রাজধানীর বস্তিবাসীর মধ্যে আগুন আতঙ্ক বেশি। ২০০৪ সালে কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। এখনো ভুলতে পারেনি সেখানকার বাসিন্দারা। বস্তিতে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় আগুনের ঘটনা। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশে আগুন লাগলে অগ্নিনির্বাপক দল তা নিভানোর আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় সব। সর্বস্বান্ত হয় বস্তিবাসী। তবে এখন থেকে বস্তিবাসীকে আগুন থেকে বাঁচাবে ‘লুমকানি’ নামক ডিভাইস।
লুমকানি শব্দের অর্থ ‘সাবধান হও’। এটি ফায়ার ডিটেক্টর ডিভাইস। ২০১৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আবিষ্কৃত লুমকানি ঢাকার বস্তিতে লাগানো হচ্ছে। কড়াইল বস্তির খ-ব্লক ও কল্যাণপুরের পুরো বস্তিতে লুমকানি স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে কড়াইল বস্তিতে ৯৪০টি ও কল্যাণপুরে ২ হাজার ১০০টি ঘরে এ ডিভাইস লাগানো হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে বস্তিতে লুমকানি স্থাপন করেছে বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড ভিশন নামক একটি এনজিও।
সংস্থাটির প্রজেক্ট ম্যানেজার ফাতেমা মেহেরুন্নেছা ইত্তেফাককে বলেন, লুমকানি একটা ফায়ার ডিটেক্টর ডিভাইস। আমাদের দেশে বিভিন্ন শপিং মল, আবাসিক এলাকায় সাধারণত ধোঁয়া ডিটেক্টর ব্যবহার করা হয়। তবে লুমকানি এক্ষেত্রে ভিন্ন। এটি হিট (তাপমাত্রা) ডিটেক্টর। কড়াইল এবং কল্যাণপুর বস্তিতে আমাদের প্রকল্প পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করেছি। প্রকল্প সফল হয়েছে। প্রতিটি ডিভাইসের দাম পড়েছে ২ হাজার টাকা। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার পাশাপাশি রাজধানীর শপিং মল, হাসপাতাল ও অন্যান্য বস্তিতে লুমকানি স্থাপন করার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমরা এটাকে আরো সম্প্রসারিত করতে চাই।
লুমকানি সাধারণ অ্যালার্মগুলোর চেয়ে ভিন্ন। অনেকটা রাউটারের মতো। সাধারণ ফায়ার অ্যালার্মগুলো ধোঁয়া শনাক্ত করে আগুনের সতর্কবার্তা দেয়। এতে অনেক সময়ই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তবে লুমকানি হিট ডিটেক্টর। ঘরের তাপমাত্রা পরিমাপ করে অগ্নিকাণ্ডের সংকেত দেয় এটি। এটি কমিউনিটি নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে কাজ করে। ঘরের তাপমাত্রা হঠাত্ অত্যধিক বেড়ে গেলে মেশিনটি সংকেত দেওয়া শুরু করে। সাড়া না দিলে ১০-২০ সেকেন্ডের মধ্যে প্রতিবেশী ঘরের লুমকানিতে সংকেত দেয়। এভাবে একটি ডিভাইস থেকে অন্য ডিভাইস হয়ে ৬০ মিটারের মধ্যে অন্য সব ডিভাইসে পৌঁছে যায় সংকেত। সেন্ট্রাল ডিভাইসটি আগুন লাগার স্থান জিপিএসের মাধ্যমে নিকটস্থ কমিউনিটির কাছে পৌঁছে দেয়। তারাই নিশ্চিত হয়ে খবর দেয় ফায়ার সার্ভিসে।
ফাতেমা মেহেরুন্নেছা বলেন, প্রতিটি ডিভাইস অ্যাপসের মাধ্যমে একটি ফোন নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করা থাকে। অ্যাপে বারকোড স্ক্যান করে ব্যবহারকারী নিজের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ কিছু তথ্য দিয়ে রাখতে পারেন। ফলে আগুন লাগলে ব্যবহারকারী কমিউনিটির বাইরে অবস্থান করলেও ফোনে ম্যাসেজও চলে যাবে। নিজের ঘরে আগুন লাগলে সে খবরের পাশাপাশি প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে সে খবরও পাওয়া যাবে। ম্যাসেজ দেখেই বোঝা যায় মূলত কোন এলাকায়, কার ঘরে আগুন লেগেছে। ফলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়।
তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি কড়াইলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে আমাদের যে ব্লকটিতে লুমকানি লাগানো আছে সেখানে বড় ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। বস্তিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আমাদের সেচ্ছাসেবী আছে। যারা আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস আসার আগেই ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। ইতোমধ্যে ৪-৫টি আগুনের ঘটনায় আমাদের সেচ্ছাসেবীরা আগুনের খবর পেয়ে ঘটাস্থলে গিয়ে নেভাতে সক্ষম হয়েছে।
কড়াইল বস্তিতে ২০০৪ সালে ভয়াবহ ঘটনার পর থেকে আগুনেই বস্তিবাসীর বেশি ভয়। তবে লুমকানি লাগানোর পর দুই বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান বস্তিবাসী।
কল্যাণপুর বস্তির বাসিন্দা সারমিন আক্তার বলেন, আগে আগুন নিয়ে আতঙ্কে থাকতাম যে, কখন আগুন লেগে সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। লুমকানি লাগানোর পর আগুনের দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে গেছে। বড় ধরনের আগুনের ঘটনা ঘটেনি। ঘরের তাপমাত্রা হঠাত্ বেড়ে গেলেই সংকেত দেয়। আগুনের খবর সহজেই মোবাইলে চলে আসে।
এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আরবান রিজিলিয়েন্স প্রজেক্ট ডিরেক্টর ড. তারিক বিন ইফসুফ ইত্তেফাককে বলেন, পরীক্ষামূলকভাবে দুইটি বস্তিতে লুমকানি স্থাপন করা হয়েছে। এটার কার্যকারিতা ভালো। ভালো দিক হলো, একটি নেটওয়ার্কিংয়ের মাধ্যমে কাজ করে এটি। বস্তিতে ৫০ মিটার পর পর একটি ডিভাইস লাগানো আছে। কোনো এক জায়গায় আগুন লাগলে সব জায়গায় সংকেত পৌঁছে যায়।