নাটক
সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মহাজনের নাও
প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১১
২১ ডিসেম্বর শিল্পকলা একাডেমীর পরীক্ষণ হলে হয়ে গেল ‘মহাজনের নাও’ নাটকটির ৫০তম প্রদর্শনী। এটি সুবচন নাট্য সংসদের ৩৩তম প্রযোজনা। নাটকটির নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী। প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন সব্যসাচি লেখক সৈয়দ সামসুল হক। দেশে-বিদেশে মহাজনের নাওয়ের আমন্ত্রিত প্রদর্শনীর সংখ্যা ২৭। নাটকটি অ্যারিনা মঞ্চের জন্য বেশি উপযোগী হলেও প্রসেনিয়াম মঞ্চেও ১৫ বার প্রদর্শীত হয়েছে। মহাজনের নাও শাকুর মজিদের প্রথম মঞ্চনাটক। এটি পয়ার ছন্দে গীতল ধারায় রচিত। নাটকে শাহ আবদুল করিমের শৈশব থেকে মৃত্যুর পর জানাজা পর্যন্ত সময়কে তুলে ধরা হয়েছে। শাহ আবদুল করিমের লেখা ‘আত্মস্মৃতি’ ও তাঁর ভাগনে শাহ আবদুল তোয়াহেদের ‘স্মৃতিকথা’-নির্ভর কাহিনি এটি। মূলত দেহতত্ত্ব ছিল তাঁর গান ও সাধনার মূল বিষয়। ভাটি অঞ্চলের মানুষ ছিলেন বলেই হয়তো তাঁর গানে নৌকার প্রসঙ্গ এসেছে বারবার। এবং নৌকা এসেছে দেহের রূপক হিসেবে, যে নাওয়ের মালিক তিনি নন, কোনো এক অজানা মহাজন। শুধু সঠিকভাবে চালিয়ে কোনো এক সোনার গাঁয়ে পৌঁছানোর গুরুদায়িত্ব তাঁর। বাউল সাধক শাহ আবদুল করিমের জীবন ও দর্শনের ওপর এমন সহজ বর্ণনে রচিত নাটক মহাজনের নাও।
নাটকটিতে কোনো দৃশ্য-বিভাজন ও দুর্বোধ্যতা নেই। তবে অংলকারের ঝংকার তোলে সুরের মুর্ছনায়, সংলাপের গভীরে ও দৃশ্যকল্প নির্মাণে। নাটকটির শুরুতেই নির্দেশকের সুনিপুণ পরিকল্পনার আলো-আঁধারিতে কুশীলবদের মঞ্চপ্রবেশের পর বন্দনাসংগীত শুরু হয়।
এরপর কোরাস আর কথকের কাব্যময় সুরেলা কথনে উঠে এল বাংলার ভাটি অঞ্চল। একে একে দৃশ্যমান হলো শাহ আবদুল করিমের জন্ম, শৈশব ও কৈশোর। একদিন ঈদের জামাতে ইমাম ও কয়েক জন মুরব্বি করিমকে গান ছাড়ার নির্দেশ দিলে হলভর্তি দর্শক বিচলিত হয়ে হঠে। করিম মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দূর-গ্রামে রওনা হয়। তাঁর কণ্ঠে তখন উঠে আসে—আমি কুল হারা কলঙ্কিনী/ আমারে কেউ ছুঁইয়ো না গো স্বজনি। সুরের মুর্ছনায় দর্শক ভেসে যায় ভাটি অঞ্চলের আনাচে-কানাচে। দিনে দিনে ছড়িয়ে পড়ে করিমের নাম। বসন্ত বাতাসের দোলায় করিম গেয়ে ওঠে—বসন্ত বাতাসে সই গো, বসন্ত বাতাসে/ বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে।
আফতাবুন নেছার সাথে করিমের দু্ই মাসের সংসার। সংসার ভাঙলে বিরহী করিমের কণ্ঠে উঠে আসে ভাঙনের গান— আইলায় নারে আইলায় নারে বন্ধ,ু করলায় না দেওয়ানা/ সুখ-বসন্ত সুখের কালে সুখ-শান্তি তো দিলায় নারে...। এর দেড় যুগ পরে করিমের জীবনে সরলার আগমন। কুশীলবদের মনোরম উপস্থাপনা দর্শকদের ভাসিয়ে নিয়ে যায় প্রেমের জোয়ারে।
শাহ আবদুল করিম শুধু একজন বাউল সাধকই নন, বহু মানুষের জীবনাদর্শও বটে। মহাজনের নাও ধর্মান্ধতা ও সামপ্রদায়িকতার বিরুদ্ধে একটি পূর্ণাঙ্গ স্লোগান। নাটকটির ৫০তম প্রদর্শনীর ব্যাপারে নির্দেশক সুদীপ চক্রবর্তী অভিমত হলো—‘সামপ্রতিক সময়ের রামুর সামপ্রদায়িক ঘটনা এবং গণমানুষের চাওয়া-পাওয়ার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে মহাজনের নাও নাটকের এই মঞ্চায়ন। আমরা সকলেই জ্বালাও-পোড়াও, দারিদ্র্যমুক্ত অসামপ্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ চাই।’
শাহ আবদুল করিমের জীবন ও দর্শননির্ভর নাটকটি সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় নানা কারণে প্রশংসার দাবিদার। নাটকটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবাইকে মোহিত করে রাখলেও কিছু ছোটখাটো ত্রুটিও দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়। যেমন— করিমের গান গাওয়ার সময় হাতে দোতরা থাকলেও তা বাজাননি, এমনকি নেপথ্যেও দোতরার বাজনা শোনা যায়নি। আবহমান বাংলার নারী সরলার পোশাকে বাঙালি নারীর পরিচয় পাওয়া যায়নি। তবে নাটকটির একই চরিত্রে একাধিক কুশীলব থাকা সত্ত্বেও প্রত্যেকেই চরিত্রের দাবি মেটাতে সক্ষম হয়েছেন।