দুর্যোগে কাবু হাইতির অর্থনীতি
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ১৮:৫১
সবকিছু হারানো এক মহিলা আর কিছু না পেয়ে তার অবুঝ সন্তানকে কফি (হাইতিতে এ বস্তুটি সহজলভ্য)পান করাচ্ছিলেন। লক্ষ্য একটাই— ক্ষুধার চোটে যাতে কান্নাকাটি না করে। আরেকজন অসহায় মহিলার অবশ্য এ সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল না। কারণ, তার ১৮ মাসের শিশুটি হাত থেকে ছুটে গিয়ে বানের জলে ভেসে গিয়েছে। পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের সবার লাশ পড়েছিল মর্গে; দাবি করার কেউ নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কী জিনিস, তা বেশ ভালোভাবেই টের পেয়েছে হাইতিয়ানরা। হারিকেন স্যান্ডিতে পুরো দেশ লণ্ডভণ্ড; বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা: নিহতের সংখ্যা ৫৪। প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পের পর যথাযথভাবে আরেকটি দুর্যোগ মোকাবেলা করার ক্ষমতা মোটেই নেই হাইতির। হারিকেন স্যান্ডি আঘাত হানার পর দু’মাসেরও বেশি সময় কেটে গেছে; কিন্তু পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনের কাজ খুব একটা চোখে পড়ছে না। জাতিসংঘ ও সরকারের উপাত্ত বলছে, বর্তমানে ক্ষুধা ও অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে লক্ষ লক্ষ হাইতিয়ান। কলা, সীম, আখ ও গম চাষীদের মাথায় হাত; ক্ষেতে হাঁটু-উঁচু পানি জমে আছে এখনো। সে কারণেই ধারণা করা হচ্ছে, সামনের দিনগুলো হবে হয়তো আরো ভয়াবহ। স্যান্ডির আঘাত থেকে বেঁচে যাওয়া ৬১ বছর বয়স্ক অলিব্রান হিলায়রি পেরিত-গোয়াভেতে তার ডুবে থাকা আখের ক্ষেতের সামনে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, ‘আমি জানি না সামনের দিনগুলোতে খাদ্য কেনা ও স্কুলের খরচ মেটানোর অর্থ আমরা কোথায় পাবো’। হারিকেন স্যান্ডির কারণে খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে হাইতিতে। এই ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১.৬ মিলিয়ন (মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ) লোকের কৃষিক্ষতির পরিমাণ ২৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ক্রান্তীয় ঝড় ইসাক গত আগস্ট মাসে আঘাত হেনেছিল দেশের উত্তর উপকূলে; এরপর অক্টোবরের শেষদিকে স্যান্ডি। ২০ ইঞ্চি উঁচু জলোচ্ছ্বাস ও ঝড় লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল দক্ষিণ উপকূল। নভেম্বরের মাঝামাঝিতে জাতিসংঘ ও হাইতিয়ান সরকার ৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবিক সাহায্যের আবেদন জানায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি মিলেছে মাত্র ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যা পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের জন্য যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘের মানবিক সাহায্যের সমন্বয়ক নাইজেল ফিশার জানিয়েছেন, হাইতিতে মানবিক সাহায্যের জন্য পর্যাপ্ত সাড়া না পেয়ে তারা হতাশ। অথচ ২০১০ সালের প্রবল ভূমিকম্পের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতেই দেশটির অনেক বছর লেগে যাবে।
স্যান্ডির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা ধ্বংস হয়ে যায় ৬১টি কলেরা নিরাময় কেন্দ্র। যে কারণে কলেরা ছড়িয়ে পড়তে পারে মহামারী আকারে। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত হাইতিতে কলেরায় মারা গেছে ৭৫০০ লোক। স্যান্ডিতে সবচে’ বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষির। দেশের অর্থনীতিতে কৃষিখাতের অবদান এক-চতুর্থাংশ। হাইতির পুনর্গঠনে অনেকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; কিন্তু কেউই তা পুরোপুরি রক্ষা করেনি।
সরকারি কর্মকর্তারা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করাকে দায়ী করলেও দাতারা উন্নতির অন্তরায় হিসেবে দুষছেন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে। প্রেসিডেন্ট মিচেল মারটেল্লি তার দ্বিতীয় দফা মেয়াদে সাড়ে তিন বছরেরও বেশে সময় কাটিয়ে দিয়েছেন ঠিকই; কিন্তু তিনি তার বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই গ্রহণ করছেন সংসদকে পাশ কাটিয়ে। এ প্রসঙ্গে জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচির কান্ট্রি ডিরেক্টর মির্টা কাউলার্ড বলছিলেন, ‘কার্যত কোন সরকার না থাকলে কেউই সাহায্য দিতে চায় না। আমরা তবুও চেষ্টা করছি’। জাতিসংঘের এ সংস্থাটি চলতি শীতে হাইতির বিশ হাজার পরিবারকে সাহায্য প্রদান করছে। সরকারের হিসেব অনুযায়ী, হাইতির কৃষির আধুনিকীকরণের জন্য প্রয়োজন ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সমৃদ্ধ মৃত্তিকা, নিয়মিত বৃষ্টি ও কড়া রোদ সত্ত্বেও দেশটিতে কৃষিকাজ কখনোই সহজ ছিল না; সেচব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল; গ্রামের রাস্তাঘাটের এমন নাজুক অবস্থা যে, শহরের বাজারে নিয়ে যাবার আগেই অনেক সময় ফসল নষ্ট হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা অক্সফাম গতমাসে তাদের এক রিপোর্টে লিখেছে, ‘সমন্বিত উদ্যোগের অভাব ও অবহেলার কারণেই হাইতির সমস্যা তীব্রতর হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও হাইতিয়ান সরকারের উচিত সুসঙ্গত কৃষিনীতির উপর গুরুত্ব দেয়া। এতে কৃষি উত্পাদন বাড়বে এবং হাইতিয়ানরাও শিখবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। সমস্যা লাঘবের জন্য এছাড়া কোন উপায় নেই’।
হাইতির প্রধানমন্ত্রী লরেন্ট লারোথে সম্প্রতি এক সাক্ষাত্কারে জানিয়েছেন, হাইতির উচিত হবে স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য ঠিক করা। যেমন- নদী খনন, রাস্তাঘাট ও সেতু সংস্কার ইত্যাদি। কৃষকদেরকে বীজ ও অর্থ দিয়েও সাহায্য করা যেতে পারে। সব সমস্যার দিকে দৃষ্টি দেয়ার সময় এখনো হয়নি, কারণ হাইতির সম্পদ সীমিত কিন্তু সমস্যা অনেক। আবার সবার সরকারি সাহায্যের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। রাজধানী পোর্ট অফ স্পেনের খুব কাছের একটি গ্রামের বাসিন্দা ব্রুনেল কাশিমির ক্রান্তীয় ঝড় ইসাকে সবকিছু হারিয়ে ফের কৃষিকাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্যান্ডি গুড়িয়ে দিয়েছে তার আখের ক্ষেত। আট সদস্যের পরিবারের খাবার যোগাতে সপ্তায় ব্রুনেলের প্রয়োজন পড়ে ২০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ। এ খরচ যোগাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। রাতে শুয়ে শুয়ে তিনি স ষ্টার কাছে প্রার্থনা করেন, সেইসঙ্গে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি এখন কী করতে পারি’?
— আইএইচটি অনুসরণে