তাল-বেতালের হরতাল

গুজরাটি শব্দ ‘হরতাল’ সম্পর্কে ভারতের গুজরাটের লোকজন কতটুকু জানে জানি না তবে আমাদের দেশে মায়ের পেটে থাকা শিশুটিও বোধ করি বুঝতে পারে কেন তার ভূমিষ্ট হতে দেরি হচ্ছে। কারণ তার জন্মের দিনও দেশে হরতাল চলছে। তার মাকে বহন করা হাসপাতালমুখী অ্যাম্বুলেন্সটি হরতাল সমর্থকদের পিকেটাররা রাস্তায় আটকে দিয়েছে। হাসপাতালে যেতে দিচ্ছে না। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালো রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মতো অ্যাম্বুলেন্সটিকে সার্চ করা হচ্ছে আসলে তাতে কোনো রোগী আছে, নাকি ভুয়া। ভূমিষ্ট হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পরবর্তী দিন শিশুটি চোখ পিটপিট করে দেখলো তাদের বহন করা অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে দেয়া হয়েছে। কারণ আজও হরতাল। লাগাতার হরতাল। জেলাভিত্তিক, বিভাগভিত্তিক অথবা দেশব্যাপী একই রব— হরতাল। কোথাও সকাল-দুপুর, কোথাও দুপুর-সন্ধ্যা, আবার কোথাও সকাল-সন্ধ্যা : হরতাল, হরতাল আর হরতাল। সাধারণত হরতাল বলতে আমরা যা বুঝি বর্তমান অবস্থা দেখে বুঝি তার বিপরীত। ভিন্ন দলের অভিন্ন সুরে ‘হরতাল’ শব্দটি রাজপথে কায়েম হলেও বিচার-বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একই হরতাল কীভাবে ভিন্ন চিত্রে ফুটে উঠেছে। আমাদের দেশে সাধারণত কোনো দাবি-দাওয়া আদায়ে আন্দোলন ও একইসঙ্গে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের অন্যতম প্রক্রিয়া হচ্ছে হরতাল। গলা ফাটিয়ে আওয়াজ তোলা হয়—গাড়ির চাকা ঘুরবে না, দোকানপাট খুলবে না। কিন্তু গাড়ির চাকা না ঘুরলে দিনে আনা দিনে খাওয়া যে বাস হেলপারের, ভ্যান-রিকশাওয়ালার কিংবা একদিন দোকান না খুললে পান-বিড়ির দোকান, চায়ের দোকান এমনকি ছোট্ট মুদিখানার দোকানের বা বড় দোকানের ছোট কর্মচারীর যে ঐ দিনের জন্য উপোস থাকতে হবে তা বোধহয় হরতাল আহ্বানকারীদের বোধে আসে না। তারা মনে করে হরতালই সফলতার চাবিকাঠি! হরতালে যে আসলে ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয় না তা সবাই জানে। হরতালে গাড়ির চাকা ঘুরবে না মানে মিল-কল-কারখানায় কাঁচামাল আসবে না, উত্পাদন হবে না; আগে উত্পাদিত পণ্য বাজারজাত হবে না, বিক্রেতা আসবে না, ক্রেতা পণ্য পাবে না, আমদানি-রপ্তানি বা পণ্য খালাস সবই বন্ধ, স্বল্প মেয়াদের পণ্যগুলোর গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাবে বা পচে যাবে আর কর্মজীবীদের একদিনের কাজ জমে থাকায় পরবর্তী দিন দ্বিগুণ কাজ হওয়ায় মানসিক চাপ বেড়ে যাবে। একদিনের এমনকি এক বেলার হরতালে দেশের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হবে। তাই হরতাল যাতে না হতে পারে সেজন্য সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে তত্পর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর হরতালে সরকার ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী মারমুখী ভূমিকায় থাকলেও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যায়— সিপিবি, বাসদ ও বাম মোর্চার হরতালে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল সহযোগীর ভূমিকায় যা অত্যন্ত রহস্যজনক। জামায়াতে ইসলামীসহ সব ‘সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল’ নিষিদ্ধ, যুদ্ধাপরাধের বিচার দ্রুত শেষ, তাজরিন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী মালিকপক্ষ ও সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেফতার ও শাস্তি দেয়া, গার্মেন্টসসহ সব শিল্পকারখানায় আইন অনুযায়ী কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং বিদ্যুত্ বিল ও গাড়িভাড়াসহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমানো, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা বন্ধ করাসহ বেশকিছু দাবিতে ডিসেম্বর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আহ্বানে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। উল্লিখিত বিষয়গুলো সমাধান করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সমস্যার সমাধান হচ্ছে না মানে সরকার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে আর তাই হরতাল আহ্বান করা হয়েছে। এ হরতালে যদি সরকারের সমর্থন ফুটে ওঠে তাহলে এটা বলা স্বাভাবিক যে সরকার স্ববিরোধী ভূমিকা পালন করছে। অন্য হরতালের মতো এ হরতালটিও দোকানপাট বন্ধ রাখতে ও গাড়ির চাকা না ঘোরাতে অর্থাত্ দেশের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হতে সহযোগিতা করেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যাঁরা নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবি করেন তাঁরা হরতালের মতো একটা দেশ ধ্বংসাত্মক আন্দোলনের আহ্বান এবং তা পালন কীভাবে করলেন! তাঁরা যদি সত্যিই প্রগতিশীলতার দাবিদার হয়ে থাকেন তবে হরতাল ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে আন্দোলন করতে পারতেন। প্রগতিশীলদের এ হরতালকে অভিনন্দন জানিয়ে অভিনন্দনকারীরা যে তাল হারিয়ে ফেলেছেন তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। হরতালের কারণে নিত্য কাজে বাধা আসায় দেশের ১৬ কোটি মানুষ যখন আশংকা ও অশান্তির মধ্যে দিন পার করে তখন ‘শান্তিপূর্ণ হরতাল’ বলে হরতালকারী ও তার সমর্থনকারীরা দেশের মানুষের সঙ্গে যে তামাশা করছেন তা সত্যিই বেদনাদায়ক। ‘রোম যখন জ্বলে নিরো তখন বাঁশি বাজায়’ প্রবাদের মতো হরতালের কারণে দেশের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে যখন দেশের অগ্রগতি থেমে যাচ্ছে, তখন রাজপথকে খোলা মঞ্চ বানিয়ে প্রগতিশীলতার দাবিদারেরা গান-বাজনা করে! এর চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে! আর আমাদের পুলিশ ভায়েরা নির্বিঘ্নে মঞ্চ-পারফর্মেন্স চলার জন্য রাজপথে ব্যারিকেড দিয়ে যাত্রী ও গাড়িকে বাড়ি যেতে উপদেশ দেন। হরতাল তো হরতালই। হরতাল মানে মানুষকে অবরুদ্ধকরণ, হরতাল মানে দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিয়ে দেশের মারাত্মক ক্ষতি করা। সেই হরতাল যারা পালন করে তারা হরতাল শেষে আবার দেশবাসীকে হরতাল সফল হওয়ার মানে সফলভাবে দেশকে একদিন পিছিয়ে দেয়ার জন্য, দেশ ও দেশের মানুষের ক্ষতি করার জন্য অভিনন্দন জানায়! দেশ ও দেশের মানুষের জন্য হরতাল কখনো শান্তিপূর্ণ হতে পারে না, সফলতা বয়ে আনতে পারে না। তাই যে বা যারাই হরতাল করুক বা আহ্বান করুক না কেন তা প্রতিরোধ করতে হবে দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে। কিন্তু কারো হরতালে তাল দেয়া আর কারো হরতালে তাল হারিয়ে বেতাল হয়ে হিংসাত্মক আচরণ করা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের নীতি হতে পারে না। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের হরতালে সাধারণ মানুষের শান্তি নষ্ট হবে, নিরপরাধ নিরীহ পথচারী হেনস্থা হবে এমনকি জীবন পর্যন্ত চলে যাবে, তাল হারানো এ রকম হরতাল আমাদের দেশ থেকে চির বিদায় নেবে— এটাই প্রত্যাশা। নারায়ণগঞ্জ