সৈয়দ শামসুল হকের
৭৮তম জন্মদিন
আজ
প্রকাশ : ২৬ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:১৯
আটাত্তরে পা দিলেন বাংলা সাহিত্যের কিংবদন্তিতুল্য লেখক সৈয়দ শামসুল হক। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান এতটাই বৈচিত্র্যময় যে তাকে ‘সব্যসাচী’ অভিধায় ভূষিত করেছেন তার ভক্ত-পাঠকবৃন্দ। শিল্প সাহিত্যের জগতে ক্লান্তিহীন পর্যটক তিনি। সৃজনশীল, চমক জাগানো কাজ তার মত কেউ করেননি। তার সাহিত্যকর্মে বৈচিত্র্যের কারণেই পাঠককে আকর্ষণ করে। একজন লেখক যে এত গভীরভাবে লিখতে পারেন তা বিশ্বাস করা কঠিন। হেন বিষয় নেই যার প্রতি তিনি আলোকপাত করেননি। পাশাপাশি ঐতিহ্য থেকে সাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করে তার লেখা চমক জাগায়। তরুণ প্রজন্মকে সাহিত্য ও ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, চিত্রকলা, সঙ্গীত, অনুবাদ, সমালোচনা, সিনেমার স্ক্রিপ্ট, সাংবাদিকতা, কলাম লেখা প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারার সৃষ্টি করেছেন।
বয়স যখন এগারো কী বারো, তখন টাইফয়েডে শয্যাশায়ী কিশোর সৈয়দ হক বাড়ির পাশের সজনে গাছে বসা লাল টুকটুকে পাখি দেখে কী এক অব্যক্ত বেদনাতেই যেন খুঁজে পেয়েছিলেন ছন্দ। বারো বছরের ওই কিশোর পরে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন শক্তিমান লেখক হিসেবে। আজ ২৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ৭৮তম জন্মদিন।
১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তিনি কুড়িগ্রাম মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দ সিদ্দিক হোসেন ছিলেন একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার। মায়ের নাম হালিমা খাতুন। এ লেখকের শিশু ও কৈশোরকাল এই কুড়িগ্রামে কেটেছে। তার বাবা চাইতেন ছেলে ডাক্তারি পড়বে। কিন্তু তিনি ডাক্তারি পড়ার চাপ এড়াতে ১৯৫১ সালে ভারতের মুম্বাই পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বছরখানেক একটি সিনেমা প্রডাকশন হাউসে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এরপর দেশে ফিরে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী ভর্তি হন জগন্নাথ কলেজের মানবিক শাখায়। পরে ১৯৫৪ সালে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। তবে ইংরেজি বিভাগে তার পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় ইস্তফা দেন সৈয়দ শামসুল হক। এর কিছু দিন পরেই প্রকাশিত হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘দেয়ালের দেশ’।
বাবার মৃত্যুর পর ১৯৫৬-৫৭ সালে বেশ অর্থকষ্টে পড়ে যান সৈয়দ হক। ওই সময় অর্থের জন্যই তিনি শুরু করেন চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত সৈয়দ হক ৩০টির মতো চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা করেন। সৈয়দ হকের লৈখা ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’, ‘রাজা এল শহরে’, ‘শীত বিকেল’, ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’ ইত্যাদি চলচ্চিত্র দর্শকপ্রিয় হয়।
সৈয়দ হক চলচ্চিত্রের জন্য গানও রচনা করেন। তবে চলচ্চিত্র অঙ্গনে তার এ ব্যস্ততার মধ্যেও থেমে থাকেনি সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা কিংবা ছোটগল্প রচনা। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় তার কাব্যগ্রন্থ একদা এক রাজ্যে। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত লেখা তার ছোটগল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘তাস’, ‘শীত বিকেল’, ‘রক্ত গোলাপ’ প্রভৃতি।
সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘এক মহিলার ছবি’, ‘অনুপম দিন’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’, ‘স্মৃতিমেধ’, ‘মৃগয়া’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল’, ‘ত্রাহি’, ‘তুমি সেই তরবারি’, ‘কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন’, ‘নির্বাসিতা’, ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘মেঘ ও মেশিন’, ‘ইহা মানুষ’, ‘বালিকার চন্দ্রযান’, ‘আয়না বিবির পালা’ প্রভৃতি। সৈয়দ হকের লেখা কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’, ‘বিরতিহীন উত্সব’, ‘প্রতিধ্বনীগণ’, ‘পরানের গহিন ভিতর’ উল্লেখযোগ্য। বাংলা মঞ্চ নাটকেও শক্তিমান এক পুরুষ হিসেবে নিজের লেখনীর প্রমাণ দিয়েছেন সৈয়দ হক।
অগণিত পাঠকের ভালোবাসার পাশাপাশি দেশের প্রায় সব প্রধান পুরস্কারই তার করতলে শোভা পাচ্ছে। পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক ও স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত পুরস্কারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো বাংলা একাডেমী পদক, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, পদাবলী কবিতা পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, আইএফআইসি ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার প্রভৃতি।