পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

গতকাল প্রকাশিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে পাসের হার শতভাগ ছুঁই ছুঁই। আর জেএসসি ও জেডিসিতেও পাসের হার ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। এ কারণে উচ্ছ্বসিত সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, প্রতিটি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। তাদের বক্তব্যের সারকথা—আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। ছেলেমেয়েরা ভালো করছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষকরা ব্যস্ত থাকেন পরীক্ষার প্রশ্ন কমন পড়ানো ও পাসের হার বাড়ানো নিয়ে। শিক্ষা বা শিক্ষার্থীদের মান বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আগ্রহ লক্ষণীয় নয় বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন। ২০০৯ সালে অভিন্ন প্রশ্নের আলোকে প্রথম প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী শুরু হয়। ওই বছর পাস করে ৮৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ২০১০ সালে পাসের হার বেড়ে হয় ৯২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ২০১১ সালে ৯৭ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং এ বছর ৯৭ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৯৯ দশমিক ১৯ ভাগ। গতবারের চেয়ে এবার ১ লাখ বেশি জিপিএ-৫ পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থা বেহাল। মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় অনেক স্কুলে শিক্ষকরা নিয়মিত উপস্থিত হন না। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে। যাদের হাতে প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব তারা ব্যস্ত থাকেন প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নে আর বিদেশ ভ্রমণে। থানা পর্যায়ের প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্বে থাকা অনেক শিক্ষা কর্মকর্তাও শিক্ষকদের বদলি বাণিজ্য ও আর্থিক অনিয়মের সাথে যুক্ত থাকেন। এবার ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণিতে কৃতকার্যের হার কম। যেখানে ধর্ম বিষয়ে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। সেখানে গণিত বিষয়ে পাসের হার ৯৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। কিন্তু পাসের হারও কম। আর সরকার পরিচালিত আনন্দ স্কুলের অবস্থা আরো শোচনীয়। এ প্রতিষ্ঠানের লেখাপড়ার মান ও পাসের হার উভয়ই কম। একই অবস্থা জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রেও। এ বছরও পাসের হার ও জিপিএ-৫ বেড়েছে। এ বছর পাসের হার ৮৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এ হার গতবারের চেয়ে ৩ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাসের হার বৃদ্ধি ইতিবাচক ফল প্রমাণ করে। কিন্তু মান না বাড়লে এ বৃদ্ধি সুফল বয়ে আনবে না। যদিও শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ইতিবাচক ফলাফলের পেছনে ভূমিকা রেখেছে বিনামূল্যে সঠিক সময়ে বই বিতরণ, টেলিভিশনে দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের পাঠদান সমপ্রচার, নকল বিরোধী প্রচারসহ নানামুখী উদ্যোগ। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকরা পাস করিয়ে দিলে পাসের হার তো বাড়বেই। পাসের হার বাড়লেও শিক্ষার মান মোটেও বাড়েনি বলে তিনি মত দেন। এই শিক্ষাবিদ বলেন, লেখাপড়ার মান বাড়েনি, এর প্রমাণ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাস করতে পারে না। এরা ভাল বাংলা বা ইংরেজি বলতে পারে না। অথচ জিপিএ-৫ পেয়েছে। তিনি বলেন, দেশের ছেলেমেয়েরা ইংরেজি ও গণিতে বেশ দুর্বল। সুযোগ-সুবিধা কম থাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা যাচ্ছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, লেখাপড়ার মান বাড়াতে হলে মেধাবীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যেতে হবে। এ শিক্ষায় শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার মান বাড়াতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে: জেএসসি ও জেডিসি এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। এবার জেএসসিতে ৭ লাখ ২৮ হাজার ১২০ জন ছাত্র ছিল। আর ছাত্রী ৮ লাখ ২৬ হাজার ৩৫২ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে জেডিসি পরীক্ষায় মেয়ে ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৭২ জন। ছেলে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬৪ জন। মাদ্রাসায় পাসের হারে ছেলেরা এগিয়ে আছে। অন্যদিকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২৪ লাখ ৪১ হাজার ৯০৩ জন। এর মধ্যে ছেলে ১১ লাখ ২৫ হাজার ৮৩৪ জন। আর মেয়ে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ২৮৫ জন। পাসের হারেও মেয়েরা এগিয়ে আছে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে উত্তীর্ণের মধ্যে ৫৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ মেয়ে এবং ৪৫ দশমিক ৪৬ ভাগ ছেলে। মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ার কারণ হিসাবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রাম ও মফস্বলের অভিভাবকরা এখন অনেক সচেতন। এ কারণে তারা মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছে। এছাড়া স্কুলে উপবৃত্তি চালু হওয়ায়ও মেয়েদের অংশগ্রহণ অনেকটা বাড়ছে বলে মনে করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।