মা লা লা ই উ সু ফ জা ই

সাহসের প্রতীক

মালালা ইউসুফজাই। যে কিশোরীর আলোয় আলোকিত পাকিস্তান। আলোড়িত এখন বিশ্ব। একটি রক্ষণশীল সমাজে নারীশিক্ষার উন্নয়নের জন্য আন্দোলন তাকে বিখ্যাত করেছে। তালেবান বন্দুকধারীদের হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাওয়া মালালা এখন বীর। যাকে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী সরদার শাহ জেজান ইউসুফ আখ্যায়িত করেছেন ‘সাহসের প্রতীক’ হিসেবে। তাকে কিশোরী-তরুণীদের ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়। ১৮ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তান। হয়তো পাকিস্তানি নারী হিসেবে বেনজির ভুট্টোর পর মালালাই নতুন করে পাকিস্তানকে তুলে ধরেছেন বিশ্বে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, তালেবানদের হামলা, দারিদ্র ও রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থা যখন দেশটির সব সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিচ্ছে তখন পাকিস্তানকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছেন ১৫ বছরের কিশোরী মেয়েটি। বছরের শেষ তিন মাসে বিশ্ব গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। সাহস ও কাজের জন্য প্রভাবশালী টাইম সাময়িকীর ২০১২ সালের দ্বিতীয় বর্ষসেরা (রানারআপ) ব্যক্তিত্ব তিনি। ২০০৭ সালে খায়বার-পাখতুনখোয়া প্রদেশের সোয়াত উপত্যকা দখলে নেওয়ার পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে তালেবান জঙ্গিরা। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সোয়াতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন অভিযান শুরু করে, তখন বিবিসি উর্দু বিভাগের ওয়েবসাইটে ছদ্মনামে একটা ডায়েরি লিখছিল মালালা। সেটা ২০০৯ সালের কথা। ধর্মান্ধ শক্তির বিরুদ্ধে ১২ বছরের কিশোরীর সাহসী কণ্ঠস্বর সবাইকে চমকে দিয়েছিল, জুগিয়েছিল সাহস, বাড়িয়েছিল মনোবল। পাকিস্তানের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিরা যখন তালেবানের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস করছিলো না, তখন মালালা দৃঢ়চিত্তে বলেছিলো শিক্ষার দ্বার কারও জন্য বন্ধ করো না। তালেবানদের বিরুদ্ধে শিক্ষাযুদ্ধের ঘোষণা দেওয়ায় তাকে পড়তে হয় রোষানলে। গত ৯ অক্টোবর সোয়াত উপত্যকায় তালেবান সদস্যদের গুলিতে আহত হন মালালা। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে খুব কাছ থেকে তার মাথায় গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ মালালাকে ১৫ অক্টোবর উন্নত চিকিত্সার জন্য লন্ডনের বার্মিংহামে এলিজাবেথ হাসপাতালে নেওয়া হয় আন্তর্জাতিক চাপের মুখে। এখন পুরোপুরি সেরে ওঠার পথে তিনি। তার উপর এ হামলায় সারা বিশ্বে নিন্দার ঝড় ওঠে। এ হামলার মাধ্যমে তার কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার চেষ্টা হলেও বিশ্ব সম্প্রদায় পাশে এসে দাঁড়িয়েছে তার। হাজার হাজার পাকিস্তানি হামলার প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে। মালালা এখন বিশ্বব্যাপী তরুণীদের সাহসের প্রতীক। গত বছর পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে জাতীয় শান্তি পুরস্কার পায় মালালা। একই বছর শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে কিডস রাইটস ফাউন্ডেশনের ‘ইন্টারন্যাশনাল চিলড্রেনস পিস প্রাইজ’-এর জন্য মনোনীত হন তিনি। সম্প্রতি এই কিশোরী শীর্ষ বৈশ্বিক চিন্তাবিদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তালিকায় পাকিস্তানের চারজনের নাম ছিল। মালালা তাদের মধ্যে অন্যতম। গত ১০ নভেম্বর জাতিসংঘের আহ্বানে সারা বিশ্ব ‘মালালা দিবস’ পালন করেছেন। এ উপলক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এক বার্তায় তাকে নারী শিক্ষা-অধিকারের বৈশ্বিক প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রায় আড়াই লাখেরও বেশি মানুষের স্বাক্ষরসহ একটি অনলাইন আবেদনে মালালাকে তার কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। গত ৮ ডিসেম্বর তাকে দেখতে হাসপাতালে যান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। সেখানে এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তিনি মালালাকে পাকিস্তানের গর্ব বলে আখ্যা দেন। এর দুই দিন পরই বিশ্বের সব মেয়েশিশুকে ২০১৫ সালের মধ্যে স্কুলগামী করতে পাকিস্তান এবং জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো নতুন একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করে। মালালা ইউসুফজাইয়ের নামে এ পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে জারদারি এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনি এক কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন। ২০১১ সালে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর এক সাক্ষাত্কারে মালালা বলেছিলেন, তার স্বপ্ন হলো একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা, যার লক্ষ্য হবে শিক্ষার প্রসার ঘটানো। এখন কথা হলো ভবিষ্যতে মালালা তার ক্ষমতা ও অবস্থানকে কীভাবে ব্যবহার করবেন। তিনি কী পাকিস্তানে ফিরে আসবেন নাকি স্বপ্ন পূরণে বিদেশে থেকে প্রভাব বিস্তার করবেন।