বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। কোনো একটি জাতির উন্নতি নির্ভর করে শিক্ষার ওপর। মেরুদণ্ডহীন মানুষের যেমন কোনো মূল্য নেই, তেমনি শিক্ষাবিহীন জাতির কোনো মূল্য নেই। বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে একটি জাতিকে অবশ্যই শিক্ষিত হতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা হলো শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি। মূল ভিত্তি ঠিক না করে কখনোই শিক্ষার সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪টি শিক্ষা স্তর বিদ্যমান। এগুলো হলো: ক. প্রাথমিক স্তর খ. মাধ্যামিক স্তর গ. উচ্চ মাধ্যমিক স্তর ও ঘ. উচ্চতর স্তর। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রাথমিক স্তর। প্রাথমিক স্তরের পরিধি হলো ১ম-৫ম শ্রেণি পর্যন্ত। এদের বয়সসীমা হলো ৬-১১+। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয়। কিন্তু প্রাথমিকভাবে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা হয় ১ জানুয়ারি ১৯৯২ তে। ঐ দিন দেশের ৬৮টি উপজেলায় তা চালু করা হয়। কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশে চালু করা হয় ১ জানুয়ারি ১৯৯৩-এ। বাস্তবতা বড়ই নির্মম!! ২০১২ সালেও সকল শিশুর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা সম্ভব হয়নি। আবার প্রাথমিক স্তরে ১২ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকটি হলো: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম, এবতেদায়ী মাদ্রাসা ইত্যাদি। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগ রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ১৭নং ধারা অনুসারে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু আমরা তখনও সকল শিশুকে সরকারি প্রাথমিক স্কুলে আনতে পারিনি। দেখা যায় যে, সরকারি প্রাথমিক স্কুলে গ্রামের গরিব মানুষের সন্তান পড়ছে। অন্যদিকে শহরের বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়ছে কিছু শিশু। এর ফলে প্রাথমিক অবস্থায়ই তাদের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে। শহরে যেসব শিশু পড়ছে তারা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। গ্রামের শিশুরা কম সুবিধা পাচ্ছে। গ্রামের গরিবের সন্তানকে স্কুলে আনার জন্য সরকার উপবৃত্তি চালু করেছেন। ২০০২ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে তা চালু করা হয়। শুধুমাত্র উপবৃত্তি চালু করেই শিশুদের স্কুলে ধরে রাখা যাবে না। শিশুরা যে ধরনের পরিবেশ পছন্দ করে শ্রেণিকক্ষগুলো যে রকম করে সাজাতে হবে। শিশুদের আকর্ষণের বিষয় হলো ছবি, কার্টুন, পশুপাখি ইত্যাদি। এগুলো দিয়ে যদি ক্লাসরুম সজ্জিত করা হয় তবে শিশুরা পড়তে বা শিখতে আনন্দ পাবে। এগুলো সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে করা উচিত। সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণি খোলা হয়েছে। কিন্তু স্কুলে গেলে দেখা যায় যে, শিশু শ্রেণির শিক্ষক নেই। দেশের সব প্রাথমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়া উচিত। সকল শিশুকে একই সিলেবাসে পড়ানো উচিত। এক সময় সবাই শিশুদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইতো। বর্তমানে তা পরিবর্তিত হয়ে বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনের দিকে চলে গেছে। সকল শিশুরই প্রাথমিক স্তরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া উচিত। তা করতে হলে সরকারকে কিন্তু পরিবর্তন আনতে হবে। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। শিশুদের ভালো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নারীরা। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই হলো শিশু স্তরের সবচেয়ে ভালো জায়গা। অনেক অভিভাবক বলেন যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার অবস্থা ভালো না। শিশুদের পড়ানোর জন্য দরকার শিক্ষকদের মন-মেজাজের প্রশান্তি। নারী শিক্ষকরা শিশুদের ভালো বোঝাতে পারেন। একজন নারী শিক্ষককে যখন বাড়ি থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরে নিয়োগ দেওয়া হয় তখন রাস্তায় যেতে যেতেই তার মেজাজ ভালো থাকে না যেহেতু বাংলাদেশে এখনও মেয়েদেরকে সবসময় তাদের পরিবারের সদস্য নিয়ে চিন্তা করতে হয়। তাই যদি তাদেরকে তার বাড়ির নিকটবর্তী কোনো স্কুলে নিয়োগ দেওয়া হয় তা হলে ভালো হবে। তাদের মন মানসিকতা হয়তোবা ভালো থাকবে। সেইসঙ্গে শিশুদের শিক্ষার মানও বৃদ্ধি পাবে। জীবন যাপনের জন্য অর্থের প্রয়োজন। কিন্তু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। বর্তমান জাতীয় বেতন স্কেল অনুসারে, তাদের স্কেল হলো ৪৭০০ টাকা। বর্তমানে প্রচুর শিক্ষক নিয়োগ পাচ্ছেন, যাঁরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স শেষ করেছেন। যেখানে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সপ্তাহে ৩ দিন ক্লাস করে, সেখানে সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ৬ দিনই ক্লাস করে। কিন্তু তাঁরা তাঁদের যোগ্য সম্মান পাচ্ছেন না। সরকারি অফিসের গাড়িচালকের বেতনও ৪৭০০ স্কেলে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে অনেক গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধার কথাও চিন্তা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশেই এর ব্যতিক্রম দেখা যায়। আবার দেশের যে কোনো তথ্য সংগ্রহের কাজ করতে হয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে। কোনো একটি শিশুর ভিত্তি স্থাপন করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। দেশের খুব কম সংখ্যক শিশুই ইংলিশ মিডিয়াম ও কিন্ডারগার্টেন পার। তাই আমাদের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়েই চিন্তা করতে হবে। কিছুদিন আগে সরকার পুলিশের উপপরিদর্শককে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরি দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হোক। তাহলে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে। এর সঙ্গে সঙ্গে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার মানও বৃদ্ধি পাবে। তা না হলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়