সেলিব্রেটি ও ডায়াবেটিস

ডায়াবেটিক এখন সবার রোগ। ধনী, দরিদ্র, ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ কাউকে রেহাই দেয়না ডায়াবেটিস। সেলেব্রিটিদেরও কি রেহাই আছে? কিন্তু একে জয় করে ওরা দেখালেন তুখোর পারফোরম্যান্স। জে কাটলার শিকাগো বিয়ারস কোয়ার্টারব্যাক। হঠাত্ ওজন হারাচ্ছেন, শরীরে বল-শক্তি পাচ্ছেন না। ২০০৮ সালে নির্ণয় হলো টাইপ-১ ডায়াবেটিস। ইতিমধ্যে ৩৫ পাউন্ড ওজন শরীর থেকে ঝরে গেছে। কিন্তু কাটলারের মনোবল অনেক। ডায়াবেটিস তাকে কাবু করতে পারেনা। কাট্লার এখন পরেন ইনসুলিন পাম্প, তদারকি করেন রক্তের সুগার নিজেই। ফলে ডায়াবেটিস তাঁর নিয়ন্ত্রণে। টাইপ-১ ডায়াবেটিস অটোইম্যুন রোগ। অজ্ঞাত কারণে দেহ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজে বৈরী হয় নিজ দেহকোষের প্রতি। আক্রমণ করে অগ্ন্যাশয়ের বিটাকোষ ধ্বংস করে, ইনসুলিন ক্ষরণ বন্ধ হয়। টাইপ-১ ডায়াবেটিস এক সময় একে বলা হতো শিশু ও তরুণদের রোগ। এখন হয় সবারই। ব্রেট মাইকেলস নামকরা রক্স্টার ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। ব্যান্ডের গায়ক। যখন তার বয়স ৬ বছর তখন নির্ণয় হয় ডায়াবেটিস। বড় হলেন যখন তখন দিনে চারটি ইনসুলিন ইনজেকশন নিতে হয় বেঁচে থাকার জন্য। প্রতিদিন ৮ বার রক্ত পরীক্ষাও করতে হতো। অনেক সমস্যা হলো তাঁর। এমনকি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণও হলো তাঁর। তবু তিনি জিতে নিলেন টিভির দি সেলেব্রিটি এপ্রেনটিস পুরষ্কার। আর এই পুরষ্কারের অর্থ ২৫০,০০০ ডলার প্রতিশ্রুত সেই অর্থ তিনি দান করলেন আমেরিকান ডায়াবেটিক এসোসিয়েশনে। যথার্থ সেলেব্রেটি। খ্যাতিতে এবং অন্তরে। জোনাস ব্রাদার্সের গায়ক নিক্ জোনাস টাইপ-১ ডায়াবেটিস নিয়েও জনসমক্ষে এলেন ২০০৭ সালে। বলছিলেন তিনি, উপসর্গের মধ্যে আছে ওজন হ্রাস ও পিপাসা। টাইপ-১ ডায়াবেটিস যখন নির্ণয় হলো তার তখন তুঙ্গ অবস্থা, রক্তের সুগার ৭০০- স্বাভাবিক রক্ত সুগার সীমা ৭০-১২০ মাত্র। জোনাস ভর্তি হলেন হাসপাতালে, চিকিত্সা হলো, নিজেও শিখলেন কি করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। এক সময় টাইপ-১ ডায়াবেটিসকে বলা হত ‘তরুণদের ডায়াবেটিস’। ২০ বছরের নিচে যাদের বয়স তাদের এই ডায়াবেটিস বেশি হয়। তবে হতে পারে যে কোনও বয়সে। অভিনেত্রী হ্যালে বেরি হ্যালে বেরি টাইপ ২ ডায়াবেটিস তাঁর। একবার গুজব রটল হ্যালে বেরি’র টাইপ ১ ডায়াবেটিস ছিলো, এখন তার টাইপ-২ ডায়াবেটিসে উত্তরণ ঘটেছে। একেবারেই অসম্ভব তা। টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগীর দেহে ইনসুলিন তৈরি হয়না এবং বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন হয় অতি অবশ্য ইনসুলিন ইনজেকশন। কোনও কোনও টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগীর বিশেষ ক্ষেত্রে ইনসুলিন শট লাগলেও পথ্যবিধি ও মুখে খাবার ওষুধ দিয়ে এদের রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বেশিভাগ টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগী ইনসুলিন শট ছাড়াই বাঁচেন, অথচ টাইপ-১ রোগী ইনসুলিন ইনজেকশন ছাড়া বাঁচতেই পারেন না। রেন্ডি জ্যাক্সন আমেরিকার দেবপ্রতিম জাজ্ রেন্ডি জ্যাকসন জানলেন তাঁর হয়েছে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ২০০১ সালে। স্থূলকায় ছিলেন রেন্ডি। টাইপ-২ ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা তাই আগে থেকেই ছিলো। আরও ঝুঁকি ছিলো পারিবারিক ভাবে। নিজে আফ্রিকান-আমেরিকান-তাই ঝুঁকি আরও বেশি। এত স্থূলো ছিলেন, তাকে পাকস্থলীর বাইপাস সার্জারি করাতে হলো, এভাবে তিনি শরীর থেকে হারালেন একশপাউন্ড ওজন। খাওয়া দাওয়া সুমিত করা হলো। ব্যায়ামে যোগ হলো হাঁটাহাঁটি, ট্রেডমিল এবং যোগব্যায়াম। ভালো আছেন এখন তিনি। সালমা হায়েক অভিনেত্রী সালমা হায়েকের গর্ভাবস্থায় ধরা পড়লো ডায়াবেটিস। জেস্টেসন্যাল ডায়াবেটিস (GDM)। ভেলেন্টিনা যখন গর্ভে তখন ধরা পড়লো জিডিএম। পরিবারের ধাত ছিলো ডায়াবেটিসের। গর্ভবতী সব মহিলাদেরই ২৪-২৮ সপ্তাহ গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিক স্ক্রিনিং করা হয়, যাদের সম্ভাবনা বেশি এদের স্ক্রিনিং করা হয় আরো আগে। গর্ভকাল শেষ হবার পর সাধারণত: জেস্টেশন্যাল ডায়াবেটিস চলে যায়। তবে পরবর্তীতে গর্ভকালে আবার ডায়াবেটিস হবার বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস হবার ঝুঁকি রেখে যায়। প্যাটি লা বেলে গায়িকা প্যাটি লা বেলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগী। রোগ নির্ণয় যখন হলো তখন স্মৃতি স্মরণ করলেন প্যাটি। তিনি বলেন, মঞ্চে হঠাত্ই মূর্ছা খেয়ে পড়ে গেলাম আমি। পরে ডাক্তার চলে এলেন আমার কাছে। বললেন, আপনি কি জানেন আপনার টাইপ-২ ডায়াবেটিস। আমি বললাম, ‘আমার কোনও ধারণাই ছিলো না।’ পরিবারে কারো কারো ছিলো ডায়াবেটিস। এরপর থেকে তিনি লিখেছেন “হেলদি কুকবুক” ব্যায়াম করবেন নিয়মিত। নিজেকে বলেন, ডায়াবেটিসও ডিভার সংমিশ্রণ। এনি রাইস উপন্যাস লিখে জনপ্রিয় হয়েছিলেন এনি রাইস। কোনও ধারণাই ছিলো না তার ডায়াবেটিস নিয়ে। ১৯৯৮ সালে যখন ডায়াবেটিস রোগে সংজ্ঞাহীন হলেন তখন তিনি জানলেন তাঁর ডায়াবেটিস। ১৯৯৯ সালে তার ওয়েব সাইট তিনি পোস্ট করেছিলেন ছোট্ট চিঠি, ‘আমার মনে হয় আমার রক্তের সুগার উঠেছিলো ৮০০, আমি মৃত্যুপথ যাত্রী” সেই সংকট থেকে রাইস জানলেন তাঁর ছিলো টাইপ-১ ডায়াবেটিস, আমি পরবর্তী জীবন প্রতিদিন ইনসুলিন শট্ নিতে থাকলাম বেঁচে থাকার জন্য। এভাবে আমি জীবনে একে মানিয়ে নিলাম। লক্ষ লক্ষ লোক যাদের এমন ডায়াবেটিস তাঁরা এভাবে বাঁচলেন।” মাইক হাকারি এক সময় ছিলেন আরকানাসাস রাজ্যের গভর্নর। ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীও হয়েছিলেন। এখন তিনি জনপ্রিয় ফক্স নিউজ চ্যানেলের টিভি শো হোস্ট। ২০০৩ সালে ধরা পড়লো তাঁর টাইপ-২ ডায়াবেটিস। পরবর্তীতে তিনি পথ্যবিধি মেনে চললেন, দৌড়বিদ হয়ে উঠলেন তিনি। শরীর থেকে ঝরলো ১১০ পাউন্ড, স্থূলকায় মাইক হলেন ক্ষীনকায়। খন্ডন করে ফেললেন কিছুটা রোগকেও। জীবনের এই রূপান্তর নিয়ে লিখলেন একটি বই। শৈশব থেকে স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের প্রবক্তা তিনি। জনপ্রিয় ল্যারি কিং এই টকশো হোস্টকে চেনেন না কম লোকই। তাঁর ছিলো টাইপ-২ ডায়াবেটিস। টকশো’তে বলছিলেন ল্যারি, নিশ্চয়ই এটি নিয়ন্ত্রণ যোগ্য। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করলে হতে পারে হূদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি রোগ, আরও অন্যান্য গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। ১৯৮৭ সালে ল্যারির হয় বড় রকমের হার্ট বাইপাস সার্জারি। কেবল ডায়াবেটিসেই তার ঝুঁকি ছিলো না, অসম্ভব ধূমপান করতেন তিনি। ধূমপান প্রবল আক্রমণ করে হূদযন্ত্রকে। তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে দিয়ে, ধূমপান ছেড়ে বেশ ভালো হলেন ল্যারি। মেরি টেলর মুর এই অভিনেত্রীর ছিলো টাইপ-১ ডায়াবেটিস। গর্ভপাতের জন্য হাসপাতালবাসী হলেন যখন মুর, তখন ধরা পড়লো ডায়াবেটিস। টাইপ-১ ডায়াবেটিস। বয়স তখন ৩০। হাসপাতালে রুটিন রক্তের সুগার পরীক্ষায় ধরা পড়লো তার সুগার মান ৭৫০। অবিলম্বে তাকে দেয়া হলো ইনসুলিন ইনজেকশন। ২০০৫ সালে সিএনএন টিভি হোস্ট ল্যারি কিং-কে বলছিলেন সাক্ষাত্কার অনুষ্ঠানে। এখন ৭০ বছর বয়স মেরি টেলরের। ডায়াবেটিস গবেষণার সঙ্গে তিনি দীর্ঘদিন। জুভেনাইল ডায়াবেটিস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ইন্টারন্যাশনাল চেয়ারম্যান তিনি। ইলিয়ট ইয়াসিন নামকরা গায়ক। আমেরিকান আইডলের ফিফথ্ সেসনে তৃতীয় স্থান অধিকারী টিনএজার যখন তখন ধরা পড়লো টাইপ-১ ডায়াবেটিস। ভীষণ ক্রদ্ধ, হতাশ, বিব্রত হলেন। ডায়াবেটিস সম্বন্ধে নেতিবাচক ধারণা। এখন তা নয়-এখন ইনজুলিন পাম্প পরে ইয়াসিন। ২০০৭ সালে প্যারেডের সঙ্গে ইনটারভিউতে তরুণ ডায়াবেটিকদের বোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হলেন- রোগীদেরকে বলেন, ডায়াবেটিস সম্বন্ধে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করতে। কোন ক্রমেই যেন এরোগ পিছু টানতে পারে-এমন সংকল্প ও অঙ্গীকার থাকা চাই সবার।