সেবাখাতে দুর্নীতির হার কমেছে
প্রকাশ : ২৮ ডিসেম্বর ২০১২, ২২:২৭
দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে দুর্নীতি আগের চেয়ে বেড়েছে। বিদায়ী বছরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছে ৪০.০২ শতাংশ মানুষ। অথচ আগের বছর এই হার ছিল ৩৩.০২ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা খাতে দুর্নীতি বাড়লেও বিদায়ী বছরে সার্বিকভাবে সেবা খাতে দুর্নীতির হার কমেছে। তবে টাকার অংকে দেশের সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ বেড়েছে। চলতি বছর সেবা খাতে সার্বিক দুর্নীতির পরিমাণ ২১ হাজার ৯৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অথচ ২০১০ সালে সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এবছর সেবা খাতের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে শ্রম ও অভিবাসন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘ সেবা খাতে দুর্নীতি - জাতীয় খানা জরিপ ২০১২ ’ শিরোনামের রিপোর্টে এসব তথ্য দেয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকালে নগরীর সিরডাপ মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই রিপোর্ট প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সংগঠনের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালও এ সময় বক্তব্য রাখেন।
প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, দেশে সার্বিক সেবা খাতে ৩০ শতাংশ দুর্নীতি কমেছে। তবে টাকার অংকে দুর্নীতি বেড়েছে। রিপোর্ট প্রকাশকালে টিআইবির চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১২ সালে দুর্নীতির হার কিছুটা কমেছে। ২০১০ সালে সেবা খাতে সার্বিক দুর্নীতির হার ছিল ৮৪.২ শতাংশ, দুই বছর ব্যবধানে এ হার প্রায় ২৮.৪ শতাংশ কমে ৫৫.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দুর্নীতি রয়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমাতে না পারলে উদ্বেগ বাড়তে থাকবে। তিনি বলেন, সেব গ্রহণের সময় দুর্নীতির হার কমলেও নিয়মবহির্ভূত উপায়ে অর্থ বিনিময়ের পরিমাণ বেড়েছে অনেক।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিদায়ী বছরে জাতীয় খানা জরিপে কিছুটা মিশ্র চিত্র পাওয়া গেছে। এবারের জরিপে ২০১১ সালের মে মাস থেকে ২০১২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ১৩টি সেবা খাতের তথ্য নেয়া হয়েছে। জরিপ চালানো হয়েছে গত ১৫ মে থেকে ৪ জুলাই পর্যন্ত সময়ে দেশের ৬৪টি জেলায়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিদয়ী বছরে শ্রম ও অভিবাসন খাতে সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে ৭৭ শতাংশই কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগের দিক দিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৭৫ দশমিক ৮ শতাংশ সেবাগ্রহীতা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীতে দুর্নীতির কথা বলেছেন।
প্রকাশিত রিপোর্টে আরও বলা হয়, বিদয়ী বছরে বিচারিক সেবায় ৫৭ দশমিক ১ শতাংশ, শিক্ষায় ৪০ দশমিক ১ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ, কৃষিতে ২০ দশমিক ৪ শতাংশ, বিদ্যুতে ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ, কর ও শুল্কে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ, ব্যাংকিং খাতে ৭ দশমিক ১ শতাংশ, বীমা খাতে ৬ শতাংশ, এনজিওতে ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য সেবা খাতে ৪১ দশমিক ১ শতাংশ সেবা গ্রহণকারী বিভিন্নভাবে দুর্নীতির শিকার হওয়ার কথা বলেছেন।
সেবা খাতের মধ্যে দুর্নীতির শীর্ষে থাকা শ্রম ও অভিবাসন খাতে বিদায়ী বছরে দুর্নীতি হয়েছে ৭৭ শতাংশ।
সেবা খাতে দুর্নীতির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা আইন-শৃঙ্খলা খাতে ২০১২ সালে দুর্নীতির শিকার হওয়ার পরিমাণ ৭৫.৮ শতাংশ। ২০১০ সালে এ হার ছিল ৭৯.৭ শতাংশ। ভূমি প্রশাসনে ২০১২ সালে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৫৯ শতাংশ সেবাগ্রহীতা। ২০১০ সালে এই হার ছিল ৭১.২ শতাংশ। বিদায়ী বছরে বিচারিক সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৫৭.১ শতাংশ সেবাগ্রহীতা, যা ২০১০ সালে ছিল ৮৮ শতাংশ। এদিকে বিদায়ী বছরে সেবাখাতে দুর্নীতির হার প্রায় ৩০ শতাংশ কমলেও এসব খাতে নগদ আর্থিক লেনদেনসহ টাকার অংকে দুর্নীতির পরিমাণ বেড়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, ২০১০ সালে প্রতিটি খানাকে সেবার বিপরীতে দুর্নীতির জন্য ব্যয় করতে হয়েছে গড়ে ৩ হাজার ১৮৪ টাকা। কিন্তু দুই বছরের ব্যবধানে এবার তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে ৬ হাজার ৯০০ টাকায় উন্নীত হয়েছে।
আর দেশে মোট ৩ কোটি ১৮ লাখ খানা হিসাবে বিদায়ী বছরে টাকার অংকে দুর্নীতির পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৯৫৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অথচ ২০১০ সালে সেবা খাতে আর্থিক দুর্নীতির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৫৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১০ সালের জরিপে জাতীয়ভাবে প্রাক্কলিত নিয়ম-বহির্ভূত আর্থিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ১.৪ শতাংশ। অথচ ২০১২ সালের জরিপে তা বেড়ে ২.৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।