রাজনীতিতে সাপের খেলা

২০১২ সালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা কি? এ প্রশ্নের উত্তরে একেকজন হয়তো একেক রকম জবাব দেবেন। কেউ বলবেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দুই প্রধান দলের পরস্পর বিরোধী বক্তব্য। সরকার পক্ষ বলবেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচালে সারাবছরই মাঠে ছিলো বিরোধী দল। তারা হরতাল করেছে, গাড়ি ভাংচুর করেছে, আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে মানুষ। আবার বিরোধী দল বিশেষ করে বিএনপির সমর্থকরা বলবেন, সরকার দমনপীড়ন চালিয়েছে এবছর বেশ। রাজনৈতিক নেতাদের গুম করেছে। সরকারি দলের সমর্থকদের হাতে খুন হয়েছে বিরোধী দলের সমর্থকরা। তবে হুটহাট করে রাস্তায় নেমে জামায়াত-শিবির সমর্থকরা পুলিশের ওপর যে আক্রমণ চালিয়েছে তাও নজর কেড়েছে অনেকের। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম ২০১২ সালে দু’বার গ্রেফতার হয়েছেন। এখনো তিনি কারাগারে। আবার কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক না হয়েও বিরোধী দলের হরতালে রাজধানীর পুরান ঢাকায় নিরীহ সেলাইকর্মী বিশ্বজিত্ যেভাবে খুন হয়েছেন তাও কম নাড়া দেয়নি জাতিকে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হয়ে যাবার অনেক দিন হলেও তাকে এখনো খুঁজে বের করা যায়নি। এখন তাকে নিয়ে আর বিএনপি কিংবা পুলিশ বা সুশীল সমাজ তেমন কিছু বলছে না। মনে হচ্ছে রাজনীতিতে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে সাপ :সবকিছু ছাপিয়ে রাজনীতিতে এখন ঢুকে পড়েছে সাপ। বছরের শেষে এসে প্রধান দুই নেত্রীর কাছে সাপ নামক প্রাণীটি বড় উপমা হিসেবে ধরা দিয়েছে। ২৬ ডিসেম্বর বিএনপি চেয়ারপার্সন ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া রাজধানীতে তার বিভিন্ন পথসভায় বলেছেন, ‘সাপকে বিশ্বাস করা যায়, কিন্তু আওয়ামী লীগকে নয়।’ এর একদিন পরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপি নেত্রী সাপের ঝাঁপি মাথায় নিয়ে চলেছেন।’ তবে, বিরোধী দলীয় নেত্রী সাপের কথা বললেও ওঝার কথা বলেননি। এক্ষত্রে একধাপ এগিয়ে আছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি দলের কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে বলেন, সাপের বিষে অনেক সময় ওঝাও মারা যায়। বিরোধী দলীয় নেত্রী বিষধর সাপ নিয়ে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলীয় নেত্রীর বক্তব্যে বছরের শেষে এসে সাপ প্রসঙ্গটি যুক্ত হওয়ায় অন্যসব বিষয় আপাতত চাপা পড়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। নানা ষড়যন্ত্রে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ ২০১২ সালে অর্থাত্ জাতীয় নির্বাচনের আগের বছরে এসে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে নানা উদ্বেগের কথা ফুটে উঠে। নানা বিষয়ে তাদের এ উদ্বেগ দেশবাসীকেও ভাবিয়ে তুলছে। বিশেষ করে যুদ্ধপরাধীদের বিচার, আগামী নির্বাচন এবং দেশে নানা অস্থিতিশীলতা নিয়ে তাদের বক্তব্য ছিলো চোখে পড়ার মতো। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করে একটি গোষ্ঠী ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা এর সাথে যুক্ত। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র এখনো ক্রিয়াশীল বলে মনে করেন তিনি। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির হরতালের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হরতাল আহবানের বিষয়টিতে ক্ষমতাসীন দল ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছে। তারা মনে করে, সরকারের সামনে যে কয়টি বড় রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে সেগুলো বানচাল করার জন্য মাঠে একটি বিরোধী লবি কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর বাইরেও সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যেও নানা উদ্বেগের কথা ফুটে উঠেছে। গত ১৭ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সরকারকে হেয় প্রতিপন্ন করতে বিদেশি একটি মহল দুদকের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তারা মনে করেন, সরকারকে দুর্নীতিবাজ বানিয়ে হেয় করতে পারলে যুদ্ধপরাধীদের রক্ষা করা যাবে। তিনি বলেন, রামুতে সন্ত্রাস, গার্মেন্টস-এ অগ্নিকাণ্ড এবং বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ড কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ। সম্প্রতি ১৪ দলের এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদও বলেন, বিএনপি-জামায়াত যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্র ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী বলেন, গত বছর বেগম জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচাতে মুক্তিযোদ্ধাদের সমাবেশ ডেকে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি দেশকে তাহরীর স্কয়ার বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আজ নিজেই স্কয়ারে আবদ্ধ হয়ে গেছেন। খালেদার উদ্বেগ নির্বাচন নিয়ে দেশে কি হতে যাচ্ছে, সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে যথাসময়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কিনা, নাকি নির্বাচনই হবে না, অথবা অগণতান্ত্রিক বা অসাংবিধানিক কোনো শক্তির আগমন ঘটবে কিনা— এরকম নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক বক্তব্যে। সাম্প্রতিক সময়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি নিজেও দেশে জরুরি অবস্থা জারিসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির উদ্ভবের আশঙ্কা করছেন। কৌশলে পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বর্তমান সরকার নির্বাচনের আগেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারে বলে গত ২৮ নভেম্বর নয়াপল্টনে ১৮ দলের সমাবেশে দেয়া বক্তব্যে শঙ্কা ব্যক্ত করেছেন খালেদা জিয়া। এদিন তিনি বলেছেন, ‘বহু ফিসফাস শোনা যায়, ক্ষমতায় টিকে থাকতে দরকার হলে এ সরকার নাকি ইমার্জেন্সি (জরুরি অবস্থা) দেবে। কিন্তু ইমার্জেন্সি দেয়া হলে তা এ সরকারের জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে। মানুষও তা মানবে না। একই সমাবেশে বিরোধী দলীয় নেত্রী বলেছেন, ‘দেশে নির্বাচন চাই। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে। দেশের মধ্যে অন্যকিছু দেখতে চাই না।’ আগামী নির্বাচনকে কেন্দ করে বিএনপির সামনে যে আরও কঠিন পরিস্থিতি আসতে পারে, খালেদা জিয়া এরকম শঙ্কা ব্যক্ত করেন গত ১৯ ডিসেম্বর বিএনপির দেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের চিন্তা আজীবন ক্ষমতায় থাকার। এজন্য তারা অন্য সকল রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে চায়। ’ গত ১৩ ডিসেম্বর বিজিএমইএ আয়োজিত বাটেক্সপোর সমাপনী অনুষ্ঠানেও বিরোধী দলীয় নেত্রী বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার একদলীয় মনোভাব নিয়ে গণতন্ত্রের নাম-নিশানা মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। ভিন্নমত ও বিরোধী দলকে ফ্যাসিস্ট কায়দায় দমনের চেষ্টা আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট।’ ব্যক্তিগত আক্রমণের রাজনীতি নির্বাচনের আগের বছরে এসে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণাত্বক বক্তব্যের মাত্রা তীব্র করেছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী যে দুটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন তা থেকে এসব ফুটে উঠেছে। মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, উনার কথা শুনে মনে হয় ‘চোরের মায়ের বড় গলা’। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে পাঁচবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছিলো, নিজে প্রধানমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতির কালো টাকা জরিমানা দিয়ে সাদা করেছেন, তার গুণধর পুত্রদের দুর্নীতির পাচারকৃত অর্থ বিভিন্ন দেশ থেকে আমরা তা ফিরে আনতে সক্ষম হয়েছি। তার মুখে দুর্নীতির কথা শোভা পায় না।’ শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যার পর চট্টগ্রামের স্থানীয় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছিল। হত্যা মামলা কখনো তামাদি হয়ে যায় না। কিন্তু দুই দুইবার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়া কেন তার স্বামীর হত্যার বিচার করলেন না? প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী থাকা অবস্থায় গুলিস্তানে প্রকাশ্য জনসভায় খালেদা জিয়া বলেছিলেন, এরশাদ জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী। অথচ যাকে তিনি স্বামী হত্যাকারী বললেন, সেই এরশাদের কাছ থেকে খালেদা জিয়া গাড়ি, বাড়ি ও অর্থ নিয়েছেন। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সম্পর্কে খালেদা জিয়ার মন্তব্যের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ছেলে-মেয়েদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করেছি। আমার পুত্র বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছে, মেয়েও খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে লেখাপড়ার জন্য অর্থ নিয়ে খালেদা জিয়া তার দুই পুত্রকে কী শিক্ষা দিয়েছেন? অপরদিকে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ২৬ ডিসেম্বর রাজধানীর বিভিন্ন পথসভায় প্রধানমন্ত্রীকে ইংগিত করে বলেন, ‘আপনার ছেলে, আপনার বোন, জামাই, মেয়ে এবং আপনি নিজেও দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। চোরের মাকে বলি কত টাকা পাচার করেছেন তা কড়ায়-গন্ডায় হিসাব নেয়া হবে। আপনার হলো চোরের মায়ের বড় গলা। আপনার গলাই বড়। গলাটা ছোট করুন।’ পদ্মাসেতু সম্পর্কে খালেদা জিয়া বলেন, ‘দুদক আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠান। বিশ্বব্যাংক বলা সত্ত্বেও দুই আবুলকে বাদ দিয়ে মামলা হয়েছে। তারা এখন বিশ্বব্যাংককে শর্ত দিচ্ছে- যদি বিশ্বব্যাংক টাকা দেয় তবে আবুল হোসেনকে ধরা হবে। আসলে তারা চোর ধরার নামে টাকা হাতিয়ে নিতে চাচ্ছে। আবুলকে ধরা হলে আসল ঘটনা ফাঁস হয়ে যাবে। এজন্য তাকে ধরা হচ্ছে না। কারণ কান টানলে মাথা আসবে। তিনি বলেন, আবুল হোসেন উপরের নির্দেশে এই দুর্নীতি করেছে। আর টাকা নিয়ে কাউকে দেয়াটাও অপরাধ। সেজন্য আবুল হোসেনকেও ধরতে হবে। তাকে ধরলে আপুমনি, দিদিমনি, সবাই ধরা পড়ে যাবে। তখন বড় বড় রুই কাতলাগুলো বেরিয়ে আসবে।’ হরতাল, অবরোধ, জ্বালাও, পোড়াও ২০১২ সালে বিরোধী দল ১৮টি হরতালসহ কয়েকটি অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। এতে দু’জন নিহত হয়েছেন। দেশজুড়ে বিভিন্ন মামলায় বিরোধী দলের বেশকিছু সংখ্যক নেতা-কর্মী গ্রেফতার হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হরতালগুলো হচ্ছে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার প্রতিবাদে গত ২২, ২৩, ২৪, ২৯ ও ৩০ এপ্রিলের মোট ৫ দিন হরতাল। উল্লেখ্য, ১৭ এপ্রিল রাতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক আনসার আলী বনানীর সিলেট হাউস বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন। নির্বাচনকালীন নির্দলীয়, নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে গত ৯ ডিসেম্বর সকাল ৬টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা রাজপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। অবরোধ কর্মসূচিতে ‘পুলিশ ও সরকারি দলের কর্মীদের হামলায় বিএনপি-জামায়াতের চার কর্মী নিহত, ৪৪৭ জনকে গ্রেপ্তার ও ছয় শতাধিক নেতা-কর্মীকে আহত করার’ প্রতিবাদে ১১ এবং ১৩ ডিসেম্বর হরতাল কর্মসূচি পালন করে ১৮ দলীয় জোট। জামায়াতসহ সকল সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের দাবিতে সিপিবি ও বাসদ ১৮ ডিসেম্বর সারাদেশে হরতাল কর্মসূচি পালন করে। অন্যদিকে জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধে বাম সংগঠনগুলোর হরতালের প্রতিবাদে খেলাফত আন্দোলনসহ কয়েকটি সমমনা দল এই দিন কর্মসূচি পালন করে। তবে, ডিসেম্বর মাসের দুটি হরতাল দেশবাসীর নজর কেড়েছে বেশ। ১৯ ডিসেম্বর জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করাসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সিপিবিসহ কয়েকটি সমমনা বামদল হরতাল পালন করে। এ হরতালের প্রতিবাদে পরদিন সারা দেশে পূর্ণ দিবস আর ঢাকায় বেলা ২টা পর্যন্ত এ হরতালের কর্মসূচি দেয় খেলাফত আন্দোলনসহ কয়েকটি সমমনা দল। তবে এ হরতালে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। হরতালের প্রতিবাদে হরতাল ডাকার ঘটনা দেশে এই প্রথম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের দাবিতে জামায়াত এবং শিবির কর্মীদের রাস্তায় নামার ঘটনাগুলো ছিলো অভিনব। তারা আচমকা রাস্তায় নেমে পুলিশের ওপর আক্রমণ করে বসে। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য এতে আহত হন। সারাদেশে জামায়াত-শিবির কর্মীদের এ তাণ্ডব ঠেকাতে সরকার কঠোর হয়। গ্রেফতার হন বেশকিছু নেতাকর্মী। পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া ছাড়াও জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা বেশকিছু গাড়ি ভাংচুর করে। নির্বাচনকালীন সরকার: মুখোমুখি দুদল নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মুখে আলোচনার কথা বললেও কারও পক্ষ থেকে নেই আনুষ্ঠানিক কোন প্রস্তাব। এ ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল। নির্দলীয় সরকারের দাবি না মানলে দেশে গৃহযুদ্ধ বাধবে বলে সরকারকে হুঁশিয়ার করেছে বিএনপি। অন্যদিকে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দুই দলই এই ইস্যুতে রাজপথে এখন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে। অন্যদিকে বিএনপির দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যও সুস্পষ্ট। শেখ হাসিনা বলেছেন, অনির্বাচিত কারও হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না। অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, আওয়ামী লীগ বা অন্য কোন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিএনপি তাতে অংশ নেবে না, সে নির্বাচন হতেও দেবে না। বিশ্বজিত্: রাজনীতির বলি হঠাত্ ককটেল বিস্ফোরণ। এরপর প্রাণভয়ে দৌড়। আশ্রয় নিলেন পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া ডেন্টাল ক্লিনিকে। তখনও কে জানত, এখানেই ঘটবে সেই মর্মন্তুদ, হূদয়বিদারক, নৃশংস ঘটনা! শিবির বা ছাত্রদল কর্মী সন্দেহে প্রকাশ্যে নির্দয়ভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হবে ২৪ বছরের নিরীহ তরুণ বিশ্বজিত্ দাসকে! যে তরুণ কোনো রাজনীতির ধারেকাছে নেই, তাকেই ‘রাজনৈতিক কর্মী’ সন্দেহে নিষ্ঠুর রাজনীতির বলি হতে হলো। নিহত বিশ্বজিত্ শাঁখারীবাজারের নিউ আমন্ত্রণ টেইলার্সের কর্ণধার ছিলেন। হরতালের দিন সকাল ৯টায় বিশ্বজিত্ দাস ঋষিকেশ দাস রোডের বাসা থেকে দোকানে যাচ্ছিলেন। বাসার অদূরে বাহাদুর শাহ পার্কে যেতেই সামনে পড়ে অবরোধ সমর্থিত বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের একটি মিছিল। সেখানে শুরু হয় আইনজীবীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। ঝামেলা এড়াতে বিশ্বজিত্ বাহাদুর শাহ পার্ক সংলগ্ন পানির ট্যাঙ্কের ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন। এ সময় বিকট শব্দে পর পর দুটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। বিশ্বজিত্ আতঙ্কে দৌড়ে পাশের ভবনের একটি দোতলা ডেন্টাল ক্লিনিকের সামনে গিয়ে ওঠেন। এর পরই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কৃত কয়েক নেতা লাঠি ও অস্ত্র হাতে ক্লিনিকে আশ্রয় নেয়া বিশ্বজিেক কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। পুরো ঘটনার সময় অদূরেই ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায় পুলিশ ও র্যাব। বিশ্বজিতের মৃত্যুর ঘটনায় নড়েচড়ে বসে সবাই।