বন্ধ হয়ে গেছে দিনাজপুরের দুইশ’ চালকল
প্রকাশ : ২৫ ডিসেম্বর ২০১২, ২১:৫৪
লোকসান দিতে দিতে দিনাজপুরের কয়েকশ’ চালকল বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে জড়িত শ’ শ’ পরিবার বেকার হয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। চালকল মালিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। ফলে অনেক মালিক কল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। গত ৩ বছরে প্রতিটি মিল মালিক কোটি কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
একজন মিল মালিক জানান, গত বছর আমন মৌসুমে প্রতি বস্তা ধান ক্রয় করা হয়েছিল ১১৫০ টাকায়। একটি মিলকে সারা বছর চালু রাখতে হলে কয়েক হাজার মণ ধান ক্রয় করে মজুদ রাখতে হয়। সে হিসাবে ধান ক্রয় করে রাখার মাত্র একমাস পরেই বাজারে প্রতি বস্তা ধানের দাম নেমে আসে ১০৫০ টাকায়। প্রতি বস্তায় আর্থিক ক্ষতি হয় ১০০ টাকা। আর চাল তৈরি করে বিক্রি করলে ক্ষতি হয় প্রতি বস্তায় ৩০০ টাকা। এভাবে একদিকে ধান-চালে লোকসান এবং অপরদিকে ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধ করে চালকল মালিকরা ৩ বছরে কোটি কোটি টাকার লোকসান দেন। এছাড়াও মিল বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের মজুরি দিতে হয়। এভাবে এই বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়ে অনেক চালকল মালিক মিল বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে নামমাত্র মূল্যে মিল বিক্রি করে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছেন।
চালকল মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মহন পাটোয়ারী জানান, চালকলগুলো যে হারে কয়েক বছরে আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে তাতে মিল মালিকদের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে। লোকসান দিতে দিতে এ পর্যন্ত ২০০ চালকল বন্ধ হয়ে গেছে। এই দুইশ’ মিলকেন্দ্রিক প্রায় ৬ হাজার পরিবার বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। ধান ব্যবসায়ী হামিদুল ও ইলিয়াস জানান, অনাবৃষ্টি, বিদ্যুত্ ব্যয় ও তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ধান উত্পাদনে যে ব্যয় হয় তা উঠে আসে না। পূর্বে এক একর জমিতে ৪৪ মণ ধান উত্পাদন হতো, এখন নানা সমস্যার কারণে উত্পাদন হচ্ছে ৩০/৩৪ মণ। কৃষকরা উত্পাদন ব্যয় উঠে আসার জন্য চড়া দাম ধরে রাখে। বাধ্য হয়ে মিল মালিকদেরও চড়া দামে ধান ক্রয় করতে হয়। কিন্তু মিল মালিকরা অমৌসুমে ধান সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে দেয়ার সময় অত্যন্ত কম মূল্যে দিতে বাধ্য হন। দিনাজপুর অটো রাইস মিলের মালিক সিদ্দিক গজনবী বলেন, ছাড়তেও পারছি না আবার মিল চালাতেও পারছি না। মহাসংকটে পড়েছি। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করাই এখন দায় হয়ে পড়েছে। আগামী মৌসুমে হয়তো আরো কয়েকটি মিল বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ ফসল উত্পাদনে যে হারে ব্যয় হচ্ছে তা উত্পাদিত ফসল থেকে উঠে আসবে না।
সরকারের ক্রয় নীতিমালা এবং কৃষকের উত্পাদনে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি শস্যভাণ্ডার দিনাজপুরের চালকল মালিক ও কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন মিল মালিকরা। সেইসঙ্গে চালকল মালিকদের পথে বসতে হবে। কারণ পর পর ৩ বছর ধরে লোকসান দিয়ে আসছেন তারা। এ বছরের চিত্রটা ভিন্ন। ধানের দাম এ মৌসুমে আরও কমে গেছে। প্রতি বস্তা ১০২০ টাকা থেকে ১০৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মোটা চালের দাম ২০ থেকে ২২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে ক্রাসিং করে মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি ক্রয়মূল্য ২৬ টাকা থাকলেও এখনও সরকারিভাবে চাল সংগ্রহ শুরু হয়নি। কারণ বর্তমানে চালের আর্দ্রতা ১৬ থেকে ১৮-র মধ্যে রয়েছে। আর্দ্রতা ১৪ না হলে খাদ্য গুদাম ক্রয় করে না।