুল্লাহ খালিদ। স্বোপার্জিত স্বাধীনতা: বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পশ্চিম পাশে অবস্থিত এ ভাস্কর্য অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের অনুপ্রেরণা যোগায়। এটি একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারের অত্যাচারের একটি খন্ডচিত্র। ১৯৮৭ সালের ১০ নবেম্বর এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৮৮ সালের ২৫ মার্চ এটির কাজ শেষে উদ্বোধন করা হয়। এটি গড়েছেন অন্যতম কীর্তিমান ভাস্কর শামীম সিকদার। এটির চৌকো বেদির ওপর মূল ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু পতাকা ওড়ানো বাঙালি যে রক্ত দিয়েছে, সয়েছে নির্যাতন, তার কিছু খন্ডচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর আরেক পাশে চিত্রিত হয়েছে ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতনের চেহারা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য: বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে এটি। খ্যাতিমান শিল্পী মুর্তজা বশির একক প্রচেষ্টায় এ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন। ৪টি আবাবিল পাখির প্রতীকী নির্মাণে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন বাঙালি জাতির ৬ দফা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্রমধারা। পাখির ডানায় একুশটি পাথরের টুকরোয় লিপিবদ্ধ আছে ভাষা আন্দোলনের কাহিনী। ভাস্কর্যটির মূল ভিত্তি রচিত হয়েছে জাতীয় ফুল শাপলার ওপর। এর কাজ শুরু হয় ১৯৮৪ সালে। ১৯৮৫ সালে এটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ: দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যায়ে নতুন ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে হানাদার বাহিনী। দেশকে মেধাশূন্য করতে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে রাজাকার-আল বদররা। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে নির্মাণ করা হয় এ স্মৃতিস্তম্ভ। প্রথিতযশা শিল্পী রশিদ চৌধুরী এর নকশা প্রণয়ন করেন। বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৮৫ সালে। স্মরণ: মহান মুক্তিযুদ্ধে চবি পরিবারের ১৫ জন শহীদ হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাতজনের স্মৃতি রক্ষার্থে ২০০৯সালের ৫ নভেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশমুখে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ ‘স্মরণ’। যাঁদের স্মরণে এ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে- বীরপ্রতীক শহীদ মোঃ হোসেন, প্রকৌশল দফতরের প্রভাত কুমার বড়ুয়া, চাকসু জিএস ইতিহাস বিভাগের ছাত্র শহীদ আব্দুর রব, একই বিভাগের ছাত্র ফরহাদ-উদ-দৌলা, সমাজতত্ত্ব বিভাগের ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদ, অর্থনীতির নাজিম উদ্দিন খান এবং প্রহরী সৈয়দ আহমদ। সৃৃতিস্তম্ভ ‘স্মরণ’-এর শিল্পী চারুকলা বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ সাইফুল কবীর। স্বাধীনতা স্মৃতি: বাঙালি জাতির বিজয় অর্জনের ধারাবাহিক ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি ম্যুরাল চিত্র। ‘স্বাধীনতা স্মৃতি’ শীর্ষক ম্যুরালটির উন্মোচন হয় ২০১০ সালের ২৫ মার্চ। প্রথম ম্যুরালের উপরের অংশে আছে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক মুহূর্ত এবং নিচে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের চিত্র, আসাদের রক্তমাখা শার্ট, শোকের কালো পতাকা এবং শোকাহত মানুষের ঢল। এছাড়া বাকি চারটি ম্যুরালে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন মুহূর্ত তুলে ধরেন শিল্পী সাইফুল কবীর। কলা অনুষদের সামনে স্বাধীনতা স্মারক ভাস্কর্য প্রাঙ্গণে ম্যুরালটি তৈরি করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাবাস বাংলাদেশ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই নিতুন কুন্ডের তৈরি একটি অসাধারণ ভাস্কর্য- ‘সাবাস বাংলাদেশ’। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক শিক্ষক-ছাত্র শহীদ হওয়ায় এর স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখার জন্য উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। ১৯৯১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নির্মাণ কাজ শুরু হয়। পরে ফলক উন্মোচন করেন শহীদ জননী জাহানারা ইমাম। ভাস্কর্যটি দাঁড়িয়ে আছে ৪০ বর্গফুট জায়গা নিয়ে, যেখানে রয়েছে দু’জন বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি। একজন রাইফেল উঁচু করে দাঁড়িয়ে আর তার বাঁ বাহুটি মুষ্টিবদ্ধ করে জাগানো। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংশপ্তক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণ করা হয়েছে স্মারক ভাস্কর্য সংশপ্তক। গ্রন্থাগারের সামনে এক পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে ভাস্কর্যটি। যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও লড়ে যায় যে অকুতোভয় বীর সেই সংশপ্তক। মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় বীরদের স্মরণে নির্মাণ করা হয় এটি। এক পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যুদ্ধে শত্রুর আঘাতে এক হাত, এক পা হারিয়েও রাইফেল হাতে লড়ে যাচ্ছে দেশমাতৃকার বীর সন্তান। ১৯৯০ সালের ২৬ মার্চ এটি নির্মাণ করা হয়। এটির ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান।