এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি
মোস্তাফিজুর রহমান লিটন সিনিয়র শিক্ষক বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১১
বঙ্গভাষা
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
২. নিচের উদ্দীপকটি পড়ো এবং প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও
ক.‘ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি,
এ ভিখারী-দশা তবে কেন তোর আজি?
যা ফিরি, অজ্ঞান তুই, যা রে ফিরি ঘরে।’
খ.‘বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে।’
ক. ‘বঙ্গভাষা’ কবিতাটি কোন ছন্দে রচিত? ১
খ. ‘পর-ধন-লোভে মত্ত’
— কথাটির অর্থ বুঝিয়ে দাও। ২
গ. কবিতাংশ দুটির আলোকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর দেশপ্রেমের স্বরূপ তুলে ধরো। ৩
ঘ. ‘ওরে বাছা, মাতৃকোষে রতনের রাজি’— উক্তিটির তাত্পর্য দ্বিতীয় কবিতাংশের আলোকে বিশ্লেষণ করো। ৪
২ নম্বর প্রশ্নের ‘ক’-এর উত্তর
‘বঙ্গভাষা’ কবিতাটি অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত।
২ নম্বর প্রশ্নের ‘খ’-এর উত্তর
‘পর-ধন-লোভে মত্ত’ বলতে বোঝায় পরের সম্পদের লোভে অতিমাত্রায় আকৃষ্ট।
পরের ধন বলতে কবি পাশ্চাত্য সাহিত্যকে বোঝায়। কবিতায় কবি পর-ধন বলতে পাশ্চাত্য তথা ইংরেজি ভাষা-সাহিত্যের কথা বুঝিয়েছেন। এ পর-ধনের প্রতি মোহের বশে কবি একসময় বাংলা ভাষা-সাহিত্য চর্চার পথ ত্যাগ করে পাশ্চাত্য সাহিত্যের ভাব-সম্পদ আহরণের জন্যে মত্ত হয়ে ওঠেন। পরে তিনি বাংলা ভাষা-সাহিত্যের সাধনায় আত্মনিয়োগ করে যশ ও খ্যাতি লাভ করেন।
২ নম্বর প্রশ্নের ‘গ’-এর উত্তর
উদ্ধৃত কবিতাংশ দুটিতে দেশপ্রেমবোধ সুস্পষ্টভাবে বিধৃত হয়েছে।
‘বঙ্গভাষা’ কবিতায় দেশমাতৃকার প্রতিই তাঁর ভালোবাসার অভিব্যক্তি ঘটিয়েছেন। কবিতা থেকে উদ্ধৃত চরণ ক’টিতেও প্রকাশ পেয়েছে কবির আত্মধিক্কার ও মাতৃভাষার ঐশ্বর্যের উপলব্ধি। বস্তুত মাতৃভাষা প্রত্যেক মানুষের জন্যেই ধন-রত্ন-ঐশ্বর্যের আকর।
উদ্দীপকে আলোচনা করা হয়েছে, মাতৃভাষাকে ভালো না বাসলে তার পরিণাম শুভ হয় না। ভাষাকে ভালোবেসেই মানুষ দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসে। ‘বঙ্গভাষা’ কবিতায় মূলত মাতৃভাষা ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল প্রবাহকে তুলে ধরা হয়েছে, যা প্রকাশিত হয়েছে কবির ব্যক্তিগত জীবনের নিরিখে। দ্বিতীয় উদ্ধৃতি ‘কপোতাক্ষ নদ’-এর কবিতাংশের দেশাত্মবোধের পরিচয় ফুটে উঠেছে। কবি এ বিশ্বের বহু দেশ, জনপদ, নদ-নদীর তুলনায় তাঁর প্রিয় স্বদেশের শৈশব স্মৃতিবিজড়িত নদীর মাহাত্ম্য এখানে প্রকাশ করেছেন। কপোতাক্ষের মাতৃদুগ্ধসম জল যেন মাতৃতুল্য স্বদেশেরই অমৃতসুধা। ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতায় কপোতাক্ষ বস্তুত মাতৃভূমি তথা স্বদেশেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। কপোতাক্ষের প্রতি মমতা এখানে দেশপ্রেমেরই নামান্তর। উভয় কবিতাংশে দেশপ্রেম জাগ্রত।
২ নম্বর প্রশ্নের ‘ঘ’-এর উত্তর
মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘বঙ্গভাষা’ নামক চতুর্দশপদী কবিতায় মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে ভিনদেশি সাহিত্যচর্চায় খ্যাতি অর্জনের মোহ থেকে মুক্ত হয়ে কবির ফেরার বিষয়টি উচ্চারিত হয়েছে। উদ্দীপকেও মাতৃভাষার স্বরূপ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বঙ্গবাণী কবিতার আলোকে বলা যায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর প্রথম জীবনে পাশ্চাত্য সাহিত্য ও জীবন সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ইউরোপের ভাষা ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চা করে সুখ্যাতি অর্জন করতে। সে লক্ষ্যে তিনি কঠোর পরিশ্রম করে বিদেশি ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন।
উদ্দীপকের আলোকে বলা যায়, বঙ্গভাষার ভাণ্ডারে যে বহুবিধ ঐশ্বর্য আছে, তার সন্ধান পেয়ে তিনি অভিভূত হয়েছেন। ব্যারিস্টারি পড়ার জন্যে বিদেশে অবস্থানকালে তাঁর যখন চরম দুর্দিন চলছিল, তখন কুললক্ষ্মী বা কাব্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে তাঁর আত্মোপলব্ধিই তাঁকে দেশে ফেরার প্রেরণা জুগিয়েছিল। কুললক্ষ্মী কবিকে এই বলে সচেতন করলেন যে, মাতৃভাষায় এত রত্ন থাকতে তিনি ভিখারির মতো বিদেশি ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন।
তিনি ‘The Captive Ladie’ নামে একটি ইংরেজি গ্রন্থও প্রকাশ করতে সক্ষম হন। কিন্তু সেটি ইংরেজ সমালোচকদের কাছে সফল সাহিত্যকর্ম হিসেবে পরিগণিত হয় নি। ফলে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে তাঁকে স্বদেশ ও স্বভাষার সাহিত্যকর্মে ফিরে আসতে হয়। ‘বঙ্গভাষা’ কবিতায় তিনি তাঁর ভুল স্বীকার করে মাতৃভাষার প্রশস্তি রচনা করেছেন। তিনি তাঁকে দেশে ফিরে মাতৃভাষার সেবা করার পরামর্শ দেন। অতঃপর বাংলা ভাষার ভাণ্ডারের অমূল্য রত্নের সন্ধান লাভ করে কবি নিজেকে সার্থক করে তুলতে সক্ষম হন। উদ্দীপকের দ্বিতীয় কবিতাংশেও এরূপ আত্মোপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে। বহু দেশের বহু নদের সান্নিধ্যে গিয়েও কবি তাঁর স্নেহের তৃষ্ণা মেটাতে পারেন নি। তাঁর উপলব্ধিতে ধরা দিয়েছে শৈশব-স্মৃতিমাখা কপোতাক্ষ নদের কথা( মাতৃস্তন্যের দুগ্ধস্রোতের মতোই অনন্য যার ধারা। ‘মাতৃকোষে রতনের রাজি’( কথাটি ভিন্নতর ব্যঞ্জনায় এখানেও একই অর্থে প্রকাশ পেয়েছে।