সা কি ব আ ল হা সা ন
বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার
প্রকাশ : ৩০ ডিসেম্বর ২০১২, ১৯:৩৩
আমাদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলতে পারি—২০১২ সাল ছিল বাংলাদেশ ও সাকিব আল হাসানের বছর। সাফল্যে বিচারে বাংলাদেশের জন্য এবং সাকিবের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বছর বলতে হবে এটাকেই। খেলা এক নম্বর, মূল্যে এক নম্বর, র্যাংকিংয়ে এক নম্বর; এগুলো সাকিবের এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এসব নয়, সাকিবকে আনন্দে ভাসিয়েছে বছরের শেষ লগ্নে এসে তার নিজের জীবনের বিশাল এক ঘটনা—সংসার পেতেছেন সাকিব আল হাসান।
২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে এসে সাকিব বিয়ে করে ফেলেছেন কয়েক বছরের ভালোবাসার পাত্রী উম্মে আহমেদ শিশিরকে। শিশিরের সঙ্গে ২০১০ সালে কাউন্টি খেলতে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল বাংলাদেশের সেরা তারকা সাকিবের। শিশির প্রকৃতপক্ষে নারায়ণগঞ্জের মেয়ে। এখন যুক্তরাষ্ট্রে কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়াশোনা করছেন। বলাই বাহুল্য, নামে শিশির হলেও স্পিনার সাকিবের প্রচণ্ড ভক্ত ছিলেন আগে থেকেই। তখন থেকেই দু’জনের মধ্যে মন দেওয়া-নেওয়া। এ বছরের মাঝামাঝি থেকে গুঞ্জন চলছিল। দু’জনকে একসঙ্গে প্রকাশ্যে এক দু’বার দেখাও গেছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক ওয়েবসাইটে দু’জনের কিছু ছবিও ঘুরছিল।
ফলে প্রশ্নটা শুরু হয়েই গিয়েছিল—সাকিব বিয়ে করছেন কবে?
সাকিব সব সময়ের মতো চুপই ছিলেন বিয়ের ব্যাপারে। বিয়েটাও করলেন খুব চুপিচুপি। আসলে একটা সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলেন বিয়ে করার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খুলনায় দ্বিতীয় টেস্টে ব্যাটে-বলে দুরন্ত পারফর্মেন্স করার পাশাপাশি ওই ম্যাচ থেকে ইনজুরি নিয়েও মাঠ ছেড়েছিলেন। ফলে ওয়ানডে সিরিজে তাকে দিয়ে দেওয়া হলো বিশ্রাম। আর এই সুযোগেই সাকিব বসে পড়লেন বিয়ের পিঁড়িতে।
বিয়ে হলো একেবারেই অনাড়ম্বর এক অনুষ্ঠানে। রাজধানীর এক পাঁচ তারকা হোটেলে মেয়েপক্ষের তত্ত্বাবধানে হলো বিয়ে। বরপক্ষ থেকে বাবা, মা, মামা, মামাতো ভাই-বোন, দাদী, নানী; এ রকম জনা পনেরো লোক আর বন্ধুদের মধ্যে কেবল তামিম ইকবালকে নিয়ে একেবারেই চুপিচুপি বিয়ে করে ফেললেন। সংবাদমাধ্যমও সেভাবে আমন্ত্রিত ছিল না। তারপরও পরদিন সারা দেশজুড়ে সাকিবের বিয়েরই খবর এবং সাকিব-শিশিরের বর-বধূ বেশের ছবি!
এই ছবি যদি সাকিবের জীবনের সবচেয়ে মধুর ছবি হয়; তাহলে মানতেই হবে বছরটাই হয়ে রইল তার মধুরতম স্মৃতির এক বছর।
মধুর এই বছরটা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের প্রথম আসর দিয়ে। সাকিব আল হাসান ছিলেন খুলনার আইকন। আইকন, মানে একেবারে আইকনের মতোই খেললেন। শেষ ধাক্কায় দলকে শিরোপা জেতাতে পারলেন না। কিন্তু একা বুক চিতিয়ে লড়াই করে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেরা বোলার, তৃতীয় সেরা ব্যাটসম্যান এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হলেন। দেশের প্রথম মালিকানাভিত্তিক টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে ‘এক নম্বর’ হওয়ার ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছিল সাকিবের বছর।
বিপিএল শেষ হওয়ার পরের মাসেই বাংলাদেশে বসল এশিয়া কাপের আসর। চার বিশ্বকাপজয়ী প্রতিবেশীর পাশে টুর্নামেন্টে বাংলাদেশই ছিল ‘আন্ডারডগ’। সেই টুর্নামেন্টের ভেতর দিয়েই বাংলাদেশ আসলে বিশ্বকে জানিয়ে দিল—তারা আর মাঝারি মানের দল নয়; এখন বাংলাদেশ বড় দল। এই একটা আসরের জন্য হলেও মানতে হবে, ক্রিকেটে ২০১২ সাল বাংলাদেশের সবচেয়ে আনন্দের বছর গেছে।
টুর্নামেন্টের গ্রুপপর্বে পর পর দুই ম্যাচে সর্বশেষ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ভারত এবং সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ও তিন বারের ফাইনালিস্ট শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে এলো বাংলাদেশ! এই কীর্তি দেখেই কাঁপছে তখন বিশ্ব। কাঁপছিল প্রতিপক্ষ পাকিস্তানও। পাকিস্তানের বিপক্ষে ফাইনালে জয় একসময় দেখতে পাচ্ছিল বাংলাদেশ। কিন্তু হায়! নিয়তি একটু বাধা তৈরি করে রাখল। ২ রানে হেরে রানার্সআপ বাংলাদেশ।
সাকিব কী করলেন? দলের ঐতিহাসিক এই সাফল্যের রূপকার হলেন আরেকবার। হ্যাঁ, প্রতিটি ম্যাচে ফিফটি করা তামিম ইকবালকে এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় তারকা মানতেই হবে। তবে ব্যাটে ২৩৭ রান এবং বল হাতে ৬ উইকেট নেওয়া সাকিবই যে শেষ পর্যন্ত তুরুপের তাস ছিলেন তা মানতে বাধা নেই।
এ বছর এরপর বেশ কিছুদিন দেশের খেলা ছিল না। তাই বলে সাকিবের বিজয়রথ থেমে ছিল না। পরের মাসে সাকিব গেলে আইপিএল খেলতে। যদিও আইপিএলে শুরুর দিকে নিয়মিত খেলতে পারলেন না। মোট ১৭টি ম্যাচের মাত্র ৮টিতে নিয়মিত খেলার সুযোগ পেয়েছেন। তাতেই ম্যাচপ্রতি উইকেট শিকারের হিসাবে টুর্নামেন্টের তৃতীয় সেরা বোলার। সবচেয়ে বড় কথা শেষ দিকে নিয়মিত সুযোগ পেয়ে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে জেতালে তাদের দীর্ঘদিনের অধরা শিরোপা। সাকিব যে সেরা বাজি, এটা একটু দেরি করে হলেও বুঝল কলকাতা!
এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এলো টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। সেই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপ সফরে কয়েকটি ছোট ছোট দলের বিপক্ষে খেলল। সেখানেও যথারীতি অপ্রতিরোধ্য সাকিব ও তার বাংলাদেশ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ছিল গ্রুপ অব ডেথে। ফলে বাংলাদেশকে নিয়ে জোর বাজি ধরা কঠিন ছিল। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টির সফল দল নিউজিল্যান্ড ও বিশ্বের অন্যতম সেরা টি-টোয়েন্টি স্কোয়াড পাকিস্তানের যেকোনো এক দলের বিপক্ষে জয় পেতেই হবে; এমন সমীকরণ নিয়ে খেলতে নামতে হলো বাংলাদেশকে।
না, এবার আর অসম্ভব কিছু করতে পারেনি বাংলাদেশ। কিন্তু অসম্ভবের স্বপ্নটা অন্তত তৈরি করেছিলেন ওই সাকিব আল হাসান। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫৪ বলে ৮৪ রানের এক ইনিংস খেলে দলকে স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন। ইমরান নাজিরের ব্যাটে সে স্বপ্ন শেষ হলেও মাথা উঁচু করে বাড়ি ফিরতে পেরেছে বাংলাদেশ।
আর এই ফেরার পর শুরু হলো বাংলাদেশের উজ্জ্বলতম আরেকটি অধ্যায়। আগেই জানা ছিল নভেম্বরে বাংলাদেশ সফরে আসছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এমনিতেই ক্রিস গেইল, মারলন স্যামুয়েলস, সুনিল নারিন, টিনো বেস্টদের ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন বেশ সমীহ করার মতো দল। তার ওপর দলটি রীতিমতো বাঘে পরিণত হলো মাত্র শেষ হওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতায়। তখন বরং বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মান-সম্মান যায় কি না।
প্রথম টেস্টের চার দিন পর শঙ্কাটা পেয়ে বসল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে—তাদের মানসম্মান যায় যায়। বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে নিজেদের ইতিহাস সেরা ৫ শতাধিক রান করল, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দ্বিতীয় ইনিংসে অল্প রানে অলআউট করে দিল। ফলে শেষ ইনিংসে জয়ের জন্য অল্প রানের লক্ষ দাঁড়িয়ে গেল বাংলাদেশের সামনে। কিন্তু অনভিজ্ঞতা, পঞ্চম দিনের উইকেট মিলিয়ে বাংলাদেশের তরী ডুবল একেবারে তীরে এসে।
বাংলাদেশের দুরন্ত এই টেস্ট পারফর্মেন্সে যথরীতি উজ্জ্বল সাকিব। অবশ্য এই টেস্টে শুধু ব্যাট হাতেই আলো ছড়ালেন। বল ও ব্যাটের জন্য অপেক্ষা ছিল নিজের হোম গ্রাউন্ড খুলনার। খুলনার টেস্ট অভিষেক হলো। এটাও বছরে বাংলাদেশের জন্য দারুণ উল্লেখযোগ্য এক ব্যাপার। সে টেস্টের শুরু থেকেই অবশ্য বাংলাদেশ একটা বিপাকে পড়ে গেল। দ্বিতীয় ইনিংস পর্যন্ত বাংলাদেশের একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসেই বল হাতে নিজেকে খুঁজে পেলেন সাকিব। আরেকবার ইনিংসে ৪ উইকেট নিয়ে ন্যূনতম রানে গুড়িয়ে দিলেন ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। ফলে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো দেড় দিন ব্যাট করে ম্যাচ ড্র করা। সাকিব সেভাবেই চলছিলেন। আরেকটি সেঞ্চুরির কাছে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু সেঞ্চুরি থেকে চার রান দূরে আউট হলেন সাকিব এবং আবার হারতে হলো বাংলাদেশকে।
এই টেস্টের পর সাকিবের আর এ বছর ক্রিকেট খেলা হয়নি। কিন্তু তার বন্ধুরা গড়ে ফেললেন আরেকটি ইতিহাস। টানা দুই ওয়ানডেতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ‘গলির ক্রিকেট দল’-এ পরিণত করে ফেললেন। ব্যাটে-বলে স্রেফ উড়িয়ে দিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২ ম্যাচ জিতল বাংলাদেশ। পরের দুই ওয়ানডেতে লড়াই করে হার। এবং শেষ ওয়ানডেতে রোমাঞ্চকর এক জয়। ফলে পূর্ণশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের আনন্দে ভাসল বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে তামিম ও মাহমুদউল্লাহর দুরন্ত ব্যাটিংয়ের প্রাপ্তি।
দল যখন এসব আনন্দ করছে; সাকিব তখন বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিয়ে হলো, বছরটাকে আরও সুখময় করে তুললেন সাকিব। এই পর্যন্ত বলেও শেষ করা যাচ্ছে না। বছরের শেষটা আরও একটা আনন্দের ভেতর দিয়ে করলেন। বিপিএলের দ্বিতীয় আসরের নিলামে দেশি-বিদেশি সব ক্রিকেটারকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হলেন সাকিব আল হাসান। আবার এক নম্বর।
ও আচ্ছা, এই এক নম্বর প্রসঙ্গেও একটু কথা বলা উচিত। ওয়ানডের এক নম্বর অলরাউন্ডার হয়ে আছেন আগের বছর থেকেই। এ বছর সাকিব জায়গাটাকে আরও পোক্ত করেছেন। তবে এর চেয়ে বড় অর্জন, বছরের শুরুর দিকে টেস্টের এক নম্বর অলাউন্ডার ছিলেন অনেক দিন। শেষ পর্যন্ত জায়গাটা জ্যাক ক্যালিস নিয়ে নিয়েছেন। সাকিব চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন জায়গাটা ফিরিয়ে আনার।
সাকিব চ্যালেঞ্জ নিলে সেটাতে তার না জেতার কারণ নেই। তাহলে আমরা আরেকটি সাকিবময় বছরের অপেক্ষায় থাকব।