হারিয়ে গেছে রাজধানীর বেশিরভাগ পার্ক ও মাঠ

রাজধানীর তেজকুনিপাড়া এলাকার বাসিন্দা নওশের আলী ভুঁইয়া তার সাড়ে চার বছরের মেয়ে তনুকে নিয়ে ঘুরতে এসেছেন সংসদ ভবন এলাকায়। ফুটফুটে বাচ্চাটি সেখানে বেলুন নিয়ে খেলছে, এদিক সেদিক ছুটোছুটি করছে। অচেনা আরো দুইটি শিশু যোগ দিয়েছে তার সঙ্গে। সন্তানের এমন উচ্ছ্বলতা দেখতে কার না ইচ্ছে হয়। তাই তো সুযোগ পেলেই মেয়েকে নিয়ে ঘুরতে বের হন নওশের। একটু খোলামেলা জায়গায় গিয়ে কাটান কিছুটা সময়। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে ছোট্ট মেয়েটির দিন কাটে রীতিমতো খাঁচায় বন্দী পাখির মতো। জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখা কিংবা পাশের বাড়ির অন্যকোনো বাচ্চার সঙ্গে চিত্কার করে একটু কথা বলা ছাড়া জগতের সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ থাকে না তার। ইচ্ছে থাকলেও বাসা থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ঘর থেকে বের হয়েই রাস্তা। তারপর চারদিকে কেবল ইট-পাথরের অট্টালিকা। মহল্লায় একটুখানি খোলা জায়গা, পার্ক কিংবা খেলার মাঠের কোনো অস্তিত্ব নেই। সেইসঙ্গে নিরাপত্তার ভয় তো সারাক্ষণই তাড়া করে সব বাবা-মাকে। কেবল তনু নয়। তার মতো হাজার হাজার শিশু এই নগরীতে বেড়ে উঠছে খাঁচায় বন্দী পাখির মতো। চার দেয়ালের ভেতর কিছু খেলনা, ভিডিও গেমস কিংবা টেলিভিশনে ডোরেমনের মতো বিদেশি কার্টুন ছবি দেখেই দিন কাটে তাদের। মূলত নগরীতে খেলার মাঠ ও পার্কের স্বল্পতার কারণেই শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে উন্মুক্ত পরিবেশে খেলাধুলা করা বা ইচ্ছেমতো ছুটে বেড়ানোর সুযোগ থেকে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় জনসংখ্যার অনুপাতে রাজধানীতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পার্ক ও খেলার মাঠ ছিল। অধিকাংশ পার্ক তৈরি করে রাজউক। এরপর ব্যবস্থাপনার জন্য সেগুলো সিটি করপোরেশনের তত্ত্ববধানে ছেড়ে দেয়া হয়। সময়ের ব্যবধানে নগরীতে লোকসংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি মানুষের জন্য এখানে নতুন নতুন পার্ক ও খেলার মাঠ সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল; কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টোটা। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুরনো পার্ক এবং খেলার মাঠের অনেকগুলোই উধাও হয়ে গেছে প্রভাবশালীদের থাবায়। ফলে শিশু-কিশোর তথা নতুন প্রজন্মের জন্য ভয়ানক বৈরি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে এই নগরীতে। রাজউক এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত পার্ক ৪৭টি; কিন্তু বাস্তবে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে বড়জোর ১৫টির। একইভাবে ১৯টি খেলার মাঠের মধ্যে ৮টির অস্তিত্ব কোনোমতে টিকে আছে। বাকিগুলো বেদখল হয়ে গেছে নগর কর্তৃপক্ষের লোকজনের চোখের সামনেই। বিগত কয়েক বছরে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বার বার ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, বেহাত হয়ে যাওয়া পার্ক ও খেলার মাঠগুলো পুনরুদ্ধার করে নগরবাসীর ব্যবহারের উপযোগী করা হবে; কিন্তু গুলশানের ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক ছাড়া আর কোনো পার্ক বা খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নথিপত্রে থাকা ৪৭টি পার্কের মধ্যে রয়েছে গোলাপবাগ পার্ক, ধুপখোলা মাঠ পার্ক, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পার্ক, সায়েদাবাদ পার্ক, বাহাদুর শাহ পার্ক, বাংলাদেশ মাঠ পার্ক, নাজিরাবাজার পার্ক, সিরাজউদ্দৌলা পার্ক, আরমানিটোলা পার্ক, হাজারীবাগ পার্ক, হাজারীবাগ কসাইখানা পার্ক, রায়েরবাজার পার্ক, বাসাবো মাঠ পার্ক, মগবাজার পার্ক, গুলিস্তান পার্ক, মতিঝিল বিআরটিসি ভবন সংলগ্ন পার্ক, বিমান অফিসের পূর্ব দিকের পার্ক, ওসামানী উদ্যান, ধানমন্ডি ৩ নম্বর গেইট পার্ক, শেরশাহ সূরী লেন পার্ক, কলাবাগান পার্ক, কলাবাগান শিশু পার্ক, মুক্তাঙ্গন পার্ক, ধানমন্ডি পার্ক, লালমাটিয়া ডি ব্লক পার্ক, মোহাম্মদপুর শহীদ পার্ক, ইকবাল রোড শিশু পার্ক, ইকবাল রোড মাঠ পার্ক, বাবর রোড পার্ক, তাজমহল রোড পার্ক, পশু হাসপাতালের সামনের পার্ক, স্বামীবাগ পার্ক, কাওরান বাজার পার্ক, বাংলামটর সংলগ্ন পার্ক, তালতলা পার্ক, গুলশান ট্যাংক পার্ক, ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক, গুলশান-২ নম্বর পার্ক, গুলশান পার্ক, বনানী পার্ক, নীমতলী পার্ক, আনন্দবাজার দক্ষিণ পার্ক, শ্যামলী পার্ক (ওভারব্রীজ সংলগ্ন), বংশাল মোড় পার্ক, নবাবগঞ্জ পার্ক, ইংলিশ রোড পার্ক এবং সার্ক ফোয়ারা সংলগ্ন পান্থকুঞ্জ পার্ক। ডিসিসির মালিকানাধীন খেলার মাঠগুলোর মধ্যে রয়েছে— গোলাপবাগ মাঠ, বাংলাদেশ মাঠ, বাসাবো মাঠ, লালবাগ শ্মশানঘাট মাঠ, কিল্লার মোড় মাঠ, ধুপখোলা মাঠ, ধানমন্ডি মাঠ, কলাবাগান মাঠ, বনানী মাঠ ও গুলশান সেন্ট্রাল পার্ক মাঠ। কিন্তু এখনকার বাস্তব চিত্র হলো- যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় কখনো কোনো পার্ক ছিল তা আজ আর কল্পনা করারও কোনো উপায় নেই। মগাবাজার পার্কটি কবে, কোথায় ছিল তা সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও পরিষ্কার করে বলতে পারেন না। কাওরান বাজার ও বাংলামটর এলাকায় বহুকাল ধরেই কোনো পার্কের অস্তিত্ব নেই। মোহাম্মদপুর ও গুলশান-বনানী এলাকার পার্কগুলো তুলনামূলক ভাল অবস্থায় থাকলেও অন্যসব এলাকার পার্কগুলো ধীরে ধীরে বেদখল হয়ে গেছে। কোথাও পার্কের জায়গায় তৈরি হয়েছে মার্কেট বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। আবার কোথাও পার্ক দখল করে গাড়ি কিংবা রিকশার গ্যারেজ বানানো হয়েছে। অভিযোগ আছে, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের লোকজনের যোগসাজশেই বিভিন্ন সময় বেদখল হয়ে গেছে এসব পার্ক। নগরীর মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের মালিকানায় ছিল অন্তত দুই ডজন পার্ক; কিন্তু আজকাল এসব পার্কের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রভাবে স্বার্থান্বেষী মহল জবরদখল করে নিয়েছে এসব পার্ক। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের মালিকানাধীন রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও চন্দ্রিমা উদ্যান দখলমুক্ত রয়েছে এবং এগুলোর পরিবেশও তুলনামূলক ভাল। গুলশান ও বনানী এলাকার মাঠগুলোও তুলনামূলক অক্ষত রয়েছে। এছাড়া বারিধারা কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত পার্কটি দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে বারিধারা সোসাইটি। এ কারণে পার্কটির সামগ্রিক পরিবেশ যথেষ্ট ভাল। এ বিষয়ে রাজউকের চেয়ারম্যান মো. নূরুল হুদার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ১৯৮৭ সালের এক সার্কুলার অনুযায়ী রাজউকের নির্মিত সকল পার্ক, খেলার মাঠ, মার্কেট ও রাস্তাঘাট ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশনের অনুকূলে হস্তান্তর করা হয়েছে; কিন্তু পরবর্তীকালে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক পার্ক ও খেলার মাঠ বেদখল হয়ে গেছে। এরমধ্যে গুলশানের ওয়ান্ডারল্যান্ড পার্ক অন্যতম। রাজউকের দীর্ঘদিনের চেষ্টায় উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে পার্কটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এরকম আরো কয়েকটি বেহাত হওয়া পার্ক উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া রাজউকের সৃষ্ট পার্ক ও খেলার মাঠগুলো পুনরায় রাজউকের হাতে ফিরিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে পূর্ত মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।