প্রদর্শনী
অস্তিত্ব-চেতনায় মানববন্দনা
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১০
প্রকৃতি, সমাজ, সময় ও প্রযুক্তির এগিয়ে চলাকে শিল্পী অবলোকন করেন রং-রেখার সংশ্লেষে। সঞ্জয় দাস মানুষের সম্পর্ককে ছবিতে তুলে আনেন বাস্তবরীতির আশ্রয়ে। ক্যানভাসের মানুষগুলো বাস্তবরীতিতে গড়া। ছবির জমিনে নির্দিষ্ট রং আর আকৃতির ব্যবহার বক্তব্যপ্রধান করে তোলে। সঞ্জয় অভিব্যক্তির গুরুত্ব দেন ছবির ভাষায়। ২২ ডিসেম্বর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীর ছবির সংখ্যা ৬৬টি। ক্যানভাস ও কাগজের ওপর কলমের রেখাপ্রধান কাজের মূল ভাবনা মানুষ, সময়, প্রযুক্তি ও প্রকৃতি। সঞ্জয় ছবিতে গদ্য তৈরি করেন, ছন্দ স্থির হয়ে দেখা দেয় মানব-মানবীর শরীরী ভঙ্গিতে। মৌলিক রং মিশে তৈরি হওয়া উষ্ণ রংয়ের ব্যবহারের অভ্যাস সৃষ্টিকে ছড়িয়ে দেয় ক্যানভাসের পুরোভাগে। সঞ্জয় রং ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহনীয় মাত্রা এড়িয়ে চলেন। ক্যানভাসের স্থির বিন্দুতে দৃষ্টি আবদ্ধ করার মৌলিক ভাবনায় তিনি মনোযোগী হন না। নীল, সবুজ আর গাঢ় রংয়ের ছবির জমিনের গায়ে প্রতিটি বিষয় উত্কীর্ণ হয়েছে। অস্তিত্বচেতনায় প্রোথিত প্রকৃতি, নগরায়ণ, প্রযুক্তির মিশ্রণ প্রতিটি ছবির ভাবনায় মিশেছে।
তিনটি পর্যায়ভুক্ত সঞ্জয়ের কাজ দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় পৃথিবীব্যাপী সভ্যতার অগ্রযাত্রার যান্ত্রিক অনুসঙ্গকে ছবির বিষয় করে তোলার জন্য। মধ্যরাতে শায়িত দম্পতির শয়নকক্ষের বাইরে নগর-সৌন্দর্যকে শিল্পী দেখেন মানুষ ও নগরের অঙ্গা-অঙ্গি পরিবেশ হিসেবে। ক্যামেরা, মানুষ, প্রাণিকূল—সবকিছুকে এক করে ক্যানভাসে দেখতে চান সঞ্জয়; নদী-পাহাড়-সবুজ বনানী সংযোগ করে তোলেন অনায়াসে। তিনি শান্তিনিকেতনে শিল্পকলায় অধ্যয়নকালে নিরীক্ষায় যুক্ত হন গত দশকের মাঝামাঝি। বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় গত ছয় দশকে ধারাবাহিক বিবেচনায় শেষ দশকের তরুণদের দ্বিমাত্রিক কাজের ধারায় বিষয়ের দিক থেকে পরিবর্তন এসেছে। তরুণেরা ছবির মাধ্যমের নিরীক্ষায় সাফল্য পেয়েছেন। সঞ্জয় সেই সফলদের একজন। তাঁর কাজে চর্চার নিবিষ্টতার দেখা মেলে। এটি তাঁর তৃতীয় একক প্রদর্শনী। কিছু কাজের ক্ষেত্রে মানুষ ও আকৃতির সংযুক্তি বাদ দিয়ে চিত্রতলে স্থানের আয়োজন জরুরি মনে হয়েছে। ‘মুন লাইট ড্রিম’ ছবিটি অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে আঁকা। বেগুনী রংয়ের নারীর অবয়ব উলম্ব আকৃতির সাথে মিশে আছে। ক্যানভাসকে দুটি উলম্ব সরল রেখায় বিভক্ত করেছেন। ছবিটিতে প্রথাগত আলোছায়ার উপস্থিতি দেখা গেলেও এটিকে ভারসাম্যপূর্ণ শিল্পকর্ম বলেই মনে হয়। ‘লস্ট ওয়াকম্যান’ ছবিতে শব্দযন্ত্রের আকৃতির সাথে যুক্ত করা একটি লেজ-সদৃশ রেখা আমাদের নিত্যব্যবহার্য শ্রুতিযন্ত্রের সাথে ইঁদুরদৌড়ের ভাবনা যোগ করে। ‘ওয়ান মোমেন্ট’ সঞ্জয়ের প্রদর্শনীর আরেকটি ছবি। নীল আকাশের সাথে পাহাড়, নদী, বন্যপ্রাণীর সাথে অপেক্ষমাণ শহুরে স্যুট-টাই পরা সাহেবের অবয়ব। মানুষ, প্রকৃতি, ক্যামেরা, আলোকসজ্জার সরঞ্জাম যুক্ত করে প্রযুক্তির সাথে মানুষের অব্যাহত যোগযোগের মিশ্রিত মাধ্যমকে প্রকাশ করেছেন। এ প্রদর্শনীর সব কাজে সঞ্জয়ের নিজস্বশৈলী তৈরির চেষ্টা স্পষ্ট। কালি-কলমের কাজের মানের দিক বিবেচনায় আনলে প্রদর্শনীর পরিশীলিত রূপ ক্ষুন্ন হয়। শিল্পীর অনেক সৃষ্টির মাঝে কিছু সৃষ্টিকর্ম চুড়ান্তভাবে উপস্থাপনযোগ্য বলে সমীচীন হয়নি। সঞ্জয় কুমার দাস শিল্পকর্মে নিরীক্ষার পথ অন্বেষণ করছেন। একটি লক্ষ্যের দিকে যাত্রা তাঁর ক্যানভাসে উঁকি দেয়। বিষয়ভাবনা ও ছবির মাধ্যমের নিমগ্নচর্চা সঞ্জয়ের কাজকে শক্তি এনে দিয়েছে। প্রদর্শনীটি শেষ হবে ৩০ ডিসেম্বর।
সঞ্জয় কুমার দাস : ২০০৪ সালে ভারতের বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতন থেকে চিত্রকলায় স্নাতক ও ২০০৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিতে চিত্রকলার প্রভাষক হিসেবে কর্মরত।