এ কেমন মানসিকতা

ইহা কি ভাবা যায় যে, যে-বিদ্যালয়টিতে নিজের প্রাণপ্রিয় সন্তান পড়ালেখা করে, সেই বিদ্যালয়ের প্রবেশমুখেই বিপজ্জনক বর্জ্য ফেলিতেছেন অভিভাবকেরা? না, ভাবা যায় না। কোনো অজ্ঞাত কারণে অভিভাবকদের মধ্যে যদি নাগরিক সচেতনতাবোধ বা বিবেকবোধ জাগ্রত না হয়—সিটি কর্পোরেশন কি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিতে পারে? না, কোনো অবস্থাতেই পারে না। কারণ নগর পরিচ্ছন্ন রাখা, সর্বোপরি শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা তাহাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। কোনো কারণে সিটি কর্পোরেশনে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ যদি তাহাদের দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেন— তাহা দেখভাল করিবার জন্য ওয়ার্ড কমিশনার আছেন, সর্বোপরি আছেন মেয়র। এই সমগ্র সিস্টেমটিও যদি কাজ না করে তাহা হইলে শেষ ভরসা হিসাবে বিদ্যালয় পরিচালনা কর্তৃপক্ষ আছেন। আছেন শিক্ষকমণ্ডলী। তাহারা অবশ্যই যেকোনো মূল্যে তাহাদের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করিবেন—ইহাই প্রত্যাশিত। নিজেদের সামর্থ্যে কিংবা ক্ষমতায় কুলাইয়া উঠিতে না পারিলে কত কী করা যায়! সংবাদ সম্মেলন করিয়া সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা যায় বিষয়টি। শিক্ষার্থীদের লইয়া মানববন্ধনও করা যায় বিদ্যালয়ের সামনে। এত কর্তৃপক্ষ এত পথ থাকা সত্ত্বেও পুরান ঢাকার বংশাল তথা নর্থসাউথ রোডের সুরিটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে মাসের পর মাস সদম্ভে দুর্গন্ধ ছড়াইতেছে বিশাল এক বর্জ্যের ভাগাড়। অথচ একই ক্যাম্পাসে রহিয়াছে সুরিটোলা উচ্চবিদ্যালয়।  এই দুইটি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত আছে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী। তাহা সত্ত্বেও কীভাবে ইহা সম্ভব হইল—এই প্রশ্নের উত্তরে হতাশার সহিত বলিতে হয় যে, যেই দেশে কেহই নিজের দায়িত্বটি ঠিকঠাকমতো পালন করেন না সেই দেশে বোধ করি সবই সম্ভব।

বিশদ চিত্র যথারীতি আরো করুণ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাইয়াছেন, গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি এই বিদ্যালয়ের সামনে রাখা ডাস্টবিনের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়াইয়া পড়ে। ইহার কয়েকদিন পর ডাস্টবিনটি সরাইয়া নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সেখানে বর্জ্য না ফেলিতে একটি ব্যানারও টানাইয়া দেওয়া হয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! সপ্তাহখানেক পর সেখানে আবারও বর্জ্যের পাহাড় জমিয়া ওঠে। মহল্লাবাসী তাহাদের বিদ্যালয়টিকে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত করিতে পারিলেন কীভাবে সেই প্রশ্ন যদি আমরা নাও তুলি, ডিএসসিসি কেন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করিল না সেই প্রশ্ন এড়াইয়া যাওয়া কঠিন। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলিতেছেন, তাহারা বিভিন্ন সময়ে অভিভাবকদের ডাকিয়া আনিয়া বিদ্যালয়ের সামনে বর্জ্য না ফেলিতে অনুরোধ করিয়াছেন। কিন্তু কাজ হয় নাই। এখন এই দম বন্ধ করা গরমে বর্জ্যের দুর্গন্ধে শুধু যে বিদ্যালয়ের পাঠদান ব্যাহত হইতেছে তাহাই নহে, গণহারে শিক্ষার্থীদের অসুস্থ হইয়া পড়ার আশঙ্কাও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। আর কী আশ্চর্য ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলিয়াছেন, সেখানে বর্জ্য ফেলার বিষয়টি নাকি তাহার জানা নাই! যত অপ্রিয়ই হউক, এই চিত্র এই বাস্তবতা যে বিচ্ছিন্ন কিছু নহে—তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অঙ্গ বলা হইয়া থাকে। কিন্তু দেশের প্রায় সর্বত্রই যে-চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করি—তাহা আমাদের রুচি ও মানসিকতারই প্রতিফলন বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। এই মানসিকতা যে-উন্নত দেশের স্বপ্ন আমরা দেখিতেছি তাহার সহিত একেবারেই সঙ্গতিপূর্ণ নহে।