পরাগের ফিরে আসা
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:২৪
মায়ের কোল শিশুর পরম আশ্রয়। সেই কোল থেকে যদি শিশুটিকে ছিনিয়ে নেয়া হয়, তখন মা ও শিশুর অবস্থা কেমন দাঁড়ায়? হূদয়বান মানুষেরাই এই অবস্থাটি সম্যক উপলব্ধি করতে পারবেন। দুই হাজার বারো সালের নভেম্বর মাসে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিলো ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে এবং এই ঘটনাটি প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছিলো দেশের সাধারণ মানুষের হূদয়ে। অপহরণ কোন নতুন ঘটনা নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে প্রতিবছরই শিশু অপহরণের ঘটনা ঘটছে এবং মুক্তিপণ আদায় করে শিশুটিকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে শিশু অপহরণের পর মেরে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, মুক্তিপণ আদায় করেও কোন কোন সময় শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, এমন ঘটনাও বিরল নয়।
বিশ্বের শিশু পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সেই প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মানবসৃষ্ট অমানবিক নানা ঘটনায় সবার আগে প্রাণ হারাতে হয়েছে শিশুর। বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, মহামারি, মন্বন্তর ও খাদ্য সংকটে শিশুরাই প্রাণ দিয়েছে। আর যুদ্ধের প্রথম বলি যে শিশু, তা কে না জানে। শিশুর এই অকাল প্রাণত্যাগের অন্যতম কারণ হলো: শিশুরা অপরিণত বয়সের অধিকারী, শারীরিকভাবে শক্তিহীন এবং অন্যের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই আমরা দেখতে পাচ্ছি শিশু অপহরণ, শিশু পাচার, শিশুর উটের জকি হওয়া এবং যেকোন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে শিশুর প্রাণবিয়োগ।
গত ১১ নভেম্বর শিশু পরাগের অপহরণের ঘটনাটি আমাদের প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছে। পরাগ তার মা লিপি মন্ডল ও বোন পিনাকী মন্ডলের সাথে ইশকুলে যাচ্ছিলো। ঘটনাটি ঘটে কেরানীগঞ্জের শুভ্যাডা পশ্চিমপাড়া বাসার সামনে। অপহরণকারীরা গাড়ির ওপর গুলি চালিয়ে পরাগকে অপহরণ করে। তাদের ইচ্ছে ছিলো ধনী বাবার কাছে মুক্তিপণ আদায় করা। ঘটনাটি ঘটার পর অর্থাত্ পরেরদিন সকল ধরনের প্রচার মাধ্যমে ফলাও করে বিবেকবান ব্যক্তি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা ও সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ সচেতন হন পরাগকে উদ্ধারের জন্য। অপহরণের মাত্র ৬৫ ঘন্টা পর তাকে ১৩ নভেম্বর উক্ত এলাকার আটিবাজার থেকে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। শিশু পরাগকে অপহরণের পর তার বাবা বিমল মন্ডল দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপও কামনা করেন।
অবশেষে পরাগ তার মা লিপি মন্ডলের গুলি লাগা বুকে ফিরে আসে। মন্ডল পরিবারের দুঃখ উবে যায়। দেশবাসীও স্বস্তিতে আনন্দ প্রকাশ করে। তবে একথা ঠিক—পরাগ অপহরণ কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এরকম ঘটনা দেশের কোন না কোন স্থানে হর-হামেশাই ঘটতে দেখা যাচ্ছে। নির্মম ও অমানবিক এরূপ ঘটনা কারোই কাম্য নয়। শিশুদের নিয়ে টাকার লোভে, কখনো হিংসার বশবর্তী হয়ে এমন অপকর্ম করতে দেখা যায়। মানবতা জলাঞ্জলি দিয়ে এসব নরাধম নিষ্প্রাণ শিশুদের হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করে না।
বিশ্বের মানব সমাজ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর শিশুর অমানবিক মৃত্যু দেখে শিশুর অধিকার ও সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে আসে। তারা প্রণয়ন করে শিশু অধিকার সনদ। এই সনদ জাতিসংঘে একসময় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সনদে বলা হয়েছে: শিশুর শারীরিক ও মানসিক অপরিপক্বতার কারণে তার জন্মের আগে ও পরে তার জন্য উপযুক্ত আইনগত সুরক্ষাসহ বিশেষ রক্ষাকবচ ও যত্ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভূমিকায় আরো বলা হয়েছে: শিশুদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ সম্পর্কে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সামাজিক ও আইনগত নীতিমালা স্মরণে রাখতে হবে। সনদের তৃতীয় অনুচ্ছেদের তিন নম্বর ধারায় শিশুর নিরাপত্তার বিষয়টি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাত্ রাষ্ট্র বা সেবা প্রদান প্রতিষ্ঠান শিশুর নিরাপত্তা বিধানে বাধ্য। কিন্তু আমরা কি দেখছি— ভিয়েতনাম, মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, সোমালিয়ায় কি কোন সনদের কোন অনুচ্ছেদ কার্যকর হয়েছে? শুধু কি তাই? একাত্তরে পাকবাহিনী নির্বিচারে শিশুহত্যা করেছে। তেমনি মানুষরূপী বাঙালি নরাধমরা অবোধ শিশু রাসেল, বাবু, বেবীদের হত্যা করে উল্লাস করেছে। নিরাপত্তার বদলে শিশুহত্যা।
শিশুদের সার্বিক সুরক্ষার কথা আমাদের সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে গুরুত্বসহকারে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। শিশুদের বেঁচে থাকা এবং অধিকারসমূহ যথাযথ পালনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে শিশু আইন প্রণয়ন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে জাতীয় শিশুনীতি প্রণয়ন করা হয়। বর্তমান সরকার শিশু আইন ও শিশুনীতির আলোকে গতবছর যুগোপযোগী শিশুনীতি ঘোষণা করেছে। শিশুদের বর্তমান ও ভবিষ্যত্ বিনির্মাণে এটি সুদূরপ্রসারী রূপকল্প। এটি শিশুর সুরক্ষা শীর্ষক ৬.৭.১ ধারায় বলা হয়েছে: সকল প্রকার সহিংসতা, ভিক্ষাবৃত্তি, শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন এবং শোষণের বিরুদ্ধে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতন বন্ধ করার লক্ষ্যে কার্যকর ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্তির পর আমাদের সংবিধান, চুয়াত্তরের শিশু আইন এবং ’৯৪ ও ২০১১ সালের গৃহীত জাতীয় শিশু নীতির মূল বিষয় শিশু এবং শিশুর সার্বিক কল্যাণ আর এ লক্ষ্যে শিশু নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য সংস্থান, বাসস্থান তথা উপযুক্ত পরিবেশে গড়ে তোলার কথা সনদ বিধান ও নীতিতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে আমরা এসব বিধিবিধান, আইন ও নীতিসমূহ ভুলে যাই। আমরা ভুলে যাই পরাগের মমতামাখা একখানি মুখ। আমরা ভুলে যাই পরাগের মতো অধিকারহারা শিশুর কথা। অর্থের প্রলোভনে এবং হিংসার বশবর্তী হয়ে যারা মানবজাতির সেরা সম্পদ শিশুর নিরাপত্তার বদলে শিশু অপহরণ ও শিশুহত্যা করে, তাদের ধিক্কার, তারা মনুষ্য সমাজের শত্রু, সকল শিশুর চিরকালের শত্রু।