‘‘কপোতাক্ষ নদ’ ’ কবিতার শ্রেণিশিক্ষা
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২০:১৩
‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতাটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং ছাত্রছাত্রীরা কবিতাটির মূলভাব অনুধাবন করতে পারে সেভাবেই তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে কবিতাটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন কবি কামাল মুহম্মদ।
কপোতাক্ষ নদ
gvBGKj gaymƒ`b `î
সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে!
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;
সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া-মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!
বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে।
কবি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা: বাংলা সাহিত্যের একমাত্র সার্থক মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আধুনিক বাংলা কবিতার প্রবক্তা। এই মহান কবি যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে ১৮২৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুল জীবনের শেষে তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। হিন্দু কলেজে অধ্যয়নকালে মধুসূদন দত্তের ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মে। ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য সাধনায় তীব্র আবেগ তাঁকে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হন। তখন তাঁর নামের সাথে ‘মাইকেল’ যোগ হয়। আমরা দেখি, ইংরেজি সাহিত্যে যখন তিনি মত্ত এবং ভার্সাইয়ে অবস্থান করছেন তখন তিনি অর্থাভাবে পড়েন। এবং তিনি বিচিত্র কষ্টকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন। পরবর্তীতে তাঁর ভুল ভাঙে। নিজ ভাষাকে অবজ্ঞা করে কখনো ভাল কিছু সম্ভব নয়। এবং বাংলা ভাষায় কাব্য রচনার মধ্য দিয়েই মাইকেল মধুসূদন দত্তের যথার্থ কবি প্রতিভার স্ফূরণ ঘটে। তাঁর অমর কীর্তি ‘মেঘনাদ বধ’ কাব্য। অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’, ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’, ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’ ও ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলি’। তাঁর নাটক কৃষ্ণকুমারী, শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী এবং প্রহসন একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ আর সনেট লিখে তিনি বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। ১৮৭৩ সালের ২৯ শে জুন এই মহান কবি দেহত্যাগ করেন।
ˆkÉwYwkÞv: মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচিত ‘কপোতাক্ষ নদ’ কবিতাটি চতুর্দশপদী কবিতাবলি থেকে নেয়া হয়েছে। এই কবিতায় কবির স্মৃতি কাতরতার প্রকাশ ঘটেছে। এবং এর সাথে স্বদেশপ্রেমের বিষয়টিও বাঙময় হয়েছে।
আমরা জানি, কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত যশোর জেলার কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে কপোতাক্ষ নদের তীরে প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। শৈশবের নানা স্মৃতি তার মানসপটে অঙ্কিত রয়েছে। এ বিষয়টি তিনি গভীরভাবে অনুভব করেন যখন তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন। কেননা তিনি যখন ইংরেজি সাহিত্যে সফলতা পাচ্ছেন না তখনই তাঁর বোধোদয় হয় এবং বাংলা ভাষার প্রতি নজর দেন। তিনি বুঝতে পারেন নিজের সম্পদ ছাড়া এ পৃথিবীতে কেউ কোনদিন সার্থকতা পায়নি।
বাংলা ভাষার গুরুত্ব বুঝে তিনিই প্রথম আধুনিক বাংলা কবিতার বাঁক-বাদলে সচেষ্ট হন এবং অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তন করেন। আমরা তাঁর ভেতরে প্রবল দেশপ্রেমের আকুতি লক্ষ্য করি—তিনি যখন উচ্চারণ করেন, ‘সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে!/ সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।’ যে কপোতাক্ষে একদিন সাঁতার কেটেছেন কবি, যে কপোতাক্ষের জলে তৃষ্ণা মিটেছে—সেই নদের থেকে যখন তিনি বহুদূরে তখন উপলব্ধি করছেন, নিজের ঐশ্বর্য ছেড়ে পরলোভে মত্ত হয়ে কবি জীবনের যে সময় নষ্ট করেছেন তার ক্ষতি কী দিয়ে পোষাবেন।
তিনি বহুদেশ দেখেছেন, দেখেছেন বহুদেশের নদী কিন্তু এত রূপ এত সৌন্দর্য আর কোথাও দেখেননি, যতটা দেখেছেন কপোতাক্ষের মাঝে। তাইতো ফ্রান্সে বসে কবির আক্ষেপ—‘আর কি হে হবে দেখা! জীবন সায়াহ্নে কবির একটাই আকুলতা আর একবার যেন সেই প্রিয় নদের সাথে দেখা হয়।’
আমরা কপোতাক্ষ নদের ভেতর দিয়ে মূলত কবির ভেতরের স্মৃতি কাতরতায় স্বদেশপ্রেমের চিত্রটিই ফুটে ওঠতে দেখেছি। এবং এ বিষয়টিও জেনেছি, নিজের ভাষা আর সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে কখনোই ভালো কিছু করা সম্ভব নয়।